দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা ২য় বারের মত সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। নতুন সরকার শপথ গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যেই অতীতের ন্যায় লাগামহীন অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। খুন-ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই ও সংঘর্ষসহ নানা অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়েছে সংগঠনটি।
অথচ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-র গণ অভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০-র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগ। সংগঠনটির অতীত কর্মকাণ্ড তাই ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে লেখা আছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যখন আওয়ামী লীগ সভাপতি দেশকে উন্নয়নের দিকে নেয়ার চেষ্টা করছেন। ঠিক তখনই উল্টো পথে হাটার কারণে সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্রলীগ। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী সরকার ও মন্ত্রীদের বিপাকেও ফেলেছে  এ ছাত্র সংগঠনটি।
নতুন সরকার শপথ গ্রহনের পর এ ধরণের কর্মকাণ্ড বেড়ে চললেও কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বহিষ্কার করেই দায় সারছেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা। ছাত্রলীগের  অপকর্মের ব্যাপারে মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচারের  কথা জানালেও দু’একটি বিচার ছাড়া অনেক ঘটনার বিচারই হয় না। ফলে ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠনটি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396787755.jpg[/img]
৫ জানুয়ারী নির্বাচনের  মাধ্যমে সরকার গঠনের পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ  ৩১ মার্চ (সোমবার) রাতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ছাত্র সাদ ইবনে মমতাজকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তারা।
জানা গেছে, পরীক্ষার সময় পরিবর্তন নিয়ে ফিসারিজ অনুষদের ছাত্র সাদকে পিটিয়ে জখম করে তারই সহপাঠী ছাত্রলীগ কর্মী সুজয় কুমার কুন্ডু ও রোকনুজ্জামানসহ অন্য বন্ধুরা। পরে চরপাড়া এলাকার ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে মারা যায় সাদ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396787816.jpg[/img]
২ ফেব্রুয়ারী (রোববার) বর্ধিত ফি বাতিল ও সান্ধ্য কোর্স বন্ধের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানার নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র নিয়ে বেপরোয়া গুলি করে ছাত্রলীগ। এতে অন্তত ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন।
সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখাও জন্ম দিয়েছে কয়েকটি বির্তকিত ইস্যু। গত ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগ কর্মী হায়দার আলীকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করে জেলহাজতে পাঠায় শাহবাগ থানা পুলিশ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে চারুকলা অনুষদ সংলগ্ন ছবির হাটে শুটিং ইউনিট থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396787860.jpg[/img]

৪ মার্চ রাতে জুতা চুরিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা  জিয়াউর রহমান হলের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনায় ৯ জন  আহত হন। ওই দিন সংঘর্ষ চলাকালে  রড এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ নেতারা হলে মহড়া দেয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া  কবি জসীমউদ্দীন হল ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান রনি ফেসবুকে নারীদের নিয়ে বিতর্কিত স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ জানিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
পরে আরেকটি স্ট্যাটাস নিয়ে  ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় উপ-আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক লিটন মাহমুদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফরিন নুসরাতের তর্কবিতর্ক হয়। এক পর্যায়ে সেখানে তাদের মধ্যে হাতাহাতি এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
২ মার্চ রোববার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশে প্রথমবারের মতো নারী ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সেদিনই সেখানকার ছাত্রলীগের মধ্যে তুচ্ছ  ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের গুলাগুলিতে ১০ জন গুলিবিদ্ধ হন।
এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনায় সরকারি আযম খান কমার্স কলেজে ছাত্রলীগের দু'গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন আহত হয়। এর একদিন আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের  নেতাকর্মীদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকার গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৪ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396787925.jpg[/img]
এছাড়া ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখার সাধারণ সম্পাদক এস.এম.সিরাজুল ইসলাম ৫ লাখ টাকার টেন্ডারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যানের মাথায় পিস্তল ঠেকায়। সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসানও তার সঙ্গে ছিল। এসময় তারা দুজন মিলে সৈয়দ আলম নামের ওই শিক্ষককে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করেন।
এদিকে ঢাকা কলেজসহ  বিভিন্ন কলেজে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের এ সংঘর্ষের কারণ হলো- হল দখল, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও চাঁদাবাজির টাকা ভাগ-বাটোয়ারাসহ নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ড। এ নিয়ে কয়েকদিন আগেও ঢাকা কলেজের নেতার্মীদের মধ্যে সঘর্ষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজসহ  বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের  চাঁদাবাজির কারণে অতিষ্ট  ওইসব এলাকার ব্যাবসায়ীরা। হোটেলে ফ্রি খাওয়া, ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা আদায়, শার্ট-প্যান্ট নিয়ে টাকা না দেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ।
এছাড়া রেল ষ্টেশন ও বিভিন্ন গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি এবং জমি দখল তো আছেই। বিভিন্ন গণমাধ্যম এ নিয়ে বিভিন্ন সময় বেশ গুরুত্বসহকারে খবরও প্রকাশ করা হয়েছে।
বিগত মেয়াদে মহাজোট সরকারের সময়ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের লাগামহীন কর্মকাণ্ডে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের দায়িত্ব থেকে ইস্তফাও দেন। এরপরও লাগামহীন ছাত্রলীগ পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে, যার অপকর্মের ব্যাপ্তি সরকারের পুরো সময়েই বিদ্যমান ছিল। আর এখনও চলছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেলিন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের কোন অঙ্গ সংগঠন নয়। তাদের কর্মকাণ্ডের দায় তাদেরই। এ ব্যাপারে তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করেন।
ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আল মাহমুদ তারেক টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ছাত্রলীগ সংগঠনটি অনেক বড়। তারপরও আমাদের মধ্যে কোন দ্বন্দ-সংঘাত নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে আমরা কেন্দ্র থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেই।
ছাত্রলীগের উপ-দফতর সম্পাদক সুমন কুণ্ড টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ছাত্রলীগে পদ পজিশন দেয়ার সময় আমরা তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেই। কিন্তু আমরা বলবোনা যে আমরা ১০০ ভাগ সঠিক। তবে বর্তমানে আমাদের নেতাদের অন্যায় কমে আসছে। দলের কর্মীরা কোন অন্যায় করলে তদন্ত করি। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে আমরা তাদেরকে বহিষ্কার করি।
এ ব্যপারে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
[b]ঢাকা, এমআর, ৬ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই[/b]