ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বেশির ভাগ নেতাই কার্যত ব্যবসায়ী। বেশ কয়েকজন চাকরিজীবীও আছেন। সংগঠনের কাজে সময় দেওয়ার মতো নেতার অভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। ফলে সংগঠন বেহাল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মীও। এ অবস্থায় চোখে পড়ার মতো কোনো কর্মসূচিই পালন করতে পারছে না ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও পালন করা হয় কেবল আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে বা ঘরোয়াভাবে কেক কেটে। অবস্থা এমন যে, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বশেষ সভা কবে হয়েছে সেটাও জানে না অনেক কেন্দ্রীয় নেতা।

ছাত্রলীগের দুজন সহসভাপতি ও দুজন সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত সর্বসম্মতভাবে সংগঠনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির নেই। কেন্দ্রীয় কমিটির শেষ সভা কবে হয়েছে সেটাও তাদের জানা নেই।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছাত্রলীগের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতাই ব্যবসায়ী। সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন ২০-২৫ জন। ব্যবসায় যাঁরা জড়িত তাঁদের মধ্যে আছেন ছাত্রলীগের কয়েকজন সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভিন্ন সম্পাদক, উপসম্পাদক। তবে বেশির ভাগ নেতাই ব্যবসা করছেন পুঁজি ছাড়া। ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা- এ পরিচয়ই তাঁদের ব্যবসার মূলধন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছাত্রলীগের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতার মূল ব্যবসা হলো টেন্ডার বাণিজ্য। যদিও ঠিকাদারি লাইসেন্স আছে হাতেগোনা কয়েকজনের। অন্যরা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সরকারি দপ্তরে গিয়ে কাজ বাগিয়ে আনার পর তা বিক্রি করে টাকা নেন। চাঁদাবাজি, দখলবাজি আর তদবির বাণিজ্যও রয়েছে অনেকের। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচিত হয়েছেন সংগঠনের কেউ কেউ। তাঁদের মধ্যে সহসভাপতি রেজাউল করিম রাসেল কালিয়াকৈর উপজেলার চেয়ারম্যান হয়েছেন।

জানা গেছে, ছাত্রলীগের সহসভাপতি জয়দেব নন্দী জগন্নাথ হলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ বাণিজ্য করেন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক প্রশ্নপত্র ফাঁস করাসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সহসভাপতিদের মধ্যে রিয়াজউদ্দিন সুমনের একটি প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি আছে রাজধানীর মুগদাপাড়ায়। মোখলেসুর রহমান সুমন ইটভাটার মালিক। শাহীন আহমেদ আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় জড়িত। আলী আশরাফ, রেজাউল করিম রেশিম ও নাজমুল হুদা চঞ্চল ঠিকাদার। মাসুদ হাসান তূর্ণ প্রেসের ব্যবসা করেন। শাহিনুর রশিদ সোহেল ও মফিজুল আলম রিজভী রেন্ট-এ কার ব্যবসায়ী। রাকিবুল ইসলাম জুয়েল মিরপুরে ব্যবসা করেন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে এহতেশামুল হক রুমের কুমিল্লায় গ্লোবাল প্যাকেজিং লিমিটেড নামে একটি ফ্যাক্টরি রয়েছে। আবদুর রহমান জীবন টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত। নবিরুজ্জামান বাবু কোচিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদ আলম টিটু ও আরো দুজন ব্যবসা করেন। এ ছাড়া প্রচার সম্পাদক শাহরুক মিরাজ ছাপাখানার ব্যবসা করেন। উপপ্রচার সম্পাদক আমিন কতোয়াল ঠিকাদারির সঙ্গে জড়িত। প্রকাশনা সম্পাদক নবেন্দু সাহা চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন সরকারি কাজের ওপর থেকে চাঁদা তোলেন। আন্তর্জাতিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। পাঠাগার সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দীপু বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। উপ-গণযোগাযোগ সম্পাদক অস্ত্র মামলায় জেলে আছেন।

ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে ২০-২৫ জন দীর্ঘদিন আগে চাকরিতে যোগ দিলেও সহসভাপতি ওয়াসিম উদ্দিন জুয়েল ছাড়া অন্যরা সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেননি। চাকরিতে থেকেও তাঁরা নিয়ম বহির্ভূতভাবে সংগঠনের পদ আঁকড়ে রেখেছেন। ছাত্রলীগ সহসভাপতিদের মধ্যে চাকরিতে আছেন মেজবাহ উদ্দিন(বিসিএস-পরিবার কল্যাণ), মহিউদ্দিন মিয়া (বিসিএস-কাস্টমস), আজিজুর রহমান মানিক(প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা), উত্তম কুমার দাশ(আকিজ গ্রুপ), ওয়াসিম উদ্দিন জুয়েল(এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক), সুলতানা নাসরিন রুমি(ইউনিয়ন ব্যাংক)। অন্যদের মধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদিত জাহান সৈকত(জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক), সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হক তমাল(এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক), কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক রাহুল পাটওয়ারি(এএসপি), উপদপ্তর সম্পাদক রাশেদুজ্জামান(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কর্মকর্তা), উপশিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক শরিয়তউল্যাহ লিটন(সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার), উপসমাজকল্যাণ সম্পাদক শাহিন আক্তার ইকবাল(এনএসআই কর্মকর্তা), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ইমরান(বিসিএস-ইকোনমি) ক্যাডারে কর্মরত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পাদক মো. জাবেদ(চিকিৎসক), উপসাহিত্য সম্পাদক সুমাইয়া সুলতানা টুপুল(সমবায় কর্মকর্তা), উপসাহিত্য সম্পাদক তরিকুল ইসলাম ও শহিদুল্লাহ মামুন(পুলিশের এসআই), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মহিউদ্দিন মাহি(জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক)।

জানতে চাইলে চাকরিজীবী বেশির ভাগ নেতাই বলেন, পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেননি তাঁরা।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক ও পাঠাগার সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জীবনে এসব কাজের সঙ্গে তাঁরা ছিলেন না, এখনো নেই। এগুলো তাঁদের বিপক্ষে অপপ্রচার। দুজনই বলেন, তাঁদের নামে এ অভিযোগের কথা তাঁরা প্রথম শুনলেন। আন্তর্জাতিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এটা অপপ্রচার।

প্রকাশনা সম্পাদক নবেন্দু সাহার বক্তব্য জানার জন্য মোবাইল ফোনে কল করা হলে অন্য একজন ফোন ধরে বলেন, নবেন্দু সাহা কথা বলবেন না।

এদিকে ছাত্রলীগ নেতাদের অনেকে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্যেও জড়িত বলে অভিযোগ আছে। সম্প্রতি ভর্তি নিয়ে ঢাকা কলেজসহ সারা দেশে কয়েকটি কলেজে মারামারি-ভাঙচুরেও লিপ্ত হন ছাত্রলীগ নেতারা। সূত্র: কালের কণ্ঠ।

ঢাকা, ০৪ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস