বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখল করে থাকার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই সমপ্রচার নীতিমালা তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা।

ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত বিএনপির এই নেতার দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল মানুষের মত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে অবৈধ সরকার আজ জাতির ঘাড়ে এমন এক স্বেচ্ছাচারী নীতিমালা চাপিয়ে দিচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমূলে বিনাশ করারই শামিল।

এই নীতিমালার লক্ষ্য কেবলমাত্র গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের অবৈধ দখলদারিত্বকে নির্বিঘ্ন করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষ আরও অসহনীয় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কবলে নিপতিত হবে। সুতরাং এই নীতিমালার বিরোধিতা করা কেবলমাত্র সাংবাদিক সমাজ বা বিরোধী দলেরই দায়িত্ব নয়, গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষেরই উচিত তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে এসব স্বৈরতান্ত্রিক অপচেষ্টা রুখে দেয়া। এটা করতে ব্যর্থ হলে শিগগিরই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক অকল্পনীয় অন্ধকারে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তিনি। 

সাদেক হোসেন খোকা আরও বলেন, গত ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। অবৈধ সরকার তার খুশিমতো কিছু লোককে বিজয়ী ঘোষণার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা ডাকাতি করেছে মাত্র।

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, নির্বিচার গুলির বিপরীতে গতানুগতিক আন্দোলন দিয়ে বর্তমান সরকারকে বিদায় করার চিন্তা ভুল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে ভিন্নরূপের স্বৈরশাসক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এই সরকার যে গতানুগতিক আন্দোলনকে তোয়াক্কা করে না, তার প্রমাণ ইতিমধ্যে একাধিক দফায় মিলেছে।

গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী গুলি চালিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষ হত্যা করা তাদের কাছে এখন কোন ব্যাপারই না। অতীতে কখনও এই ভূখণ্ডে এমন ভয়ঙ্কর সরকার দেখা যায়নি। দেশে আজ ভিন্নমতাবলম্বী কোন মানুষেরই নিরাপত্তা নেই।

সুতরাং সরকারের অপকৌশল পুরোপুরি অনুধাবন করে সেই মোতাবেক নতুন ও কার্যকর কৌশলের আন্দোলনে নামতে হবে। সম্ভাব্য সেই আন্দোলন অহিংস হবে, নাকি সহিংস হবে- তা নির্ভর করবে সম্পূর্ণরূপে সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নির্বিচারে গুলি চালানোর যে নিষ্ঠুর রেওয়াজ বিগত দিনে এই সরকার চালু করেছে, তা অব্যাহত থাকলে সংগত কারণেই অহিংস আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগরী বিএনপির দীর্ঘদিনের এই প্রধান কাণ্ডারি বলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পদ-পদবি কোন স্থায়ী বিষয় নয়। সময়ের বিবর্তনে ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে দলীয় পদসমূহে পরিবর্তন ঘটবে- এটাই স্বাভাবিক। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত বা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হতাশা ব্যক্ত করে বিশিষ্ট এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পরও গণতন্ত্রের জন্য আমাদেরকে লড়াই করতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নিরপরাধ মানুষকে অকাতরে জীবন দিতে কিংবা রক্ত ঝরাতে হচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। দুর্ভাগ্য হলো, আজকের ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধুয়া তুলে গোটা দেশের মানুষকে আজ জিম্মি করে ফেলেছে।

কেউ সরকারের বিরোধিতা করলেই তাকে রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়ে প্রকৃত বাস্তবতা আড়াল করার কূটকৌশল নিয়েছে। সরকারের বাইরে থাকা বাকি সকল রাজনৈতিক শক্তিকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হিসেবে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

বহির্বিশ্বের যেসব বন্ধু রাষ্ট্র এমন অগণতান্ত্রিক আচরণের সমালোচনা করছে, তাদেরও যা খুশি তা-ই বলা হচ্ছে। বিরোধী জোটের শীর্ষস্থানীয় সকল রাজনীতিককে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। সার্বিকভাবে দুনিয়ার বুকে বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সাদেক হোসেন খোকা বলেন, আজ এটা পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সুদূরপ্রসারী এক অশুভ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ২০০৮ সালের সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধ্বজাধারী এই ফ্যাসিস্ট সরকার কার্যত তার প্রতিটি পদক্ষেপের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লক্ষ্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করে দিয়ে একদলীয় স্বৈরশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

একাধিক দফায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী এবং সর্বশেষ টানা এক দশক ঢাকার মেয়রের দায়িত্ব পালনকারী এই রাজনীতিক বলেন, গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার দেশের সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই ধ্বংসের কাজ অনেকখানি সম্পন্ন করে ফেলেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্র বা জনগণের না হয়ে দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।

এটা এখন পরিষ্কার যে, রাষ্ট্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের দলীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার বানানোর জঘন্যতম অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে সরকার। এ কারণে দেশ বা জনগণের স্বার্থ তাদের কাছে খুবই গৌণ। তাদের একটাই লক্ষ্য, যে কোন মূল্যে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা। জাতি হিসেবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনা বাস্তবায়ন করতে চাইলে তাদের এই দানবীয় খায়েশ কিছুতেই পূরণ হতে দেয়া যাবে না।

সদ্যপ্রণীত সমপ্রচার নীতিমালার সমালোচনা করে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, অতীতে কোন স্বৈরশাসক, এমনকি সামরিক সরকারও এ ধরনের গণতন্ত্র বিনাশী নীতিমালা তৈরি করেনি। অথচ গণতন্ত্রের নামধারী এই ফ্যাসিস্ট সরকার অবলীলায় এমন একটি নীতিমালা তৈরি করেছে, যেটি বাস্তবায়ন হলে দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে আদতে কিছুই থাকবে না।

তিনি বলেন, এই নীতিমালার লক্ষ্য নিছক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা নয়, এর প্রকৃত লক্ষ্য হলো সরকারবিরোধী সব রকমের তৎপরতার পথ রুদ্ধ করে দেয়া। সুতরাং এই নীতিমালার বিরোধিতা করা কেবলমাত্র সাংবাদিক সমাজ বা বিরোধী দলেরই দায়িত্ব নয়, গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষেরই উচিত তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে এসব স্বৈরতান্ত্রিক অপচেষ্টা রুখে দেয়া।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, গত ৫ই জানুয়ারির আগে বিএনপি তথা বিরোধী দলের আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি। সরকারের নজিরবিহীন সর্বগ্রাসী দমন অভিযানের পরও জনগণের আন্দোলন সফল হয়। সে কারণেই তাদের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন প্রচেষ্টা ভণ্ডুল হয়ে গেছে।

ওই দিন বাংলাদেশে কোন নির্বাচন হয়নি। তারা ১৫৩টি আসনে লোকদেখানো নির্বাচনও করতে পারেনি। বাকি ১৪৭ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে সেসব আসনেও কোন নির্বাচন হয়নি। একতরফাভাবে সরকারের পছন্দসই কিছু লোককে বিজয়ী ঘোষণার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা ডাকাতি করা হয়েছে মাত্র।

রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলের এমন নজির দুনিয়াতে বিরল। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা যত খুশি মানুষ হত্যার পথ বেছে নেয়। এমন ভূমিকার মধ্য দিয়ে সরকার প্রকৃতপক্ষে একটি গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এখনও সরকারি দলের নেতারা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিচ্ছে যে, শেখ হাসিনা জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে কেউ ক্ষমতা থেকে নামাতে পারবে না। এসবের মধ্য দিয়ে তারা সহিংসতাকেই উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, একটি অবৈধ নির্বাচনী নাটকের মাধ্যমে ক্ষমতা জবরদখলকারী এই সরকারের প্রতিটি কাজই অবৈধ। এ জন্য একদিন তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। প্রজাতন্ত্রের যেসব কর্মচারী এই অবৈধ শাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে, তারাও বিচার এড়াতে পারবে না।

সুতরাং জনগণের করের টাকায় যারা বেতন-ভাতা নেন, তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে দেশে একটি বৈধ ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান দেয়া।

ঢাকা, ১০ আগষ্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ