পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৭৮, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির আনুষ্ঠানিক জন্মদিন। জাগদলের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র রমনা পার্কের খোলা চত্বরে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ নামে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন। এর রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ১৯ দফা কর্মসূচি নিয়ে পথচলা শুরু করে বিএনপি। পথচলার ৩৭ বছরে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম আর নানা চড়াই- উতরাই অতিক্রম করে বিএনপি আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

দলটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায়, সদ্য স্বাধীন দেশে অনৈক্যের অবসান করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনিই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশের মতো সদ্য স্বাধীন একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। তাই রাজনীতিতে এসে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী দর্শনের ভিত্তিতে জন্ম দেন বিএনপির। তিনি মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হন, বিএনপি একটি উদার ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল। ফলে মানুষ দলে দলে বিএনপিতে যোগ দেয়। স্বল্প সময়েই বিএনপি পরিণত হয় একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে।

উন্নয়ন-উৎপাদনের রাজনীতিকে মূল প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে ১৯ দফা কর্মসূচির আলোকে প্রতিষ্ঠার ৫ মাসের মাথায় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০টি আসন লাভ করে রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে দলটি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর বিপথগামী একাংশের হামলায় জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলটির হাল ধরেন।

এদিকে সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও দল গোছানোর ব্যাপারে নিজেদের নামের প্রতি খুব একটা সুবিচার করতে পারেনি তারা। সাংগঠনিকভাবে শক্তি অর্জনের চেয়ে জনগনের দল হিসেবেই পরিচিতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। যার ফলে দেশের জনগণও যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই ক্ষমতায় বসিয়েছে দলটিকে। এজন্য বিএনপি জনগণের ভোটে সর্বাধিক ৪ বার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে।

সর্বশেষ ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৫ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন।

১/১১-এর পালাবদলের পর বিএনপিকে প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমান। এছাড়াও দলের অনেক সিনিয়র নেতাকর্মীদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়। ১/১১-এর অবসানের পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে আরো নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

এরপর ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল। একতরফা নির্বাচনে আবারো ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। দীর্ঘদিন পরে সংসদের বাইরে চলে যায় বিএনপি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও এখনও বিএনপিকেই ক্ষমতাসীনরা নিজেদের প্রধান প্রতিপক্ষ বলে মনে করে। সংসদে না থাকলেও বর্তমান সরকারের সব রাজনৈতিক আলোচনায়, সংসদে বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে বিএনপির প্রসঙ্গ। জনগণের প্রত্যাশারও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এ দলটি।

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিতে গণতন্ত্র হত্যা দিবস নামে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে আবারো আন্দোলনে নামে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। কিন্তু দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকার পরও দলের নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে আন্দোলনে সফল হয়নি দলটি। টানা তিনমাস রাজপথের আন্দোলনের বিরতি দিয়ে আবারো ব্যাকফুটে চলে যায় দলটি। দল গুছিয়ে ফের আন্দোলন করা হবে নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর বিবৃতি ও সংবাদ সম্মেলনসহ ঘরোয়া কর্মসূচি নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে দলটি। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে।

এদিকে, জাতীয় কাউন্সিলের সময় পার হয়ে গেলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হয়নি। যদিও ঈদের পর থেকে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার মিশন নিয়ে কাজ শুরু করেছে শীর্ষ নেতৃত্ব। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তৃণমূলের কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তৃণমূল গুছিয়ে চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় কাউন্সিল করার চিন্তা রয়েছে দলটির। সেই কাউন্সিলেই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নিয়োগ দেয়াসহ গঠনতন্ত্রে আরও কিছু সংযোজন-বিয়োজন করার চিন্তা রয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে সুদীর্ঘ ৩৭ বছর বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকা খুব সহজ কথা নয়। বিএনপি এই কঠিন কাজটি করতে পেরেছে তার গণমুখী ভূমিকা বজায় রাখার মাধ্যমে এবং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে। এই দল কখনো দেশ শাসন করেছে, আবার কখনো নিয়মতান্ত্রিক বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, কখনোবা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে নানা ক্রান্তিকাল বিএনপি পার করে এসেছে। ওয়ান-ইলেভেনের সে সূত্র ধরে এখনও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিএনপি। সাম্প্রতিক সময়ে সে লড়াই হয়ে উঠেছে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্য আগামী দিনে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা সত্যিই চ্যলেঞ্জের বিষয়। বিএনপিকে সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশল দিয়ে।

এমএইচ/ এআর