বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন শুরু করেছেন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইস্যুতে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন এই উদ্যোগের প্রধান কারণ।

দেশটির কার্যত প্রধান বিরোধি দল বিএনপির আহ্বানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছার বাইরে এ ধরনের কোন উদ্যোগ নেবার সুযোগ রাষ্ট্রপতির নেই। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সংসদে রাখা এক বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন বলে জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হয়তো বা সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়েই আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের আয়োজন করছেন।

প্রথম দিনে বিএনপির সাথে প্রেসিডেন্ট মতবিনিময় করবেন। এর পরদিন ২০ দলীয় জোটের আরেক শরিক কর্ণেল অলি আহমদের এলডিপির সাথে এবং ২২ ডিসেম্বর সংসদের আনুষ্ঠানিক বিরোধি দল জাতীয় পার্টির সাথে রাষ্ট্রপতি কথা বলবেন। এরপর প্রেসিডেন্ট হামিদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধিত অন্যান্য দলের সাথে কথা বলবেন।

প্রেসিডেন্টের সাথে এই সংলাপের জন্য ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রস্তাবের রূপরেখা তৈরি করেছে। বিরোধি দল বিএনপি নির্বাচনের সময়ের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব করবেন। আর নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি বাছাই কমিটির কথা বলবেন যেখানে ৪ জন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও একজন মহিলা প্রতিনিধি ও একজন সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর থাকবেন। জাতীয় পার্টিও তাদের প্রস্তাবে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি তুলে ধরবে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে নির্বাচন কমিশন । নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় বেসামরিক ও পুলিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইসি’র হাতে । একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কয়েকজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে গঠিত হয় ইসি। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬ জন সদস্য নির্বাচন কমিশনে দেখা গেছে।

সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে এই নির্বাচন কমিশন গঠন করেন রাষ্ট্র্রপতি। তবে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’অন্য দিকে সংবিধানের আরেকটি সংযোজিত অনুচ্ছেদ অনুসারে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকবে।

এই দুই বিধান অনুসারে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার অথবা নির্বাচন কমিশন গঠন দুটি বিষয়েই মূল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। পরিস্থিতির অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন না হলে তিনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। নির্বাচনকালীন সরকারও সেভাবেই হবে।

তবে এর বাইরে আরেকটি বাস্তবতা হলো কোন সরকারের ক্ষমতায় আসা অথবা বিদায় নেয়ার ক্ষেত্রে দেশের ভেতরে ও বাইরে কতগুলো শক্তিমান কেন্দ্রের ভূমিকা থাকে। এসব কেন্দ্র অতীতে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতা অব্যাহত রাখার পক্ষে ভূমিকা রাখার কারণে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের পরও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেছে।

এই ধরনের পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশে দৃশ্যত ঘটেছে বলে মনে হয় না। ২০১৩ সালের বিতর্কমূলক নির্বাচনের পর সরকারের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালে। অর্ধেকের বেশি সংসদ সদস্য এই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্ধন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এবং ভোটারের একেবারে স্বল্প অংশগ্রহণের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশ এই নির্বাচনকে গ্রহণ করেনি। তবে এসব সরকার বাংলাদেশের এই বিতর্কমূলক নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সাথে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশ বাংলাদেশের সরকারকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব সময় অনুশাসনমূলক প্রত্যাশার কথা জানিয়ে এলেও সরকার তা গ্রাহ্য করতে বাধ্য হবার মতো কোন চাপ সেভাবে তৈরি করেনি। বিরোধি দলগুলোও দেশের ভেতরে এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি যাতে সরকার তার মেয়াদের মধ্যবর্তী কোন সময়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।

এই অবস্থার বড় কোন পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন অথবা নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে শেখ হাসিনা যতটুকু ছাড় দেবেন ততটুকু বাস্তবে রূপায়িত হতে পারে। শেখ হাসিনা সংসদে সম্প্রতি দেয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, তিনি গণতন্ত্রের যে ধারা এখন চলছে সেটাকে অব্যাহত রাখতে চান।

এ কথার মাধ্যমে তিনি ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে যে ধরনের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চর্চা শুরু করেছেন সেটাকে অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর অর্থ হলো আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের দল হিসাবে ক্ষমতায় থাকবে। আর সরকার যতটুকু সুযোগ দেবে ততটা রাজনীতি করার সুযোগ পাবে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো।

এই নীতির ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা ততটুকু পর্যন্ত ছাড় দিতে রাজি হবেন যার পর তিনি আবারো ক্ষমতায় আসার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। প্রধানমন্ত্রী কতটা ছাড় দিতে পারেন এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড সূত্র থেকে একটি ধারণা পাওয়া গেছে। এই ধারণা অনুসারে প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে তার জন্য বাছাই কমিটির ব্যাপারে তিনি সম্মত হবেন।

আর এই কমিটিতে বিরোধি পক্ষের প্রস্তাবিত কিছু ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কমিটির মাধ্যমে দশ্যত নিরপেক্ষ বলে ধারণা হতে পারে এমন একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য তিনি নিজের নেতৃত্বে আরেকটি অন্তর্বর্তী ধরনের সরকার গঠন করবেন যেখানে বিরোধি দলের মনোনীত কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তৃতীয়ত, প্রশাসনে কসমেটিক ধরনের কিছু পরিবর্তন আনা হলেও তিনি মৌলিকভাবে যে বিন্যাস বেসামরিক ও পুলিশ প্রশাসনে এনেছেন তা পাল্টাবেন না।

চতুর্থত, বর্তমান সরকারের সময় বিরোধি দলীয় রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে যে মামলা চলছে তা প্রত্যাহারের দাবি তিনি মেনে নেবেন না। তবে প্রতিকী হিসাবে কিছু নেতার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা হতে পারে।

এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচন ২০১৭ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হলে তাতে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে। তবে বিরোধি দল বিএনপি সংসদে যাবার মতো কিছু আসন পাবে। এ সংখ্যা একশ’র নিচে থাকতে পারে। আওয়ামী লীগ এর চেয়ে অধিক কোন ছাড় দেবার চিন্তাভাবনা যে করছে না সেটি জেনেই বিএনপি নতুন সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

নানা ধরনের চাপ এবং সীমাবদ্ধতার কারণে বিএনপির পক্ষে পরিস্থিতিকে নিজেদের ইচ্ছার পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে তাদের মধ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণের একটি প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতির উপরও পড়ার প্রত্যাশা রয়েছে। সে প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হবে সেটি হিসাব নিকাশের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

সুত্র: South asian monitor

এআই