মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার সেই ভোটাধিকার স্বেচ্ছাচারিতা, বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে কেড়ে নেয়া হয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের হাহাকার, জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনানুগ-নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে অসত্য ব্যাখ্যা করে জনগণকে দ্বিধা বিভক্ত করার চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আরোয়ারুল ইসলাম চান।
ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের সঞ্চালনা এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- পার্টির যুগ্ম সম্পাদক তাসবির লস্কর, ইমরুল কায়েস রানা, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, আবু নাছের মো: নুরুন্নবী জনি প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান তার বক্তব্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব তুলে ধরেন। প্রশ্ন দুটি হলো- ১. এত রাজনৈতিক দল থাকতে বিডিপির প্রয়োজন কি? ২. অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর মতো কোনো কর্মসূচি নেই কেন?
প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৪৭ সালে বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দেশভাগের পর শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও শাসন ক্ষমতায় যা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা এদেশের মানুষ তা থেকে বঞ্চিত। এসব অধিকার থেকে দূরে রেখে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগণ ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান একত্রিত করার পরিকল্পনা নেয়। বাংলা ভাষাকে উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও চাকরির বৈষম্যের সাথে দেশের মানুষের সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের লক্ষ্যে আইয়ুব খান ‘জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা’, ‘পাকিস্তান কাউন্সিল’ এবং ‘লেখক সংঘ’ এর মাধ্যমে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে।
তিনি বলেন, অতঃপর এদেশের মানুষ সর্বোতভাবে পাকিস্তানিদের প্রতি হতাশ হয়ে গণআন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ দেশকে স্বাধীন ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ শুরু করে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্রকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ১. রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও বিশ্বাসঘাতকতার উল্লেখ। ২. রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের ফলে অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিবাদ। ৩. আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান যে প্রক্রিয়ায় বাঙালির সাহিত্য ভাষা ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে চেষ্টা করেছিল, একইভাবে বর্তমানেও বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন চলমান। শিক্ষাকে নৈতিক ও মানবিক মর্যাদা বিরোধী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। অধিকার হারা মানুষ সর্বক্ষেত্রে তার অধিকারের জন্য সংগ্রামরত। বাংলাদেশের অধিক সংখ্যক রাজনৈতিক দল ৫৩ বছর যাবত এসব দাবিতে আন্দোলন করছে। একাধিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগও পেয়েছে। আজ অবধি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবি কতটুকু পূরণ হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এবং সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে ১ মার্চ ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সংস্কার ও পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিডিপি ৮ ভাগে ২৬ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ৮টি ভাগ হলো- ১. অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী, ২. সরকারের স্বচ্ছতা, ৩. কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট, ৪. অবকাঠামো, ৫. পরিবহন ও যোগাযোগ, ৬. মানবসম্পদ, ৭. শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ৮. বিবিধ।
দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব তুলে ধরে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দেশের ৯৭ ভাগ মানুষ রেডকার্ড দেখিয়েছে। অথচ, মাত্র ৩ ভাগের সমর্থন নিয়ে এই শাসন ব্যবস্থা টিকে আছে। ৯৭ ভাগে কেন ব্যর্থ হচ্ছে? কেন মাত্র ৩ ভাগের ওপর তারা জয়ী হতে পারছে না? এ প্রশ্নের সমাধানই বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মূল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক রাজনীতি ও দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীন মৌলিক, মানবিক, অধিকারহীন বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে ১ + ১ = ২ (সরকার + আন্দোলন = সরকার পরিবর্তন) এই থিউরিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন। যেখানে সরকার গঠন করতে ৩ শতাংশ সুবিধাভোগী-লুটেরা গোষ্ঠী, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন ও বিচার বিভাগের অল্প সংখ্যক স্বার্থভোগকারী ব্যক্তির নির্মম পদক্ষেপেই যথেষ্ট প্রমাণিত হয়েছে, সেখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিক্ষয় ছাড়া কিছুই না। এ অবস্থায় ১ + ১ = ৩ পলিসিতে এগোতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন, ১. জাতীয় ঐক্যমত, ২. দলীয় আদর্শিক বিরোধের অপনোদন, ৩. ধর্মীয় সম্প্রীতিকে প্রাধান্য দেয়া, ৪. রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত কিছু শব্দ বা ধারণা: যেমন, সাম্প্রদায়িক, প্রজাতন্ত্র, কূটনীতি পরিহার করা। ৫. স্বাধীনতার ঘোষণার তিন মূলনীতি-সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনা।
তিনি আরো বলেন, (সরকার + আন্দোলন = সরকার পরিবর্তন) এই অবস্থা গণতান্ত্রিক পরিবেশে সম্ভব। আমাদের উত্থাপিত ১ +১ = ৩ বলতে বুঝায়, কর্তৃত্ববাদী ও লুণ্ঠনকারী ব্যবস্থায় (সরকার + আন্দোলন + উল্লেখিত পাচঁ দফা = গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা) -এর সাথে উল্লেখিত পাঁচ দফাভিত্তিক সর্বাত্মক রাজনৈতিক জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের মাধ্যমে ৯৭ শতাংশ মানুষের যে প্রত্যাশা তা অর্জনে সক্ষম হওয়া। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি পাঁচ দফা নির্ধারণ করে এর সমাধানের উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। আর সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রগতি কামনা করছে।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির যুগ্ম সম্পাদক তাসবির লস্কর বলেন, ‘বৃটিশ আমল থেকেই বাংলাদেশ অবহেলিত। যে কারণে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, এরপরও যখন সত্যিকারের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি, তখন হয়েছে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা কী সত্যিকারার্থেই স্বাধীন হতে পেরেছি। মানুষ কী তাদের নাগরিক অধিকার পাচ্ছে? বাংলাদেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক যে দুরবস্থা, এর জন্য কারা দায়ী? আমার মতে, শুধু বাংলাদেশই নয়, এই উপমহাদেশের আজকের যে অবস্থায় উপনীত হয়েছে এজন্য রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং ভূরাজনৈতিক ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার ব্যর্থতাই সবচেয়ে বেশি দায়ী।’
প্রেস বিজ্ঞপ্তি





