বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ৬৭ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অভিমান নিয়েই চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

ঢাকার দীর্ঘ সময়ের নগর পিতা তার নিজ নগরী থেকে অনেক দূরে থাকা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি। দূর দেশে থাকলেও তার মনটি পড়ে থাকতো ঢাকার বুকেই।

জীবনের শুরুতে বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন অর্জন করেছিলেন পুরান ঢাকার এই নেতা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা বাহিনীর যোদ্ধা থেকে হয়েছিলেন জননেতা, ওয়ার্ড কমিশনার থেকে মন্ত্রী-মেয়র। দীর্ঘ জীবনে ধাপে ধাপে যেন নিজেকে নিজেই ছাড়িয়ে গেছেন সাদেক হোসেন খোকা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের আতঙ্ক ছিলেন এই গেরিলা যোদ্ধা। ঢাকায় তাঁর নেতৃত্বাধীন ইউনিট নিয়ে গেরিলা আক্রমণে তিনি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন তথ্য অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন ও বিমানবাহিনীর রিক্রুটিং অফিস। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিকে যুদ্ধের মনস্তাত্বিক বিজয় বলে উল্লেখ করেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া এই গেরিলা এর আগে ছাত্র আন্দোলনেও কাঁপিয়েছিলেন রাজপথ।

বাম রাজনীতির স্বর্ণযুগে ১৯৬৭ পূর্ব সময়ে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা সদর দক্ষিণের সম্পাদক। পরে মওলানা ভাসানীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদেও বড় ভূমিকা ছিল সাদেক হোসেন খোকার।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও দীর্ঘদিন বাম রাজনীতির করেছেন সাদেক হোসেন খোকা। পরে কাজী জাফরের পিপিপি পার্টি হয়ে ১৯৮৪ সালে যোগ দেন বিএনপিতে। হয়ে উঠেন ঢাকা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হন পুরান ঢাকার এই ওয়ার্ড কমিশনার।

রাজনৈতিক জীবনে ১৯৯১ সালে বড় চমক দেখান খোকা। ঢাকা-৭ আসনে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন তিনি। দলের দুর্যোগেও নিজের দুর্গ ধরে রেখে টানা চার বার সংসদ সদস্য হন। প্রথমে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, পরে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকা অবিভক্ত ঢাকার মেয়র হন। ২০০২ সাল থেকে ২০১১, টানা নয় বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাদেক হোসেন খোকাকে ১৯৯৬ সালেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগরের। করা হয় আহ্বায়ক। পরে ২০০২ সালে হন সভাপতি। নয় বছর সভাপতি থাকার পর ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আবারও ছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক। সর্বশেষ পেয়েছেন দলের ভাইস-চেয়ারম্যানের পদ।

ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে সাদেক হোসেন খোকার। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব নেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের। প্রতিষ্ঠা করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। ছিলেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও ফরাশগঞ্জ ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যানও। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন বহুদিন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে রাজপথে সক্রিয় এই নেতা নির্যাতিত হয়েছেন অসংখ্যবার। কারাভোগ করেছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়। ওই বছরই মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর ৩০টিরও বেশি মামলা মাথায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০১৫ ও ২০১৮ সালে দুর্নীতির দুই মামলায় ১৩ ও ১০ বছরের সাজা হয় বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতার।

১৯৫২ সালের ১২ মে মুন্সীগঞ্জের সৈয়দপুরে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাদেক হোসেন খোকা। তবে পৈতৃকসূত্রে পুরান ঢাকার গোপীবাগই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা।

এএইচ