আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করছে আওয়ামী লীগ।

এর অংশ হিসেবে কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ভোটের কার্যক্রম। দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক ডেকে এসব কর্মসূচির দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে।

প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও এ মাসেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে শেষ মুহূর্তে মনোনয়নকেন্দ্রিক দলীয় কোন্দল নিয়ে চিন্তায় শাসক দলের শীর্ষ মহল।

প্রতিটি আসনেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি। মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে দলের নেতাকর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে জড়িয়ে পড়েছেন।

যা নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পড়ে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শীর্ষ নেতারা। তাই যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যার সমাধান করতে চান তারা।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর দলের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি টিম উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী সফরে যাচ্ছে। এ ছাড়া এ মাসের ১০ তারিখের মধ্যে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক করে নির্বাচনী কার্যক্রম চূড়ান্ত করা হবে।

দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর সে অনুযায়ী দ্রুত কাজও শুরু করবে দলটি। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- বিভাগীয় নির্বাচনী বর্ধিত সভা, জেলা নেতাদের সম্মেলন, এজেন্ট প্রশিক্ষণ, ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি চূড়ান্তকরণ।

এ ছাড়া ইভিএম নিয়ে পর্যালোচনা, মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু, প্রচার কৌশল নির্ধারণ, নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণসহ এক ঝাঁক কর্মসূচি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। পোলিং এজেন্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এসব কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু মনোনয়ন ঘোষণার দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলেও প্রার্থীর ছড়াছড়ি নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে দলটিতে। নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হওয়ার আগেই এ ধরনের কোন্দল মিটিয়ে ফেলতে অনানুষ্ঠানিকভাবে শীর্ষ নেতারা ঈদের আগে আলোচনাও করেছেন।

নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এবং দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এইচটি ইমাম বলেন, যেদিন থেকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে সেদিন থেকেই কাজ চলছে।

ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কমিটি কাজ করেছে। এখন জাতীয় নির্বাচনের আলোকে কাজ চলবে। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের কাজে নেমে পড়েছি। এ সংক্রান্ত কাজে নতুন নতুন ইস্যু ও বিষয় আসে।

যখন যা সামনে আসবে সেটা নিয়ে কাজ করতেই হবে। দ্রুতই কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বৈঠকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, শীর্ষ নেতাদের পর্যবেক্ষণে মনোনয়নকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা নজরে এসেছে। সেগুলো দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে কাজ চলছে। নির্বাচনের আগেই এসব ছোটখাটো অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সূত্র জানায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আট বিভাগে আটটি বর্ধিত সভা হবে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠকে এসব সভার দিন-তারিখ ঠিক করা হবে। পাশাপাশি জেলা নেতাদের নিয়ে কবে কোথায় সম্মেলন করা যায় তা-ও আলোচনা হবে।

এ বৈঠকেই চূড়ান্তভাবে এজেন্ট প্রশিক্ষণের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যেই সারা দেশে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেয়া হবে।

বৈঠকে আরপিও সংশোধন এবং ইভিএম নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দলের প্রচার উপ-কমিটিকে নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল, মাধ্যম, বার্তা নির্ধারণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়া হবে। প্রচারণায় কী কী বিষয় থাকবে, কী কী বিষয় গুরুত্ব পাবে সে সম্পর্কে একটি গাইডলাইন দেয়া হবে প্রচার উপ-কমিটিকে।

তবে, ডিজিটাল প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে কৌশল নির্ধারণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এদিকে ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান, দলের সভাপতি দেশের ৩০০টি আসন সম্পর্কেই স্টাডি করেছেন।

কোন আসনে কার কী অবস্থা, কার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা কেমন- এসব তিনি এখন ভালো করেই জানেন। গড়ে তিন থেকে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিটি আসনেই কাজ করছেন। এখন মনোনয়ন নিশ্চিত করতে নিজেরাই কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন।

এটাকে দলের সভাপতি ভালো চোখে দেখছেন না। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করে দ্রুত সুরাহার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তা বাস্তবায়নে ব্যক্তি না দেখে মার্কার পক্ষে দলের নেতাকর্মীদের কাজ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মনোনয়নেচ্ছুদের কাজ করতে বলা হলেও দল যাকে মনোনয়ন দেবে তাকে মেনে নেয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।

আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান বলেন, দল প্রায় ১০ বছর ধরে টানা ক্ষমতায়। প্রতি আসনেই ৫-১০ জন যোগ্য প্রার্থী আছেন। সমীক্ষা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেয়া কঠিন হবে না।

প্রার্থীর ছড়াছড়ি : দেশের সব আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ছড়াছড়ি। প্রার্থীর সংখ্যাধিক্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। একই পরিবারের আছে একাধিক প্রার্থী। সারা দেশে এ ধরনের পরিবারের সংখ্যাও অনেক।

এসব ক্ষেত্রে ভাই ভাইকে ছাড় দিতে রাজি নন, তেমনি বোনও ভাইকে ছাড় দিতে চান না। প্রতিযোগিতা আছে মেয়ে বাবাকে বা শ্বশুর জামাইয়ের মধ্যেও। কক্সবাজার-৩ আসনের এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল।

এ আসনে এবার ভাইকে ছাড় দিতে রাজি নন তারই আপন ভাই ও বোন। রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন সাইমুম সরওয়ার এমপির বড় ভাই সোহেল সরওয়ার কাজল। ছোট ভাই কমলকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার জন্য আটগাট বেঁধে নেমেছেন।

কিন্তু এই দুই ভাইকে আবার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তাদেরই আপন বোন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবরী।

এদের বাইরে কক্সবাজার জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কানিজ ফাতেমা মোস্তাকসহ আরও কয়েকজন এ আসনে মনোনয়ন চান। কানিজ ফাতেমার স্বামী এ আসনের পাঁচবারের সাবেক এমপি।

পাবনা-৪-এ ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের সঙ্গে জামাতা ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদের বিবাদ তুঙ্গে। ভূমিমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। উত্তরাধিকার হিসেবে কে এমপি হবেন- এ নিয়ে মন্ত্রীর ছেলেমেয়ে-জামাতার দ্বন্দ্ব সংঘাতে রূপ নিয়েছে একাধিকবার।

মন্ত্রীর ছেলেকে কারাগারেও যেতে হয়েছে। এই ফাঁকে সেখানে ভালো অবস্থান করে নিয়েছেন তৃতীয় পক্ষ রবিউল আলম বুদু। একই অবস্থা ঢাকা-১৬-তে।

এখানে এমপি ইলিয়াছ উদ্দিন মোল্লা। তার বড় ভাই এখলাছ উদ্দিন মোল্লাও মনোনয়ন চান। দু’জনের সম্পর্ক দাকুমড়া। এই ফাঁকে এখানে ভালো অবস্থান করে নিয়েছেন এমএ মান্নান কচি।

প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নাম ছড়িয়েছে দুটি আসনে। তার মূল আসনের (মাদারীপুর-২) এমপি নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। বর্তমানে তিনি যে আসনের এমপি (মাদারীপুর-৩) সেটায় আগে এমপি ছিলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন।

এবার সেখানে ওই দু’জনের পাশাপাশি মনোনয়ন চাইবেন দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এ আসনে নাছিম-আবুল-গোলাপে তৈরি হয়েছে মনোনয়নজট।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এমপিদের বিরোধ : গঠনতন্ত্র অনুসারে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ৮১ সদস্যের। তবে বর্তমান কমিটিতে চারটি পদ ফাঁকা থাকায় সদস্য সংখ্যা ৭৭। তাদের ৪২ জন সংসদ সদস্য নন।

কেন্দ্রীয় নেতাদের এ অংশটির প্রায় সবাই নিজ নিজ এলাকায় যাতায়াত বাড়িয়েছেন এবং মনোনয়ন পেতে তৎপরতা চালাচ্ছেন। ফলে বর্তমান সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব লেগেই আছে।

এর বাইরে সারা দেশে ৪৮৯টি উপজেলা পরিষদের প্রায় ৭০ শতাংশের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের। আগামী জাতীয় নির্বাচনে অন্তত অর্ধেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনোনয়নপ্রত্যাশী।

মন্ত্রী ও বড় নেতাদেরও আছে প্রতিদ্বন্দ্বী : সিলেট সদর আসন থেকে নির্বাচন না করার বিষয়ে কয়েকবারই ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজ।

কিন্তু অর্থমন্ত্রীর ভাই ও জাতিসংঘের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এমএ মোমেনও প্রার্থী হতে আগ্রহী। ফরিদপুরের ভাঙ্গার সাবেক এমপি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ।

এক-এগারোর পর ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচন করতে না পারায় তার স্ত্রী নিলুফার জাফর উল্যাহ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কাজী জাফর উল্যাহ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান।

কিন্তু সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরীর ভাই মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী ওই আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হন। এরপর থেকে দু’পক্ষের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। এবারও দু’পক্ষই মনোনয়ন চাইবেন।

গাইবান্ধায় ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার আসনে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। দু’জনকে কেন্দ্র করে রীতিমতো দু’ভাগ হয়ে পড়েছে স্থানীয় সংগঠন।

কেরানীগঞ্জের একাংশ, ঢাকার হাজারীবাগ ও সাভারের একাংশ নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের আসন। এখানে মনোনয়ন চান কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার। এএস