রাজপথের আন্দোলন সফল করতে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করার জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই কাজ করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। আর এজন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অযোগ্য আর নিষ্ক্রিয়দের বাদ দিয়ে যোগ্য ও ত্যাগীদের দিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি।

দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশে সম্প্রতি দলের যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহানের স্বাক্ষর করা এই চিঠি প্রতিটি জেলা ও মহানগর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো হয়েছে। দলকে অধিকতর সংগঠিত ও সক্রিয় করা প্রসঙ্গে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, যারা ব্যর্থ ও নিষ্ক্রিয় আছেন তাদের সরে যাওয়ার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের কাছে শ্রদ্ধেয়, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে উৎসাহিত করতে হবে।

এছাড়াও চিঠিতে বিগত আন্দোলনে আহত, পঙ্গু, জেল-জুলুম ও মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানানো হয়। এতে বলা হয়, অসংখ্য নেতাকর্মী সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। তারা সীমাহীন ত্যাগ ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আবার অনেক নেতাকর্মীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অক্ষমতা, অযোগ্যতা ও ব্যর্থতাও লক্ষ্য করা গেছে। ভয়ভীতি, ব্যক্তিস্বার্থ ও আপসকামিতা আন্দোলনকে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তাদের এসব কর্মকাণ্ড ও তৎপরতা সাংগঠনিকভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। বিভিন্ন পদে দীর্ঘদিন ধরে অধিষ্ঠিত অনেক পদধারী নেতা দায়িত্ব পালনে অযোগ্য, অনিচ্ছুক, নানা কারণে অক্ষম, ভয়ভীতি ও আপসকামিতার কারণে অথবা ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় এলাকায় অনুপস্থিত থাকায় দলের কার্যক্রম দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাদের অনেকে কোনো দায়িত্ব পালন না করেও নিজেদের পদ ও নেতৃত্ব ধরে রাখার লক্ষ্যে নতুন কমিটি গঠনে এবং যোগ্য ও নতুন নেতাকর্মীদের দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দেননি। উল্টো নানাভাবে সাহসী নেতাকর্মীদের তারা উৎসাহিত কিংবা সহযোগিতা করেননি। এমন কি তারা নিহত-আহতদের পরিবারকে সহমর্মিতা জানানো কিংবা চিকিৎসায় সহায়তা দেয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করেন না। অনেকে কর্মসূচি পালনে নিরুৎসাহিত করেন। যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রমাণিত তাদেরও দলের কোনো সক্রিয় পদ কিংবা দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার নেই।

'যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব এখন সময়ের দাবি' এমন মন্তব্য উদ্ধৃত করে চিঠিতে বলা হয়, 'যারা দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদ ও দায়িত্বে থেকে যে কোনো কারণেই ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের নিজেদেরই পদ ও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিদের দলের পদ ও দায়িত্ব নেয়ার জন্য উৎসাহিত করা উচিত। তারা এই সঙ্গত কাজটি করতে না চাইলে সংশ্লিষ্ট জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা ও পৌর এলাকার সচেতন নিবেদিত ও সংগ্রামী নেতাকর্মীদের দায়িত্ব হবে দলের স্বার্থেই তাদের পরিবর্তে যোগ্যতর, সাহসী নেতাকর্মীরা যাতে দলের পদ ও দায়িত্ব পান, তা নিশ্চিত করা।

দলের অপর একটি সূত্রে আরও জানা গেছে, চিঠি পাঠানোর পাশপাশি দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ২৫ জন কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্বে ২৫টি সাংগঠনিক টিম গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। প্রতিটি টিমেই একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এসব টিমের সদস্যরা শিগগিরই জেলা সফরে বের হবেন। তৃণমূলের কমিটি গঠনের জন্য আয়োজিত সম্মেলনের যাবতীয় সহযোগিতা করবে কমিটিগুলো।

তৃণমূলের চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি পুনর্গঠন করার কথা যে আলোচনা হচ্ছিল এই চিঠির মাধ্যমে তা শুরু করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আর এই পূনর্গঠন কাজ তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়েছে। যাদেরকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। শিগগিরই তারা নির্দিষ্ট জেলা সফরে বের হবেন।

চিঠির বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভুইঁয়া টাইমনিউজবিডিকে বলেন, কেন্দ্র থেকে প্রেরিত চিঠি আমরা পেয়েছি। ত্যাগী ও যোগ্যদের দিয়ে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে তা কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। তিনি আরও বলেন, আমরা কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য খুব তাড়াতাড়ি জেলা নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসব।

তবে নাম প্রকাশে অপারগতা জানিয়ে একটি জেলার সাধারণ সম্পাদক টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে যে প্রক্রিয়ায় তা শুরু হয়েছে তা কোনো কার্যকর উদ্যোগ নয়।

তার মতে, যে সব কেন্দ্রীয় নেতাদের কারণে আন্দোলন ব্যর্থ হলো, শীর্ষ নেতৃত্বের করণীয় ছিল আগে সেইসব কেন্দ্রীয় নেতাদের ডেকে তাদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। তা না করে যারা জীবনবাজী রেখে রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিল সেই তৃণমূলের নেতাদের ওপর খবরদারী করতে আবার কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হলো। এর ফলে কার্যকরী কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না।

এমএইচ/ এআর