বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে পুলিশের তল্লাশির ঘটনাকে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেছেন, দেশে একটা খারাপ সময় চলছে। আমি বলি সবচেয়ে খারাপ সময় বাংলাদেশের এই সময়টা। কারণ এখানে একটা গণতন্ত্রের মুখোশ পড়ে আছে। যারা দেশ শাসন করছে একটা মুখোশ পড়ে তারা প্রকৃতপক্ষে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেছে। শুধু একদলীয় বললে বোধহয় ভুল বলা হবে, এক ব্যক্তির শাসন ব্যবস্থা চালু করেছে।
সেইসাথে বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বৈরী পরিবেশ বিরাজ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আজো সংবাদমাধ্যম বৈরি অবস্থার মধ্যে কাজ করছে। যা বলতে চায় তা বলতে পারে না, যা লিখতে চায় তা লিখতে পারে না। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এখন বাংলাদেশের। এখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। মানবাধিকার নেই। কার্যকর সংসদ নেই। গোটা দেশের মানুষ জিম্মি।
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল পূর্বানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নবগঠিত কমিটির উদ্যোগে গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে এই শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির যুগ্মমহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ।
মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার ও সিনিয়র যুগ্মসম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- কেন্দ্রীয় নেতা শামছুল হুদা, আনবীর আদেল বাবু, জয়নাল আবেদিন রতন, শেখ রবিউল আলম রবি, লতিফ উল্লাহ জাফরু, আব্দুস সাত্তার, এম এ হান্নান, শাহেদা মোরশেদ, তানভীর আহম্মেদ রবিন, রফিকুল ইসলাম রাসেল, সাইদুর রহমান মিন্টু, স্বেচ্ছাসেবক দলের শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, শ্রমিক দলে শ্রমিক দলের নূরুল ইসলাম খান নাসিম, ছাত্র দলের রাজিব আহসান, মহিলা দলের রাজিয়া আলীসহ মহানগর দক্ষিণ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাগপার মরহুম সভাপতি শফিউল আলম প্রধান ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সহধর্মিনী সাহেরা হোসেনসহ বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নিহত নেতাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় মহানগর বিএনপিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, মহানগর বিএনপি একটি ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। যা আমাদের জন্য প্রয়োজন। আসলে ঢাকা মহানগর বিএনপি নবীণ প্রবীণের সমন্বিত কমিটি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছি। এক্ষেত্রে দেশের সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। অনেক সাংবাদিককে মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হয়েছে। সম্প্রতি আমাদের দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদার অফিসে তল্লাশির খবর আপনারা যেভাবে তুলে ধরেছেন সেজন্য আমি মিডিয়াকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, মিডিয়ার মধ্য দিয়ে গোটা জাতি জানতে পেরেছে, এই সরকার বিরোধী দলের সাথে কী রকম আচরণ করছে। ভারতসহ বিদেশী গণমাধ্যমেও সেই খবরটি এসেছে। আমরা বলতে চাই, এই আক্রমণ দেশনেত্রীর কার্যালয়ের ওপর নয়, এটা গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ, বাংলাদেশের মানুষের ওপর আক্রমণ। আমরা সেজন্য বলেছি, এটা অশনি সঙ্কেত।
তিনি বলেন, আজকে আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছি। একসময় এ দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে সব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আজো বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম বৈরী অবস্থার মধ্যে কাজ করছে। যা বলতে চায় বলতে পারে না, যা লিখতে চায় লিখতে পারেনা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এখন বাংলাদেশের। এখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। মানবাধিকার নেই। কার্যকর সংসদ নেই এবং সেখানে একটা গৃহপালিত বিরোধী দল রয়েছে। গোটা দেশের মানুষ এখন জিম্মি। যদিও গোটা বিশ্বে মানুষ জিম্মি। গায়ের জোরে ক্ষমতাকে সবাই ধরে রাখছে।
সৌদি আরবে সম্মেলন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, সৌদি আরবে একটা খুব বড় সম্মেলন হচ্ছে। এই সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো। যাদের প্রধান হয়ে ওখানে উপস্থিত হয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। পৃথিবীর সব মানুষই জানেন তিনি কী করছেন, কী কথা বলছেন। আজকে দুর্ভাগ্য আমাদের, সেইখানে আজকে এই ট্রাম্প প্রায় সভাপতিত্ব করছেন বলা যায় এবং সেখানে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে পরিকল্পনা করছেন কিভাবে তারা ইসলামিক এক্সট্রিমিজমকে প্রতিরোধ করবেন।
সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের সাথে আমেরিকার একটা চুক্তি হয়ে গেছে সাড়ে ৭শ’বিলিয়নের অস্ত্র সোদি আরব কিনবে আমেরিকার কাছ থেকে। এক আধ বিলিয়ন নয়, দিস ইজ দ্যা লার্জেস্ট ডিল। আজ পর্যন্ত যতগুলো ডিল হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ডিল হচ্ছে এটি। এই যে একটা পরিস্থিতি সমগ্র বিশ্বজুড়ে, এই যে একটা মানুষের অধিকার হরণ করবার যে একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে, স্বাধীনভাবে কথা বলবার, সব কিছুর ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে, সেসময়ে গণমাধ্যমে মুক্ত চিন্তায় দায়িত্ব পালন অত্যন্ত দুরুহ বলে আমরা মনে করি।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, শনিবার আমাদের দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এমনকি ভারতের গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে লেখা হয়েছে। বলা হচ্ছে কার্যালয়ে তল্লাশি গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। আমরা যখন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছি, নতুন ধারার রাজনীতির জন্য কাজ করছি তখন সরকার গণতন্ত্রের ওপর আঘাত করছে। তাকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য, তাকে সমূলে নির্মূল করে দেয়ার জন্য সরকার এই কাজটি করেছে। নয়া পল্টন কার্যালয়ে আমরা নিয়মিত অফিস করছি। স্বাভাবিক কাজ করছি। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই সেখান থেকে প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে তুলে নিচ্ছে। এসবের কোনো কৈফিয়ত নেই। এ অবস্থা চলতে পারে না।
খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশি মানে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা আগামী বুধবার এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি জনসভা করতে চাই। জানি না তারা করতে দেবে কি দেবে না। তবে আমরা বিশ্বাস করি সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে আমরা অনুমতি পাবো।
অনুষ্ঠানে ২০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পাটি-জাগপা সভাপতি মরহুম শফিউল আলম প্রধানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, মিডিয়া আমাদের পরম বন্ধু। বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে আমাদেরকে নানাভাবে গণমাধ্যম সহযোগিতা করেছে। একটি দেশকে সুসংগঠিত করতে সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের ভুমিকা অবিস্মরণীয়।
সভাপতির বক্তব্যে হাবীব উন নবী খান সোহেল বলেন, আমাদের সামনে বিক্ষুব্ধ সমুদ্র অপেক্ষা করছে। এ সমুদ্র পাড়ি দিতে হলে গণমাধ্যমের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক অবশ্যই দরকার। আজকে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। জনগণকে সাথে নিয়েই আমরা এসব মোকাবিলা করছি। আর পাশে আছেন গণমাধ্যমের বন্ধুরা। কারণ প্রেস এন্ড পিপলের মাঝে যোগাযোগ না থাকলে সফলতা আসবে না।
তিনি বলেন, মৃত গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হলে রাজপথে আন্দোলন ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। সেই আন্দোলন গড়ে তুলতেই মহানগর দক্ষিণ প্রস্তুত। আমরা অতীতে সফল হয়েছি, আগামীতেও আমরা সফল হবো ইনশাল্লাহ। সহায়ক সরকারের অধীনে একটি চূড়ান্ত আন্দোলনই কেবল বাকি। আমরা চাই সব মানুষের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। আমাদের সংকল্প বৃথা যাবার নয়। এভাবেই আগামীর পথ চলতে চাই।
এমবি





