প্রথম ধাপের ন্যায় ইউপি নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপেও বন্ধ হয়নি রক্তের খেলা।

গতকাল ব্যাপক সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, জোর করে সিল মারা, ব্যালট বাক্স ছিনতাইসহ নানা অনিয়মের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। বোমাবাজি ও গুলিবর্ষণে অন্তত আটজন নিহত এবং গুলিবিদ্ধসহ কয়েক শ’ আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে তিনজন, যশোরে তিনজন, জামালপুরে একজন, মাদারীপুরে একজন ও ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক স্কুলছাত্র রয়েছে। নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিরোধী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের কেন্দ্র থেকে মারধর করে বের করে দেয়া ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে বিএনপির অনেক চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। এ ছাড়া বেশ কিছু কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।

সন্দ্বীপে নিহততিনজন

চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সন্দ্বীপ সংবাদদাতা জানান, দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতায় বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া ইউনিয়নে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পুলিশসহ বেশ কয়েকজন। নিহতরা হলেন জামাল উদ্দিন (৩২), ইব্রাহিম (২৫) ও সানাউল্লাহ (২৭)। তাদের বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।

প্রত্যদর্শীরা জানান, সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিল্লুর রহমান দুপুরে তার আনারস প্রতীকে প্রকাশ্য ভোট দেয়ার ঘোষণা দেন। এরপর জিল্লুর রহমানের সাথে সদস্য প্রার্থী কে এই ভোট কারচুপিতে থাকবেন, তা নিয়ে সদস্য প্রার্থী সাহেব আলী ও বেলাল উদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে পুলিশ এসে সংঘর্ষ থামাতে ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই জামাল ও ইব্রাহিম নিহত হন। সন্দ্বীপ হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান সানাউল্লাহ। সদস্য প্রার্থী সাহেব ও বেলাল উভয়ে নিহতদের নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন।

যশোরে নিহততিনজন

যশোর থেকে সংবাদদাতা জানান, যশোর সদর উপজেলায় গতকাল নির্বাচনী সহিংসতায় একজন নিহত ও গুলিবিদ্ধসহ দু’জন আহত হয়েছেন। নিহতের নাম আবদুস সাত্তার বিশে (৭০)। এ ছাড়া নির্বাচনের আগের রাতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে আহত দু’জন গতকাল ভোরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তারা হলেন সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের কাঠামারা গ্রামের রমজান আলীর ছেলে ইবাদুল ইসলাম (৩৮), একই গ্রামের আনার উদ্দিনের ছেলে সবুজ (২৯)। সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগে সদর উপজেলার অন্তত ছয়টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

গতকালের নির্বাচনে শাসক দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমাবাজি, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগে অন্তত ছয়টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ভোট কারচুপিতে সহযোগিতার অভিযোগে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা তিনজন প্রিজাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে আটক করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ যুবলীগ কর্মীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের চাঁচড়া ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বোমাবাজি ও গোলাগুলিতে ফেরিওয়ালা আবদুস সাত্তার বিশে নিহত হন এবং আবদুল হক (৫৬) আহত হয়েছেন। পরে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। নিহত আবদুস সাত্তার বিশে যশোর শহরের খোলাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা। আহত আবদুল হক চাঁচড়া মধ্যপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে।

যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, স্থানীয় বিল্লাল মেম্বর ও লালের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা বোমা হামলা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছে। উল্লেখ্য, স্থানীয় বিল্লাল মেম্বর ও লাল আওয়ামী লীগ নেতা।

জামালপুরে নিহত ১

জামালপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার মেলান্দহে নির্বাচনী সহিংসতায় রফিকুল ইসলাম (৫০) নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের উত্তর বালুরচর কেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের সময় ওই ব্যক্তি প্রাণ হারান। তবে পুলিশ বলছে, সংঘর্ষে নয়, ওই ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপারে সিল ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের অভিযোগে মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নে মামা-ভাগ্নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং একই উপজেলার চরবানী পাকুরিয়া ইউনিয়নের রায়েরবাকাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র স্থগিত ঘোষণা করেছে প্রশাসন। জামালপুর সদর ও মেলান্দহ উপজেলায় ২৫টি ইউপি নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে সেলিম মিয়া গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চার রাউন্ড টিয়ার শেল এবং অন্তত ১৫ রাউন্ড শটগানের গুলি ছুড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এ দিকে কেন্দ্র দখল ও জোর করে ব্যালট পেপারে সিল দেয়ার অভিযোগে মেলান্দহ উপজেলার নাংলা ইউনিয়নের বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল হক জঙ্গী, মাহমুদপুর ইউনিয়নের বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী নূরে আলম তালুকদার, আদ্রা ইউনিয়নের বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও ফুলকোচা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মঞ্জুরুল ইসলাম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

জামালপুর সদরের কালীবাড়ি, শাহবাজপুর, ইটাইলসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দিয়ে সরকারদলীয় প্রার্থীর পে সিল মারার অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীরা।

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, ঢাকার কেরানীগঞ্জে ঢালিকান্দি এলাকায় মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গতকাল সকাল ১০টায় নির্বাচনী সহিংসতায় শুভ নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। তার বাবার নাম হালিম কাজী। শুভ ঢালিকান্দি মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। শিশুটির পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সকালে সে তার মা-বাবার সাথে মধুরচর ভোটকেন্দ্রে আসছিল। এ সময় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক সন্ত্রাসী রানা মোল্লার নেতৃত্বে গুলিবর্ষণ কালে গুলিবিদ্ধ হয়ে শুভ ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এ ঘটনার পরে ভোটকেন্দ্রটিতে বিজিবি, র‌্যাব ও ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, মাদারীপুরে নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতায় পুলিশের গুলিতে এক যুবক নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নে দক্ষিণ বীরাঙ্গল গ্রামে সংঘর্ষে সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের বীরাঙ্গল গ্রামের বাচ্চু মৃধার ছেলে সুজন মৃধা নিহত হন। নিহত পরিবারের দাবি পুলিশের গুলিতে সুজন নিহত হয়েছে।

ভোলা ও চরফ্যাসন সংবাদদাতা জানান, কেন্দ্র দখলের অভিযোগে ভোট বেশির ভাগ বিএনপি প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট বর্জন, কেন্দ্র প্রভাব বিস্তার নিয়ে মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ব্যাপক জাল ভোটের মধ্য দিয়ে ভোলার চারটি উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।।

দুপুরের দিকে সদরের রাজাপুর ও পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নে পৃথক সংঘর্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে পুলিশের মিস ফায়ারে এনটিভি প্রতিনিধি আফজাল হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

এ ছাড়াও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন।

নোয়াখালী সংবাদদাতা জানান, জোর করে এজেন্ট বের করে দেয়া, ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা, মহিলা ভোটারদের লাঞ্ছিত করা, ব্যাপক জাল ভোট দেয়া, ব্যালট বাক্স লুট, ভাঙচুর, দফায় দফায় হামলা-সংঘর্ষসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে গতকাল কোম্পানীগঞ্জে আটটি ও কবিরহাট উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়।

সকাল সাড়ে ১০টায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুবলীগ কর্মীরা কেন্দ্র দখল করে নৌকায় সিল মারে। এ সময় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হন।

গোপালগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, গোপালগঞ্জে গতকাল দুপুরে দু’টি সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাইকান্দি ইউনিয়নের পাইককান্দি বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান ও মেম্বর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০ মিনিট ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়েছেন।

মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, মাদারীপুরে ভোটগ্রহণের শুরুতেই ব্যাপক সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, হামলা, ব্যালট ছিনতাই, বাক্স ভাঙচুর, গোলাগুলি, বোমাবাজি, ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন শেষ হয়েছে।

সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রের বাইরে সংঘর্ষ-হামলায় চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ অর্ধশত আহত হয়েছেন।

সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের কুন্তিপাড়া, করদী ও ছয়না কেন্দ্রে সরকারদলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হন। এ সময় কেন্দ্র দখল করে ব্যালট বাক্স ভাঙচুর ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৯ রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ছয়জনকে আটক করেছে।

মস্তফাপুর ইউনিয়নের তাঁতিবাড়ি কেন্দ্রে বোমাবাজিতে ১০ জন আহত হন।

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। ইউনিয়নগুলো হলো আলুকদিয়া, মোমিনপুর, পদ্মবিলা ও কুতুবপুর। সকাল থেকে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা মানুষের নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে কোথাও গোলযোগ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

কুষ্টিয়া ও দৌলতপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার ২০টি ইউনিয়নে ব্যাপক কারচুপি ও সংঘর্ষের মধ্যে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্রে পুলিশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছে। সংঘর্ষে ১০ জন আহত

ঝিনাইদহ সংবাদদাতা জানান, জেলার মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের বড়বাড়ি রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে ইউপি সদস্য প্রার্থী আঙুর আলী ও মৈফুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে ভোট কেন্দ্রে আসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হন। এই ইউনিয়নের বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ভোট বর্জন করেছেন।

অন্য দিকে শ্যামকুড় ইউনিয়নের অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা ১টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে পুলিশ তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে।

মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, মাদারীপুরে ব্যাপক সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, হামলা, ব্যালট ছিনতাই, বাক্স ভাঙচুর, গোলাগুলি, বোমাবাজি, ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ হয়েছে।

সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রের বাইরে সংঘর্ষ-হামলায় চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ অর্ধশত আহত হয়েছেন। মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী রোমান সরদার সকাল সাড়ে ১০টায় ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। ঘটমাঝি ইউনিয়নের তিন কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করে নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের কোজ করে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, জেলার হরিরামপুর উপজেলার উজান বয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গতকাল বেলা ৩টার দিকে নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টাকালে পুলিশের গুলিতে আ.লীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ হাসান ইমাম বাবুর ছোট ভাই সৈয়দ হুমায়ুন ইমাম সিরাজ আহত হয়েছেন।

নাটোর, লালপুর ও বাগাতিপাড়া সংবাদদাতা জানান সংঘর্ষ, দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর ও বর্জনের মধ্য দিয়ে জেলার লালপুর উপজেলার ১০টি ও বাগাতিপাড়া উপজেলার একটি ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছে। প্রকাশ্যে কেন্দ্র দখলের ঘটনায় বিএনপির চার চেয়ারম্যান প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জন করেছেন। নির্বাচন চলাকালে লালপুর ও আড়বাব ইউনিয়নে পৃথক সংঘর্ষে ১১ জন আহত হয়েছেন। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। সংঘর্ষে আহতদের লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হরিপুর (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা জানান, হরিপুরের ছয়টি ইউনিয়নে গতকাল ভোট চলাকালে দুর্বৃত্তরা সদর হরিপুর ইউনিয়নের চারটি ভোটকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যালট বক্স ভাঙচুর ও ব্যালট পেপার ছিনতাই করে। এসব কেন্দ্রে কিছু সময় ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে। কেন্দ্রগুলো হলো তোররা হাফিজিয়া দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়, মিনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেহট্ট-ভবানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মোসলেমউদ্দিন ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়। তোররা হাফিজিয়া কেন্দ্রে প্রায় দুই ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। বেলা ১টায় ফের ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে গাজীপুরে তিন বিএনপি প্রার্থীসহ চার চেয়ারম্যান প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার কালীগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়। নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে দুপুরে নিজ নিজ এলাকায় তারা ওই ঘোষণা দেন।

বগুড়া প্রতিনিধিজানান, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ১২টি ও সোনাতলা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জালভোট প্রদান ও প্রকাশ্যে নৌকা মার্কায় সিল মারতে বাধ্য করে ভোটারদের।

সকাল থেকে সোনাতলা সদর ও মধুপুর, শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার, সৈয়দপুর, দেউলী ও মোকামতলাসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর এজেন্টরা নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের সামনেই ভোটারদের নৌকা মার্কায় সিল মারতে বাধ্য করে। রানীরপাড়া কেন্দ্রে জালভোট দিতে আসা নৌকার দুই কর্মীকে মারধর করে তাড়িয়ে দেন র‌্যাব সদ্যরা। পাকুল্যা ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থীও এক কর্মীকে ছুরিকাঘাত করেছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা। এ দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নে ভোট গণনার সময় ভোটকেন্দ্রে ককটেল হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ সময় তিনটি ককটেলসহ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ইউপি মেম্বার প্রার্থীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। ভোট চলাকালে দুপুরে ১২টার দিকে কাউয়াখোলা ইউনিয়নের বড়কয়ড়া কেন্দ্রে দুর্বৃত্তরা হামলা করে ৯০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই করে। এই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করা হয়। বহুলী ইউনিয়নের দু’টি কেন্দ্রে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে ১০ জন আহত হয়েছেন। কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে একজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

রংপুর অফিস ও পীরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, পুলিশের গুলি, বিএনপির এজেন্ট বের করে দেয়া, জালভোট, ব্যালটে জোর করে সিল মারা এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রিজাইডিং অফিসারের সমর্থন নেয়া, সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে ছবি তুলতে বাধা দেয়াসহ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পীরগঞ্জের ১১টি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে।

মদনখালি ইউনিয়নের বাবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ ২০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছুড়লে সমর্থকেরা পালিয়ে যায়। এতে ১২ জন আহত হন।

চাঁদপুর সংবাদদাতা জানান, সংঘর্ষ, ব্যালট পেপার ছিনতাই, প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে মারধর ও জালভোট দেয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরের ১৮টি ইউনিয়নের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বেলা ১১টার পর ১০টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে ১২টি ইউনিয়নে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৪ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

সকাল ১০টায় চাঁদপুর সদরের মৈশাদী ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্র নৌকার সমর্থকেরা দখল করে জাল দিয়ে ব্যালট বাক্স ভোট ভর্তি করে। পরে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আতাউর রহমান সেখানে গিয়ে ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করেন। একই সময় সদর উপজেলার লোধের গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ লোকজন কেন্দ্র দখল করার চেষ্টা করলে সেখানে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। একই সময় সদর উপজেলার তরপুরচন্ডি, আশিকাটি, কল্যাণপুর ও রামপুর, বাগাদী ও চান্দ্রা ইউনিয়নে নৌকার সমর্থরা বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে এক তরফা ব্যাপক সিলিং করায় বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বেলা ১২টা থেকে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দেন।

নরসিংদী সংবাদাতা জানান, কেন্দ্র দখল, ব্যাপক দুর্নীতি, ত্রাস সৃষ্টি ও সিল মারামারির মধ্য দিয়ে জেলার শিবপুর ও বেলাব উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। দুপুর ১২টার মধ্যেই অধিকাংশ ইউনিয়নের ভোট কেন্দ্রগুলো আ.লীগ কর্মীদের দখলে চলে যায়। বিভিন্ন ইউনিয়নে সিল মেরে আ.লীগ কর্মীরা তাদের প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করেছেন। বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেন। চর উজিলাব মাদরাসা ভোট কেন্দ্রে আ.লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে দুই ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। ১২টার পর ভোট গ্রহণ শুরু হয়। এ সময় আ.লীগ কর্মীরা কেন্দ্রটি পুরোপুরি দখলে নেন।

নেত্রকোনা সংবাদদাতা জানান, জেলার আটপাড়া ও মদন উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে গতকাল ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নে আ’লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর হাসান স্বতন্ত্র (আ.লীগ বিদ্রোহী) প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন রুপ্তনকে লাঞ্ছিত করেন। অপর দিকে মদন উপজেলার নায়েকপুর ইউনিয়নে আনারস প্রতীকের স্¦তন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী ফখরুল ইসলাম খান হেভেনের কর্মী সমর্থকের ওপর নৌকার সমর্থকরা হামলা চালালে দু’জন আহত হন। মদনের ত্রিয়শ্রী ইউনিয়নের শিবপ্রসাদপুর কেন্দ্রের নির্বাচন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জাল ভোট দেয়ার সময় পুলিশ দু’জনকে আটক করলেও প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয়।

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, জাল ভোট, কেন্দ্র দখল সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে মিরসরাইয়ের ৯টি ইউনিয়নের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। ৮১টি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট ঢুকতে দেয়নি আ.লীগ প্রার্থীর লোকজন। বুধবার রাতে কেন্দ্রগুলো দখলে নেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভোটকেন্দ্র গুলোতে ভোটারের উপস্থিতি ছিল কম। হিংগুলি ইউনিয়নের এরশাদ উল্যাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাখারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইছাখালী ইউনিয়নের আব্দুর ছাত্তার ভূঁইয়াহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নে যুবদল নেতা ফারুকের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে আ’লীগ প্রার্থীর লোকজন।

শেরপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার শ্রীবরদীতে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রিজাইডিং কর্মকর্তাসহ ২৫ জন আহত হয়েছেন। অপর দিকে পুলিশ নকলার রানীশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে কাজল (৫০) নামে একজনকে আটক করেছে। উরফা ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী রুস্তম আলী ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেছেন।

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের ধনপুর ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দেয়া নিয়ে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে পুলিশের গুলিতে দু’জন আহত হয়েছেন। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ কেন্দ্রে ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছেন বিএনপি সমর্থক চেয়ারম্যান প্রার্থীরা।

সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. হারুনুর রশিদ জানান, পুলিশ পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তিন রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ ছোড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সদর দক্ষিণ (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, সংঘর্ষ, গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ, বিএনপির এজেন্টদেরকে বের করে কেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে কুমিল্লার সদর দণি উপজেলার ৫টি ও বরুড়া উপজেলার ৯টি ইউপির নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

পাবনা সংবাদদাতা জানান, জোরপূর্বক ব্যালট পেপারে সিলমারা এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্য দিয়ে পাবনার ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। একটি ভোট কেন্দ্রের বাইরে থেকে ককটেলসহ ৫ যুবককে আটক করেছে আইন শৃংখলা বাহিনী। এছাড়া জোরপূর্বক নৌকা প্রতীকে ডেমরা ইউনিয়নে ভোট প্রদানে বাধা দেওয়ায় বিএনপির সমর্থকদের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসময় ৫ জন বিএনপি কর্মী আহত হয়েছে। আহতরা হলেন, আব্দুল গণি (৪০), বাচ্চু (৩৫), বাকিবিল্লাহ (৩০), আনিসুর রহমান (৩০)।

 

এমআইএস।