আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা হচ্ছে না মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের। এমনকি সংসদ সদস্যরাও পদপ্রাপ্তির দৌড়ে পিছিয়ে রয়েছেন। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন সাবেক ছাত্রনেতারা। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে এমনটিই জানা গেছে।
দলটির শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিম-লীর প্রথম সভা ডাকা হয়েছে। ওই সভাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বাকি ৩৮টি পদে কারা আসবেন।
শুক্রবারের ওই বৈঠককে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন পদপ্রত্যাশী সাবেক ছাত্রনেতারা। সভাপতিম-লীর কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের বাসা ও অফিসে তারা ধরনা দিচ্ছেন। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, পদপ্রত্যাশী নেতাদের অত্যাচারে মোবাইল ফোন খোলা রাখতে পারছি না। সেজন্য অনেকেই নম্বর বন্ধ পাচ্ছেন। আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত এই অবস্থা চলবে বলে মনে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকম-লীর একটি পদেও কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী জায়গা পাবেন না। এরই মধ্যে ২৭টি পদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত নামের তালিকায় একজনও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই। অথচ এর আগের কমিটিতে ওই পদগুলোয় মন্ত্রিসভার যেসব সদস্য ছিলেন, দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তারা এবার বাদ পড়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তবে কার্যনির্বাহী সদস্যপদে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থাকতে পারেন।
আওয়ামী লীগের আরেক কেন্দ্রীয় নেতা এ বিষয়ে বলেন, দল ও সরকারকে আলাদা করার একটা চিন্তা আওয়ামী লীগের ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটা একটু কঠিন কাজ। এবারের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে আস্তে-ধীরে ওই প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তিনি বলেন, সভাপতি পদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক পদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সভাপতিম-লীতে কৃষিমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ছাড়া মন্ত্রিসভার আর কোনো সদস্যকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে না রাখার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে দলে।
ওই নেতা আরও বলেন, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমন্ডলীতে যারা আছেন তাদের মূল কাজ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখা। অন্যদিকে সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য ও কার্যনির্বাহী সদস্যদের কাজ দলের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা। সে কারণে এবারের কমিটির সম্পাদকমন্ডলী ও সদস্যপদে মন্ত্রিসভার সদস্য, এমনকি এমপিদের না রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। তারপরও ভৌগোলিক কারণে কিছু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদে রাখা হতে পারে।
আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, ২০তম জাতীয় সম্মেলন-পরবর্তী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে মূল্যায়িত হবেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা। এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সদ্য ঘোষিত কিছু পদের উদাহরণ টেনে ওই নেতারা বলেন, এবারের কমিটিতে গত কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য থেকে পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আবদুর রহমান এমপি। তিনি ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন একেএম এনামুল হক শামীম। তিনি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন। শুধু তাই নয়, সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আলম মাহমুদ স্বপন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে।
এবারের কমিটিতে সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন অসীম কুমার উকিল। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের অন্যতম এ ছাত্রনেতা ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা। দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের নেতা। নারী ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রলীগ নেত্রী ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করা বাদ দিয়ে ইডেন কলেজে পুনরায় ভর্তি হয়ে ১৯৭৩-৭৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নের রমরমা সময়ে ইডেন কলেজের ভিপি নির্বাচিত হন। ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। শিক্ষা সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা ১৯৮১ সালে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের জিএস নির্বাচিত হন।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলটির সম্পাদকমন্ডলী এবং সদস্যের যে ৩৫টি পদের বিষয়ে আগামীকাল শুক্রবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে, সেখানেও বেশিরভাগ পদে আসছেন সাবেক ছাত্রনেতারা। এরই মধ্যে উপযুক্ত ছাত্রনেতাদের জীবনবৃত্তান্ত ও তাদের হালনাগাদ তথ্য বিভিন্ন সংস্থা এবং দলের নেতাদের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই শেষে নেতাদের সঙ্গে পর্যালোচনা করে বাকি পদগুলো ঘোষণার অনুমতি দেবেন। শুধু তাই নয়, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক হিসেবেও দেখা যাবে সাবেক ছাত্রনেতাদের। তবে উল্লেখযোগ্য কিছু পদে নারী নেত্রীদের দেখা যাবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে এবারের কমিটিতে সহ-সম্পাদকের পদসংখ্যা একশর মধ্যে রাখা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৮১টি পদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। সভাপতিমন্ডলীর ১৯টি পদের মধ্যে ফাঁকা আছে ৩টি। সম্পাদকম-লীর ৩৪টি পদের মধ্যে ২৭টি পদে নেতাদের নাম ঘোষিত হয়েছে, বাকি আছে সাতটি। এ ছাড়া কার্যনির্বাহী সদস্য পদে ২৮টি পদের সব কটিই অঘোষিত রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ফাঁকা আছে ৩৮টি পদ। এই পদগুলোর বিষয়ে আগামীকাল শুক্রবার গণভবনে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে আলোচনা হবে।
সূত্র: আমাদের সময়
জারিফ





