বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোইএকটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে অন্তর্নিহিত বাধা। সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা দুরুহ হবে। আর সেক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে সুদূরপরাহত। দশম সংসদের মতো একাদশ সংসদ নির্বাচনও সুষ্ঠু না হলে জাতির ওপর দুর্যোগ নেমে আসবে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে করণীয়’ শীর্ষক ওই গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। গোলটেবিল আলোচনায় সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের করণীয় সম্পর্কে বেশ কিছু সুপারিশ রাখেন বক্তারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সুজন সভাপতি এম. হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, নির্বাচন মানেই সুষ্ঠু নির্বাচন। বর্তমানে শুধু একটি দল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাকিদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। ইসি বলছে, তফসিল ঘোষণার পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হবে। এটা অবাস্তব। কারণ, ৪৫ দিনের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা সম্ভব না। তফসিল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে কোনো বাধা থাকলে তা ইসিকেই দূর করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেত্রীরা দেশের বাইরে গেলে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যান না। আইয়ুব খানও দেশের বাইরে গেলে স্পিকারকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আসলে আমরা গণতন্ত্রের কথা বললেও নিজেরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি না।
সুজন-এর সহ সভাপতি বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইন-বিধি রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ আইন ভঙ্গ করতে উৎসাহ পায়। নির্বাচনে জিততেই হবে এমন মানসিকতা পোষণ করলে কখনই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আইনগতভাবে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন সবচেয়ে শক্তিশালী। তাদের সংবিধানেই প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া আছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তিনি বেশ কিছু সুপারিশ রাখেন। এর মধ্যে মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা আনা, মনোনয়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রশাসনকে দলীয়করণের বাইরে রাখা, নিরাপত্তা ব্যায় না বাড়িয়ে দলগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি করা এবং নির্বাচন কমিশনকে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা করা।
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এমন কিছু বলা উচিত না যেন মানুষের সন্দেহ যেন আরো বাড়ে। তারা বলছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করবে না। সরকার যেভাবে ব্যবস্থা করে দিবে তারা সেভাবে নির্বাচন করবে। এটা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য একটা বক্তব্য। নির্বাচন কমিশন যদি সেনা মোতায়েন করে, রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিরপেক্ষ সরকারি অফিসার দিতে পারে, সবার জন্য আচরণ বিধি তৈরি করতে, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে ভয়ভীতি দূর করতে পারে তাহলে কোনো মধ্যস্থতার দরকার নেই।
তিনি আরো বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে শুধু নাগরিকরা ভীত সন্তস্ত্র থাকে না। সরকার নিজেই ভীত সন্তস্ত্র থাকে। ৩০ জন নিয়েও যদি বাম মোর্চা মিছিল করে সেখানে সরকার হামলা চালায়, ইমরান এইচ সরকার ত্রাণ সংগ্রহের জন্য সমাবেশ করলেও সেখানে হামলা চালায়, বিরোধী দল জনসভা করতে চায় সেখানে সরকার জনসভা করতে দিচ্ছে না। সবকিছু প্রমাণ করে সরকার নিজের অবস্থান নিয়ে ভীত সন্তস্ত্র। তাই একটা সরকারকে সুষ্ঠু-স্বাভাবিকভাবে দেশ পরিচালনা করার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। নির্বাচন কমিশনের ওপর যে দায়িত্ব পড়েছে এবারো আমরা যদি ব্যর্থ হয় তবে বাংলাদেশের আগামী দিনের যাত্রা হবে উত্তর কোরিয়ার মতো কোনো দেশের দিকে।
বিশিষ্ট কলামনিস্ট ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত শুধুই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপ করা। বাকি ৩৯ নিবন্ধিত দলের কথা শুনে কোনো লাভ নেই। কারণ আওয়ামী লীগ না চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। তাই তাদের সঙ্গে বারবার সংলাপে বসে জানতে চাওয়া উচিত নির্বাচনের সময় কি ধরণের সরকার থাকবে, সরকার কি ধরণের সহয়তা দেবে, তাদের কতটুকু চাপের মধ্যে রাখা হবে। সরকারের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসা দরকার। নির্বাচন কমিশনের অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার তারা কতটুকু শক্তিশালী ও কতটুকু অসহায় অবস্থায় রয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি হঠাৎ করে বদলায়। নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ইসিকে তৎপর হতে হবে। অযথা ব্যায় কমাতে হবে। ইসির উদ্যোগে প্রজেকশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার তার মুল প্রবন্ধে বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। অতীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে সবগুলোতেই ক্ষমতাসীনরা জয়ী হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীতে দলীয়করণ আরো চরম আকার ধারণ করেছে। তাই বিরাজমান সাংবিধানিক কাঠামোই সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পথে একটি অন্তর্নিহিত প্রতিবন্ধকতা। এ অবস্থায় সবচেয়ে স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সহজ হবে না।
তিনি বলেন, শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে আমরা পুলিশ-র্যাবকে ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেই। কিন্তু আমরা অতীতে দেখেছি তারাই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা সিল মারে, আরও অনেক কাজে অন্যায়ভাবে সহায়তা করে। নির্বাচনের একটা সিকিউরিটি প্লানের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। সেনাবাহিনী নিয়োগ করে হলেও এটা দরকার। তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে। তার পরিণাম আমরা ভোগ করছি। আমি মনে করি আরেকটা বিতর্কিত নির্বাচন আমাদের চরম সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাবে।
এমবি





