একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের জনগণকে আস্থায় আনতে চাইছে আওয়ামী লীগ। উদ্দেশ্য ভোটের মাঠে বিএনপি জোটকে কুপোকাত করে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়া। এ জন্য মাঠে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে ক্ষমতায় থাকা এ দলটি।

নেতারা মনে করছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যেমন বিতর্ক আছে, তেমিনভাবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আবার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে নেতা-মন্ত্রী, এমপি এবং দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতিসহ একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের মানুষ অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। ফলে নির্বাচনের আগেই জনগণকে আস্থায় এনে ভোটের মাঠে লড়তে চায় ক্ষমতাসীন দলটি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে দেশের বেশিরভাগ মানুষ ভোটে অংশ নিতে না পারায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় নেতা-মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতি, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি, মানব সেতুর ওপর দিয়ে জুতা পায়ে হাঁটা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল ও তাদের ওপর নির্যাতন, ওলামা-মাশায়েখদের খেপিয়ে তোলাসহ নানা বিতর্কে জড়িয়ে জনগণের বিরাগভাজন হয়েছে আওয়ামী লীগ।

এসব নেতিবাচক ইমেজ কাটিয়ে উঠতে নতুন আঙ্গিকে কাজ করছে দলটি। এ জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা সুযোগ পেলেই গ্রামগঞ্জে দৌড় দিচ্ছেন। আর ঢাকামুখী জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের আশীর্বাদ পাওয়ার আশা নিয়ে এলাকায় ভেড়ার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় স্কুল-কলেজ, মাদরাসার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে অনুদান দিচ্ছেন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ, গরিব অসহায় মানুষকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়াসহ এলাকার উন্নয়নে অংশীদার হতে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছেন নেতামন্ত্রীরা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দেশের বড় বড় ফাইওভার নির্মাণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস বিরোধী জোটে অংশগ্রহণ, দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠী ও ধর্মীয় উগ্রবাদ দমনসহ সরকারের নানামুখী সফলতার চিত্র জোরালোভাবে তুলে ধরছেন তারা।

বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের আনুকূল্য পেতে সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণের ঢোল পেটাচ্ছেন সরকারি দলের লোকজন। বাংলাদেশকে নিয়ে সরকারের মাস্টার প্লানের কথাও তারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তুলে ধরছেন। দলটির নেতাদের মতে, দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে। আগে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ৬০০ ডলার, এখন তা ১৫ শ’ ডলারের উন্নীত হয়েছে।

গত আট বছরে খাদ্য আমদানির দেশ এখন খাদ্য রফতানি করছে, ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতেও দেশ এগিয়ে গেছে। বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। তৃণমূল পর্যায়ে ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। সেখান থেকেই সারাবিশ্ব ঘুরে আসতে পারে মানুষ। তরুণরা ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। দেশ এখন মধ্যম আয়ে প্রবেশ করছে। এসব প্রচারণা এখন নেতাদের মুখে মুখে।

এ ছাড়াও আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ওলামা মাশায়েখদের সাথে দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীনরা। এরই মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, দেশের ইসলামপন্থী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আওয়ামী লীগের ইমেজ ভালো না।

গত কয়েক বছরে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন, ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ এবং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিপীড়ন পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে। সরকার একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে জনমত জরিপ করে দেখতে পায় বেশির ভাগ মানুষই সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমকে ইসলামীবিরোধী হিসেবে মনে করে।

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে ভোটের ওপর এর প্রভাব ফেলবে। এ অবস্থায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনোভাবের পরিবর্তন আনতে গেলে প্রচারণার ওপর জোর দেয়ার পাশাপাশি ওলামা-মাশায়েখদের আনুকুল্য পাওয়া খুবই প্রয়োজন বলে সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়।

এ জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ব্যানারে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এরই মধ্যে ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং হেফাজতের শীর্ষ নেতা আল্লামা শফীসহ বিশিষ্ট ওলামা-মাশায়েখদের সাথে গণভবনে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতিও দেয়া হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আনুকূল্য পেতে সৌদি সরকারের অর্থায়নে দেশের ৬৪টি জেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

নেতারা মনে করছেন, ওলামা-মাশায়েখদের মাধ্যমে এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মন জয় করতে পারলেই কেবল আগামী জাতীয় নির্বাচনে নৌকার পক্ষে জোয়ার সৃষ্টি হবে। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আগামী নির্বাচনে বড় সাফল্য পেতে চায় ক্ষমতাসীনরা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে যে পরিবর্তন হয়েছে গত ৪০ বছরেও তা হয়নি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে এখন আর কুড়েঘর নেই, কুড়ে ঘর এখন কবিতায়, গল্পে আছে। কুড়েঘর এখন টিনের চালা, বিল্ডিং হয়েছে। প্রতি ইউনিয়নে হাজার খানেক মানুষ সরকারি ভাতা পাচ্ছে।

আমরা মনে করি না দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ ছাড়া এখন অন্য কাউকে সমর্থন করতে পারে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন আমাদের যে কর্মপরিকল্পনা, তাহলো মানুষকে দেশের পরিবর্তনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়া। তিনি বলেন, দেশের অবস্থান কোথায় ছিল, আগে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান কোথায় ছিল, এখন কোথায় আছে তা স্মরণ করিয়ে দেয়া।

পাশাপাশি মানুষ যাতে তুলনা করতে পারে আমাদের সাথে অন্যদের পার্থক্য কোথায়। যারা জ্বালাও পোড়াওয়ের রাজনীতি করেছে, যারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে আর যারা দেশের উন্নয়ন করেছে তারা কি এক হতে পারে, তারা কি আগামী দিনে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেতে পারে? সেই বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়ার তা আগেই নিয়ে নিয়েছে। এটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেকোনোটি হতে পারে। সামনের দিনগুলোতে যদি আওয়ামী লীগ তাদের গতি পরিবর্তন করে, নমনীয় হয় তাহলেও জনমতের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হচ্ছে না।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে চলছে সামনের দিনগুলোতে এটি যদি অব্যাহত রাখে তাহলেও যেসব মানুষ আওয়ামী লীগকে এতদিন সমর্থন দিয়ে আসছে তারাও বিভ্রান্ত হবে না। আবার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছে শত চেষ্টা করেও তাদের আনুকূল্য পাওয়া সম্ভব হবে না।

এমএনজে