নানা জল্পনা-কল্পনা আর ক্ষমতাসীন মহলের অনাগ্র সত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বৈঠকের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ।
এই বৈঠক থেকে কী অর্জন করল ৯ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজপথের আন্দোলনের দল বিএনপি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানের কাছে বিএনপি যেরকম প্রত্যাশা করেছে প্রাপ্তিটা সেরকম না হলেও একবারে হতাশ হওয়ার মত নয়।
মোদির সঙ্গে একান্তে কী আলোচনা হয়েছে খালেদা জিয়ার। এ নিয়ে কৌতূহল ক্রমশই বাড়ছে। বিএনপি নেতারাও রয়েছেন অনেকটাই অন্ধকারে। খালেদা জিয়াও এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কোন কথা বলেননি।
তবে তারা বলছেন, বিএনপি নেত্রীকে বৈঠকের পর বেশ উৎফুল্ল দেখা গেছে। এরই প্রেক্ষিতে আলোচনা ফলপ্রসু ও প্রত্যাশিত হয়েছে বলেই দলটির নেতারা মনে করছেন। বিশেষ করে 'বিএনপি ভারত বিরোধী' এই পুরোনো অভিযোগ যে রাজনৈতিক সস্তা কৌশল তা মোদিকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি নেত্রী।
এছাড়াও অতীতে বিএনপি কোনো জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রশ্রয় দেয় নি ভবিষ্যতেও দিবে না সেই বিষয়টিও পরিষ্কার করেছেন খালেদা জিয়া।
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক নিয়ে পানি ঘোলা কম হয়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার দেখা হওয়ার সুযোগ নেই।
যদিও একই দিনে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর পরিষ্কার করেন, বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে মোদির বৈঠক হবে। অবশ্য সাউথ ব্লকে এ নিয়ে বিস্তার আলোচনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বৈঠকের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
নরেন্দ্র মোদি তার দুই দিনের সফরে কোন বক্তব্যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে গণতন্ত্রের কথা উঠেছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির মনোভাব পরে পরিষ্কার করেন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব।
তিনি বলেন, ভারত গণতন্ত্রের পক্ষে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে।
ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণেও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। অতীতে বিএনপিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
যদিও পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রতি ভারতের সমর্থন ছিল। তবে পরে ওই অবস্থান পুরোপুরি উল্টে যায়। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারই ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য সমর্থক ছিল।
বিএনপির একটি অংশের আশা ছিল, নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ ব্যাপারে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে তেমন বক্তব্য-বিবৃতি না আসায় দলটির মধ্যে খানিকটা হতাশাও রয়েছে।
তারপরও নরেন্দ্র মোদি চলে যাওয়ার পরও তার সফর নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কোন ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি।
খালেদা-মোদি বৈঠকের মধ্য দিয়ে বিএনপির অর্জন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, মোদির সঙ্গে বিএনপি প্রধানের সাক্ষাত বর্তমান বিএনপির জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।
এটিই সবচেয়ে বড় কথা। এর মাধ্যমে তাৰক্ষণিকভাবে মোদির প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও নিকট ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হবে।
খালেদা মোদি বৈঠকে বিএনপির প্রাপ্তি কি ? টাইমনিউজবিডির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি তো বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম না। তারপরেও বলতে পারি বিএনপির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিতির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়াও রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানি, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রীও চান এই অঞ্চলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। উনি (মোদি সাহেব) দক্ষিণ এশিয়ায় যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দেখতে চান, গণতন্ত্র ছাড়া তা সম্ভব নয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, মোদির বাংলাদেশ সফর ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে কোনো পরিবর্তনের হাওয়া লাগে কি না তা দেখতে অপেক্ষায় থাকতে হবে।
এছাড়াও বিএনপির প্রত্যাশিত সব দলের অংশ গ্রহণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবীর বাস্তবায়ন হবে কি না তা সময়ই বলে দিবে।
এমএইচ/এসএইচ





