চলমান আন্দোলনে সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই দিশেহারা হয়ে তারা কথিত বন্দুকযুদ্ধ ও বিচারিক হত্যায় মেতে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।
বুধবার এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, গণহত্যা ও জুডিশিয়াল কিলিং করে তারা বিরোধীজোটকে নেতৃত্ব শূণ্য করতে চায়। কিন্ত গণতন্ত্র পূনরুদ্ধার ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মানুষ যখন আত্মদানের সিদ্ধান্ত নেয় সেই মহাসংগ্রামকে কেউ অস্ত্রের শক্তি দিয়ে দমিয়ে রাখতে পারেনা।
জনগণের জানমাল রক্ষায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নিজের জীবণ বাজি রাখার কথা থাকলেও বর্তমানে এসব বাহিনীর সদস্যরা গণহত্যাকারীতে পরিণত হয়েছে।
সরকারের অব্যাহত জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে মহানগরী আমীর বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার শান্তিপূণ গণআন্দোলনে ভীত হয়ে সরকার প্রতিদিনই রাজধানীসহ সারাদেশে গণগ্রেফতার চালাচ্ছে। গ্রেফতারের পর থানায় নিয়ে চালানো হচ্ছে বর্বর নির্যাতন।
এর ধারাবাহিকতায় রাজধানীর মিরপুর থেকে রুপনগর থানা আমীর আব্দুল্লাহ আল মাহমুদসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করে জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে দুই পায়েই গুলি করে পুলিশ।
এছাড়া ধানমন্ডি থেকে ছাত্রশিবিরের কাউছার আলম মাশরুক নামে এক কর্মীকে গ্রেফতার করে তার পায়ে গুলি করেছে পুলিশ। তিনি এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি আছেন। এছাড়া রামপুরা থেকে ৩ জন এবং ওয়ারি এলাকা থেকে ২ জন জামায়াত ও ছাত্রশিবির কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এছাড়া গত রাতে যৌথবাহিনী উত্তরা ও গুলশানে অভিযান চালিয়ে পৃথকভাবে ৪ জন পথচারীকে গ্রেফতার করেছে। যৌথবাহিনীর নির্যাতন থেকে সাধারণ মানুষ ও পথচারীও আজ নিরাপদ নয়। এদিকে, মাওলানা আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে কথিত মানবতাবিরোধী ন্যায়ভ্রষ্ট রায়ের প্রতিবাদে মৌচাকে শান্তিপূর্ণ মিছিলে ব্যাপক গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ।
সেখানে ২ জন গুলিবিদ্ধিসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক কর্মসূচীতে বাধা দিয়ে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ন্যাক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। গণতন্ত্রের জন্য যারা জীবন দিতে পারে, পৃথিবীর কোন শক্তিই জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। যারা মৃত্যুর চেয়ে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসে, তারা কোন ফ্যাসিষ্ট, স্বৈরাচারী শক্তির কাছে মাথা নত করবে না।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, জীবন যেখানে দ্রোহের কথা বলে, মৃত্যু কিংবা জুলুম-নির্যাতন করে সেখানে অপ্রতিরোধ্য চেতনাকে স্তব্ধ করা যাবে না। গণমানুষের বৈপ্লবিক আন্দোলনকে প্রতিহিংসার আগুন দিয়ে থামানো যায় না, যাবে না।
জুলুম-নির্যাতন দ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে কখনো দমাতে পারে নি বরং যুগে যুগে তা এক গণ বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহই সরকারের পতন ত্বরান্বিত করবে।
মহানগরী আমীর বলেন, সরকারের তীব্র বাঁধা, হুমকি-ধামকি, জুলুম-নির্যাতন, গণগ্রেফতার সত্ত্বেও লাগাতার অবরোধ ও ২য় দফা ৪৮ ঘন্টা হরতালের প্রথম দিনে আজ রাজধানীর মৌচাক, মিরপুর, রুপনগর, মালিবাগ, পল্টন, মতিঝিল, উত্তরা, ধানমন্ডি, নদ্দা, ভাটারা, গুলশান, তেঁজগাও, মগবাজার, যাত্রাবাড়ি, সবুজবাগ, রমনা, মহাখালি, খিলগাও, পুরান ঢাকার কোতয়ালী, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়াসহ বিভিন্ন থানা ও এলাকায় জামায়াতের কর্মীরা মিছিল, পিকেটিং ও রাজপথ অবরোধ করে।
শাসকদলের বেআইনী আদেশে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করায় সরকারীদলের নেতা-কর্মীদের পরিবর্তে এসব বাহিনীর সদস্যরাই এখন জনঘৃণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
আন্দোলনের গতি প্রকৃতি সামাল দিতেই সরকার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ফাঁসির রায় ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা করে আন্দোলনকারী জনতাকে ভয় দেখাতে চায়।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আরো বলেন, দেশের বর্তমান সঙ্কটের একমাত্র কারণ দখলদার অনির্বাচিত সরকার। বিরোধীদলের আন্দোলনকে কলুষিত করতেই সরকার তার বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে সহিংসতা করছে।
চলমান জাতীয় সঙ্কট থেকে মুক্তির এমাত্র পথ সরকারের নিঃশর্ত পদত্যাগ। হত্যা, নির্যাতন অব্যাহত রাখতেই গত মঙ্গলবার আইন শৃংখলা সম্পর্কিত মন্ত্রীসভা কমিটির বৈঠকে চলমান দমন নীতি আরো একমাস অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়্।
কমিটির সভাপতি শিল্পমন্ত্রী বলেছেন দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কিন্তু তার পরের ঘন্টাতেই মন্ত্রীসভার কমিটিতে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। এই ঘটনায় র্যাব, পুলিশ, বিজিবি প্রধানসহ প্রতিটি হত্যার হুকুমের আসামী হবেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে সরকার গঠন করতে দেয়ার পর এখনও নির্বাচন কমিশন সরকারের রাজনৈতিক ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই জনতার আন্দোলন থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করছে।
বিএনপি-জামায়াতকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে অপপ্রচার করে সরকার আদালতের মাধ্যমে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও নির্বাচনে অংশ নেয়া কমিশনের নিবন্ধিত দলদুটিকে নিষিদ্ধ করতে চায়। দেশকে বিরোধীদল শূণ্য এবং হত্যা, নির্যাতন আর দলন নীতি চালিয়ে সরকার শেষ রক্ষা পাবেনা।
শিগগিরই সারাদেশ থেকে আসা জনতরঙ্গে রাজধানী প্লাবিত করে দখলদার সরকারকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। চলমান গণআন্দোলনের চূড়ান্তপর্বে সবাইকে আরো সাহসিকতা ও ত্যাগের মনোভাব নিয়ে ইতিহাসের অমোঘ বাঁকবদলে অবদান রাখার আহবান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের ২ নম্বর আদালতে সাবেক সংসদ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর পাবনা থেকে বার বার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুস সুবহানের ফাঁসির বিষয়ে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, একদলীয় শাসন টিকিয়ে রাখতেই রাজনৈতিক চাতুরীর অংশ হিসেবেই আদালতের মাধ্যমে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে কথিত যুদ্ধাপরাধের সাজানো মামলায় সাদা দেয়ার মাধ্যমে সরকার নিজেই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করছে।
সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা বিস্তারসহ ব্যাপকভিত্তিক সমাজ উন্নয়নের কারণেই মাওলানা আবদুস সুবহান পাবনা থেকে জনপ্রতিনিধি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামের অপরাপর শীর্ষনেতাদের মত মাওলানা আবদুস সুবহানকেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। লোভ বা ভয়ভীতি দেখিয়ে এই দলের নেতা-কর্মীদের আদর্শের সংগ্রাম থেকে সরানো যাবেনা।
সরকার পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিরোধ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর করতে তিনি নগরীর সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, সাংবাদিক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারক ও ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-ছাত্র, আইনজীবী, মেহনতি মানুষ, কৃষক, শ্রমিকসহ সকল পেশা ও শ্রেণীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান।
সেই সঙ্গে গণতন্ত্র ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হিসাবে অবরোধ এবং রাজধানীসহ সারাদেশে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত টানা ৪৮ ঘন্টা হরতালসহ সকল কর্মসূচী সফল করতে রাজধানীর সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে মাঠে নেমে আসার পাশাপাশি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থেকে মিথ্যাচার ও কারসাজিকে মোকাবিলা করে তাদের হৃত অধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে অটল থাকার আহ্বান জানান।
এসএইচ





