বর্তমান নির্বাচন কমিশন কার্যত মুক ও বধির হয়ে বসে থাকা তিন বাদরের মতো ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান। তাদের অবস্থা গল্পের সেই বিখ্যাত তিন বাদরের মতো যেখানে দেখা যায় একটি বাদর কানে হাত দিয়ে, একটি চোখ চাপা দিয়ে এবং অপরটি মুখে হাত দিয়ে পাশাপাশি বসে আছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনাররাও সেই তিন বাদরের মতো যেন কিছু শুনছেন না, দেখছেন না এবং বলছেন না।  

বুধবার রাতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের জনপ্রিয় লাইভ টকশো “মুক্তবাকে” অংশ নিয়ে এসব মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক মুনীরুজ্জামান।

তিনি বলেন, এমনটি করার কোন দরকার ছিল না। কারণ সাংবিধানিকভাবে এই নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। তারপরও তাদের কিসের এত ভয়? কমিশনারদের চাকুরিচ্যুত বা বের করে দেয়ার কোন সুযোগই নেই। কারণ সাংবিধানিকভাবে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এমন কিছু করার এখতিয়ার সরকারের নেই। তারপরও কমিশনের এমন ভয়ের বিষয়টি বোধগম্য নয়।

“ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য এই নির্বাচন যে অবস্থার সৃষ্টি করছে তা হলো – পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনই হোক বা অন্য কোন নির্বাচনই হোক এই একই অবস্থা থাকবে এবং সহিংসতা ও মারামারি চলতেই থাকবে।”

খন্দকার মুনীর বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতার নজির সৃষ্টি হচ্ছে তা এক বড় চিন্তার বিষয়। এমনকি মনোনয়নপত্র ক্রয় ও জমা দেয়ার সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যারা দলীয় সমর্থন পেয়েছেন তাদের অনেকেই এমনও বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছি মানে জিতে গেছি।

দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন,  এই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন বা সরকারি দল-উভয়ের কেউই কোন নিয়ম কানুন মানছেন না। প্রশাসন তাদের নূন্যতম দায়িত্ব পালন করছে না। এটা কোন নির্বাচনই না। একটি নির্বাচন হতে হলে সেখানে একটি অভয়ের পরিবেশ থাকতে হয়, লেভেল প্লেইয়িং ফিল্ড থাকতে হয়।  

হাসান বলেন, একটা মন্দ নির্বাচন হতে পারে, ভালো নির্বাচন হতে পারে, খারাপ নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু যেখানে অবস্থা হচ্ছে অন্যকে দাঁড়াতেই দেব না, প্রতিপক্ষকে প্রার্থী হতেই দেব না, আমার বিপক্ষে কেউ দাঁড়াতে পারবে না , কথা বলতে পারবে না-সেখানে এটাকে নির্বাচনই বলা যায় না।

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে এখন আওয়ামী লীগের সাথে আওয়ামী লীগের সহিংসতা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে, হতাহতের ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ বিরোধী বিএনপি সমর্থক প্রার্থীদের সম্পূর্ণ বসিয়ে দিয়ে এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্র সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। অথচ পাকিস্তান আমলেও নির্বাচন অন্তত সুষ্ঠু হতো।

হাসান বলেন, এটা একটা চরম উদ্বেগ ও ভয়ের বিষয় – তাহলে কি পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাটাই অচল হয়ে পড়বে, অকার্যকর হয়ে পড়বে। আমরা একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলছি, অপরদিকে নির্বাচনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছি।

এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় মন্তব্য করে হাসান বলেন, এই নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। যারা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারবে তাদেরকে দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে যে একেক অঙ্গনে পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের নামে এক একটি নাটক হবে এবং সেখানে ক্ষমতাসীন বা পেশী শক্তিতে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিরাই কেবল সফল হবেন।

সোহরাব হাসান বলেন, এই নির্বাচন কমিশন অতীতের অভিজ্ঞতার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছেন না। তারা ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশের খুব কম নির্বাচন কমিশনই মান-সম্মান নিয়ে বিদায় নিতে পেরেছেন শুধুমাত্র এ ধরনের বৈষম্য করতে গিয়ে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে কতটা কোমর ভাঙ্গা ও গার্ডলেস তার উদাহরণ দিতে গিয়ে টকশোতে দৈনিক ইত্তেফাকের  ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেছেন, কয়েক দিন আগে একজন নির্বাচন কমিশনার অফিসের প্যাডে দরখাস্ত করে পুলিশের মহা-পরিদর্শকের (আইজি) অ্যাপয়নমেন্ট নিয়ে তার সাথে দেখা করেছেন। অথচ যেখানে পুলিশের আইজি নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করতে বাধ্য। এ ধরনের কমিশনের কাছ থেকে কোন সাহসী ভূমিকা আশা করাই বোকামি।

তিনি আরও বলেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লেভেল প্লেইয়িং ফিল্ড তো দূরের কথা, এই কমিশনের ওপর আস্থা রেখে অনেকে নির্বাচন করতে গিয়ে মনোনয়নপত্রই জমা দিতে পারলেন না  এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেও কোন ফল পেলেন না।

আশিস বলেন, ৯০ এর আগের নির্বাচনে ভোট না দেয়ার যে মানসিকতা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল ক্রমেই পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে। মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ভোট দেয়ার, কারণ যাকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিবে সেই তো জিতে যাবে।

উল্লেখ্য আগামী ২২ মার্চ প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ৭৩২টি ইউনিয়নে নির্বাচন। দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে ১১৯টি ইউনিয়নে বিএনপির কোন প্রার্থীই নেই। এছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রার্থীরা ৬২টি ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

এছাড়া দ্বিতীয় দফায় ৩১ মার্চ যে নির্বাচন হবে সেখানেও ৭৯ ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপি সমর্থক কোন প্রার্থীই নেই এবং ৩১ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এরপর পর্যায় ক্রমে ২৩ মে তৃতীয় দফা এবং সবশেষ ৭ এপ্রিল ৪র্থ দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে উপজেলা নির্বাচন।

কেবি