মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ২৩ জুন। সেই সঙ্গে ৬৭ বছরে পা রাখছে ঐতিহ্যবাহি এ দলটি।

প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ দলটির নেতৃত্বেই এদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বিশ্বের বুকে বীরের জাতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। রোজগার্ডেনে জন্মগ্রহণের পর থেকে নানা লড়াই, সংগ্রাম, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়।

দলের মূলনীতি:
বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার হল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস:
শওকত আলীর অনুরোধে কলকাতা থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি মামলা পরিচালনার কাজে ঢাকায় এলে তিনি শওকত আলীকে মুসলিম লীগ ছেড়ে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। শওকত আলী এ পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে 'পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবির'র নেতৃবৃন্দকে নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন।

সেই প্রেক্ষিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের কর্মী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলি/স্বামীবাগের কেএম দাস লেন রোডের ১৫০, রোজ গার্ডেন প্যালেসে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

পরবর্তীতে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ১৯৫৫ সালে দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' থেকে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ'র জন্ম হয়।

১৯৭১ খ্রীস্টাব্দে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে  বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এই সংগঠনটির নামাকরণ করা হয় 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ'। ১৯৭০ খ্রীস্টাব্দ থেকে এর নির্বাচনী প্রতীক নৌকা।

প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটি:
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, কর্মী শিবিরের প্রধান নেতা টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক (পরবর্তীতে তিনি নিরুদ্দেশ হলে তাকে আর পাওয়া যায়নি), শেখ মুজিবুর রহমানকে (কারাবন্দি ছিলেন) যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করে গঠিত হয় আওয়ামী লীগের প্রথম কমিটি। ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এখন পর্যন্ত তিনিই সভাপতি রয়েছেন।

আন্দোলনে আওয়ামী লীগ:
আওয়ামী লীগের আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ র্কীতি হচ্ছে ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয়।

এছাড়া আন্দোলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি। এই ৬ দফা আন্দোলনের পথ বেয়েই সূচিত হয় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের পর এক অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা ও বর্তমানে প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ৬ দফার পক্ষে রায় দেয় দেশবাসী। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্থানী শাসকচক্র বাঙালির হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে টালবাহানা শুরু করে।

৬৬ বছরের পথপরিক্রমায় দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটিকে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরুতে হয়েছে। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ১৯৫৪ সালে (যুক্তফ্রন্ট), ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, দ্বিতীয় দফা ১৯৯৬, ২০০৯ সর্বশেষ ২০১৪ সালে সরকার গঠন করে।
দলে ভাঙন ও বিভক্তি:

দীর্ঘ যাত্রাপথে ১৯৫৭ সালে প্রথম এবং পরবর্তীকালে কয়েক দফা ভাঙাগড়ার শিকার হয় আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় সভাপতি হন শেখ হাসিনা। এই মধ্যবর্তী সময় দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন সাজেদা চৌধুরী।

২০০৭ এ ওয়ান-ইলেভেন এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের জরুরি অবস্থার সময় নিজে কারান্তরীণ থেকেও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আওয়ামীলীগকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাড়ঁ করান শেখ হাসিনা।২০০৮ এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের রূপকল্প- ২০২১ দেয়ার মাধ্যমে মহাজোট গঠন করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি:
দলের ৬৬ বছর পূর্তিতে সূর্য উদয় ক্ষণে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭ টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধঞ্জলি নিবেদন। সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, পায়রা উন্মুক্ত ও বেলুন উড়ানো হবে।

এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভায় জাতীয় নেতরা ও দেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ইআর/ এআর