বিএনপি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে দলটির প্রধান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন। জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে বৃহত্তর প্লাটফরম গঠনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে ‘চা-চক্রে’ বসবেন খালেদা জিয়া। ঐক্যের আগে এ প্রাক-বৈঠকে কাউকে চিঠি দেওয়া হবে না। বিএনপিপ্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে আমন্ত্রণ জানাবেন।
বিএনপির জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে জিমিয়ে পড়ছে । ইতোমধ্যে একটি মামলায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের সাজা হয়েছে। খালেদা জিয়ার একটি মামলার রায় দেওয়ার কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়ার পথ সহজ হবে না হবে না। বিএনপি যেসব দলের সঙ্গে আলোচনার কথা বলছে, তাতে আওয়ামী লীগও খুব একটা বিচলিত নয়। তারা মনে করছে, বিএনপি যা করতে চাচ্ছে তা সরকারবিরোধী প্লাটফরম ছাড়া কিছুই নয়। তবে এই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক রূপ নিতে গেলে বিএনপির প্রতি সরকারের কঠোরতা আরও বাড়বে। সোমবার একটি মামলার চার্জশিটে নাম অন্তর্ভুক্ত করে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে পলাতক দেখিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এটাও এক ধরনের চাপ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানিয়েছে, চা-চক্র প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিকরা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলকেও এতে আমন্ত্রণ জানানো হবে না। এ দুই জোটের বাইরের দলগুলোর সঙ্গে প্রথমে বৈঠক করবেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে বৃহত্তর ঐক্যের মূল কাজ শুরু হবে। বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে আওয়ামী লীগসহ নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে।
একটি সূত্র বলছে, খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন। রোববার রাতেও তিনি দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে কথা বলেন। কয়েক দিনের মধ্যে অন্য দলের সঙ্গে কথা বলে তাদের চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানাবেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে ড. কামাল হোসেন বন্দুকের ব্যবহৃত গুলির খোসা। খালেদা জিয়া ৯০ দিন অবরোধ করে পরাজিত এক বিধ্বস্ত সেনাপতি। তারা দুজন একমঞ্চে উঠলে আমরা উপভোগ করব।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দীন আহমদ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী রোববার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক করেন। এতে সিদ্ধান্ত হয় জাতীয় ঐক্য বা বৃহত্তর প্লাটফরম গঠনের লক্ষ্যে শিগগিরই বিএনপি সমমনা বিভিন্ন দলকে আমন্ত্রণ জানাবে। এ ছাড়া জামায়াতকে এই প্রক্রিয়ার বাইরের রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লন্ডন থেকে শনিবার দেশে ফেরেন। তার ফেরার পর ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়।
এমাজউদ্দীন আহমদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘খালেদা জিয়া চা-চক্রের জন্য কাউকে চিঠি দেবেন না। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে আমন্ত্রণ জানাবেন।’
বিএনপির এই আমন্ত্রণে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, সিপিবি, বাসদকে চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হবে। এ জন্য দুজন বুদ্ধিজীবী ও দলের মহাসচিব অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের বার্তা নিয়ে দুই বুদ্ধিজীবী কয়েকটি দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলবেন। সেখানে চা-চক্রের দিনণ সম্পর্কে তাদের মতামত নেওয়া হবে। সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে তারা আবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়া তাদের টেলিফোনে চা-চক্রের আমন্ত্রণ জানাবেন বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের বিষয়টি সার্বিকভাবে সমন্বয় করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সূত্র জানায়, প্রথমত দুই জোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চা-চক্রে কী প্রক্রিয়ায় জাতীয় বা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা যায় সে ব্যাপারে তাদের পরামর্শ ও মতামত নেওয়া হবে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে নিয়ে তাদের বক্তব্য শুনবেন খালেদা জিয়া। ঐক্যের ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পেলেই দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ শুরু হবে। এ পর্যায়ে মতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের শরিকসহ সব রাজনৈতিক দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
জানতে চাইলে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমন্ত্রণ পেলে তারা বৈঠকে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে চাননি তিনি।
প্রশ্ন ছিল, বিএনপি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিনা। কৌশলী জবাবে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক কিছু হলে তা মিডিয়া জানতে পারবে।
এদিকে বিএনপির জাতীয় ঐক্যকে ফাঁদ হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের মতে, জেনে-বুঝে আওয়ামী লীগ কেন বিএনপির পাতা ফাঁদে পা দিতে যাবে। কারণ দলটির নেতারা একটা জনপ্রিয় ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য করতে চাচ্ছে। মূলত এই ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মানি লন্ডারিংয়ের মামলার রায়সহ দলটির সিনিয়র নেতাদের মামলার বিষয়টি অগোচরে রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ তা হতে দেবে না। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাই বিএনপি যেটা করতে চাচ্ছে সেটা সরকারবিরোধী প্লাটফরম ছাড়া কিছুই হবে না।
এই প্লাটফরমের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে আওয়ামী লীগে। দলটির বেশিরভাগ নেতাই মনে করেন, আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল এবং জাতীয় পার্টিকে বাদ দিয়ে বিএনপি কীভাবে জাতীয় ঐক্য করবে? যদি বিএনপি জামায়াতকে বাদ দিয়ে সিপিবি, জাসদ (রব), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম নিয়ে ঐক্য করে তাহলেও সেটি তো হবে একপেশে ঐক্য। যেখানে সরকারি দল আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, এমনকি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জাসদ, ওয়াকার্স পার্টি, তরিকত ফেডারেশনের মতো দলগুলো থাকছে না। যে কারণে জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বিএনপির দৌড়ঝাঁপ নিয়ে চিন্তিত নয় শাসক দলের নীতিনির্ধারকরা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ উল আলম লেনিন এ বিষয়ে গতকাল বলেন, আমরা প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। বিএনপি যদি কোনো চা-চক্রের আয়োজন করে, সেখানে যদি সিপিবি, গণফোরাম যেতে যায় যাক। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কারণ আমরা মনে করি না, তারা চা-চক্রে বসলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে বা বড় কিছু একটা হয়ে যাবে। কারণ, যে দলের শীর্ষ নেতারাই আদালতের রায়ে দ-িত অপরাধী তাদের সঙ্গে চা-চক্র করে আর যাই হোক নৈতিকভাবে জাতীয় ঐক্য গড়ো তোলা যায় না।
একই বিষয়ে দলটির উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা আমাদের মতো এগিয়ে যাচ্ছি। জঙ্গিবাদবিরোধী এই লড়াইয়ে জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা-প্রশ্রয়দাতাদের সঙ্গে আমাদের বসার দরকার নেই।
এমবিএইচ





