এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে জাতীয় পার্টি। সম্প্রতি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি নয়, দেশের মানুষ আবার জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়।
এরশাদ মনে করেন, প্রধান দুই দলের ওপর দেশের জনগণ বিরক্ত। এই দুই দলকে বাংলাদেশের জনগণ আর চায় না।
এক অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, ঘরে ঘরে গিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, বৃদ্ধ-যুবক, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীকে জিজ্ঞেস করুন। তারা বলবে আপনার সময়ে সবচেয়ে ভালো ছিলাম। আবার আপনাকে চাই।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল ৫ জানুয়ারির 'একতরফা' নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক ভুলের কারণে সে সুযোগ হাতছাড়া করেছেন তিনি। আর এ রকম ফাকা মাঠ আসবে কী না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
জানা গেছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। নজর রেখেছেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের দিকেও।দুই দলের মধ্যে যার পাল্লা ভারী হবে সেদিকেই ঝুঁকবেন এমন চিন্তা নিয়েই এগুচ্ছিলেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। কিন্তু বিএনপি জোটের চলমান আন্দোলনের গতি সরকার পতনে বাধ্য করতে না পারায় নিজের দলকে শক্তিশালী করার কথাই ভাবছেন তিনি।
তিনি মনে করেন জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় আসার বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, সঠিক নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসবে। আল্লাহ আমাদের সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা হাতছাড়া করা যাবে না। ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবো। অস্ত্র আর দুর্নীতির জন্য নয়, মানুষের কল্যাণে ক্ষমতায় আসতে চাই। তিনি বলেন, আমরা মানুষ মেরে ক্ষমতায় যাওয়াকে বিশ্বাস করি না। তাই আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছি।
জাপা চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আগুন আর মানুষ হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। সম্প্রীতি আর ঐক্যের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, আমরা যে নয় বছর দেশ শাসন করেছি তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ।
তিনি বলেছেন, ‘আর কারও লেজুরবৃত্তি নয়, এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাবো। না পারলে পার্টি শেষ হয়ে যাবে। আমি সৈনিক, আমি জানি কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, আমি জানি কিভাবে পার্টি ক্ষমতায় আসবে।
তবে এরশাদের এই স্বপ্নকে রঙ্গীন স্বপ্ন বলে মনে করেন বিশ্লষকরা।
কলামিষ্ট আবদুর রহমান বলেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদের বর্তমান বয়স ৮৫ বছর ও তার বেগমের বয়স ৮০ বছর। তারা ৯ বছর ক্ষমতায় থেকে ২৪ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকার গ্লানিতে ভুগছেন। তাদের অনেক দিনের খায়েস ছিল আবার ক্ষমতায় যাওয়ার।
তিনি বলেন, এরশাদ ২০১১ সাল থেকে ঘোষণা দিয়ে আসছেন ২০১৪-এর নির্বাচনে এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ১৫১ আসন পেয়ে ক্ষমতায় যাবেন। আওয়ামী লীগের ভুলে এবং ২০ দলীয় জোটের নির্বাচন বর্জনের কারণে এই বৃদ্ধ জেনারেলের ভাগ্যে ২০১৩ সালে শিকে ছিঁড়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল।
তিনি যদি ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করতেন, তাহলে নির্বাচনী মাঠের যে ফাঁকা অবস্থা ছিল তাতে তার দলের পক্ষে ১৬০-১৭০টি আসনে জয়ী হওয়া অসম্ভব ছিল না। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা সত্ত্বেও মতিয়া চৌধুরী, শামসুল হক টুকু, কামাল মজুমদার, ইলিয়াস মোল্লা প্রমুখ কারচুপির আশ্রয় না নিলে অখ্যাত প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হতেন।
কিন্তু এরশাদ নিজের ছোট ভাইসহ দলে তার বিশ্বস্ত অনুসারীদের বিভ্রান্ত করে আপস রোগে আক্রান্ত হয়ে সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হলেন। নিজের লোকদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়ে তিনি নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগকে ১৫৪টি আসন দিয়ে ক্ষমতাসীন করলেন কেন? তার এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী না দেয়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তার বেগমকে বিরোধী দলের নেতা বানানোর প্রহসন বর্তমান সঙ্কটের একটা বড় কারণ। তাই তাকে বর্তমান সঙ্কট মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, আল্লাহ এরশাদকে অনেক হায়াত দিয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদের ৫৮ বছর চাকরি, ৩৩ বছর রাজনীতিতে বিচরণ কম কথা নয়। তিনি সঙ্কট মোচনে ভূমিকা না রেখে ২০১৯ পর্যন্ত কিভাবে সরকারে থাকা যায়, সেই প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, যা জনগণের কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০১৯ সালে তার বয়স হবে ৯০ বছর ও তার স্ত্রীর বয়স হবে ৮৫ বছর।
একজন বাঙালি ৯০ বছর বেঁচে থাকলেও নেতৃত্বদানের মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকে না। এর বড় উদাহরণ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো এবং ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তো। এরশাদ যদি ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের সংসদ থেকে দলবল নিয়ে পদত্যাগ করে বেরিয়ে এসে জনগণের কাতারে শামিল হন, তাহলে তার অতীত কলঙ্কের কিছুটা হলেও মোচন হবে।
জেএ





