বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সময় কাল নির্ধারন করে আন্দোলন হয় না। প্রতিনিয়তই আন্দোলন চলছে, চলবে। উপজেলা নির্বাচনের পর বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে সরকারকে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, 'সাহস থাকলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। বহুত হয়েছে, জনগণের টাকা অপচয় করে ‘অবৈধ’ পার্লামেন্টের প্রয়োজন নেই। পদত্যাগ করে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।’
'লাখো কন্ঠে সোনার বাংলা’ অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শত কোটি টাকা খরচ করে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে কোনো লাভ হবে না। গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে যখন বিদায় হবেন সেটিই আসল কাজ হবে। তখন এটিই গ্রিনেজ বুকে নাম আসবে।
'ওই অনুষ্ঠানে ২ হাজার জন আহত হয়েছে, অনেকে নির্যাতিত হয়েছে। টাকা দিয়ে মানুষ ভাড়া করে আনা হয়েছে। আমাদের মানুষ আনতে টাকা লাগবে না। মানুষের স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনে লোকে লোকারন্য হয়ে যাবে।’  
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। এজন্য মুক্তিযোদ্ধাদের জীবদ্দশায় প্রকৃত ইতিহাস লিখে যাওয়া প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ শুধু রাজাকার রাজাকার করে, অথচ তার দলেই রাজাকারের ভরা। এগুলো আগে খুঁজে বের করুন।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং এখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পাকিস্তান সরকারের চাকরি করতেন। রাজাকারের বিচার হলে তাদের তো জেলে থাকার কথা।’
তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ২টি মামলায় চার্জ গঠন যথাযথ প্রক্রিয়া হয়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তিন ঘন্টা বসিয়ে রেখে হঠাৎ করে এসে চার্জ গঠনের কথা জানানো হয়েছে। কিছু বুঝলামও না, কিছু শোনাও হলো না। বিচারক উঠে গিয়ে ফোনে কথা বলে অভিযোগ গঠন করে ফেললো।
'আমরা এটা মানি না। সরকার এভাবে বিচার বিভাগ ধ্বংস করে ফেলেছে।’
সারাদেশে নেতাকর্মীদের নামে মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতারকৃতদের নি:শর্ত মুক্তি দাবি করেন তিনি।
সরকারকে আবারও ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার দেশ চালাচ্ছে না, মানুষের ওপর জুলুম চলছে। দেশের গণতন্ত্র আজ মৃত। দেশ ও মানুষের স্বার্থে এ সরকারের পতন ঘটাতে হবে। কারন এ সরকারের হাতে কোনো পেশার মানুষই নিরাপদ নয়।’
জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।
বিএনপি চেয়ারপারসন অঅিযোগ করেন, ‘দেশের মানুষ কাজ পাচ্ছে না। অথচ অন্য দেশের জনগণ অনুমতি ছাড়া ওয়ার্ক পারমিট না থেকেও বছরের পর বছর এদেশে কাজ করে যাচ্ছেন। একটি বিশেষ দেশকে এ সুবিধা দেয়া হচ্ছে।’
গত পাঁচ বছরে দেশে কোনো উন্নতি হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘তারা (সরকার) শুধু লটপাট করেছে। পদ্মা সেতু, ব্যাংক, শেয়ারবাজার, বিসমিল্লাহ, হলমার্ক, ডেসটিনিসহ সবক্ষেত্রেই লুটপাট করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে।
‘যুদ্ধের পর যেসব পাকিস্তানি ও ভারতের লোকজন পালিয়ে গেছে তাদের বাড়িঘর লুটপাট করেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের নয়, তারা মিথ্যার পক্ষের শক্তি।’
উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়-মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও অবাধ হবে না। এজন্য দেশের জনগণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে এর পক্ষে রায় দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ বারবার গণতন্ত্র হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘মোশতাক, এরশাদ, ফখরুদ্দিন-মঈন সরকার আওয়ামী লীগ এনেছে। তারা (সরকার) বিএনপিকে ধ্বংস করারও ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু সফল হয়নি।
‘ফখরুদ্দিন-মঈনরা আমার কাছে বিভিন্ন সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু আমি বলেছি, আপনারা অন্যায় করেছেন। তাই অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপোষ নয়। এজন্য তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপোষ করে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাদেরও বিচার হবে। একইসঙ্গে ক্ষমতাসীনদের যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদেরও জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে।’
বর্তমান বিরোধী দলকে গৃহপালিত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘রওশন চাপে পড়ে নির্বাচন করেছেন বলে বলছেন। কোন অপকর্মে চাপে পরে তারা নির্বাচনে এসেছে আমরা সেটা জানি। এজন্য তাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকার দরকার ছিলো।
‘এখনও সময় আছে সম্মান বাঁচাতে পদত্যাগ করুন। তা না হলে শেষ রক্ষাটুকুও আর থাকবে না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টাদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে অভিহিত করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘কোন প্রকল্প থেকে কিভাবে দুর্নীতি করা যায় তারা শুধু সেসব উপদেশ আর পরামর্শ দেন। তাদের উপদেশ মেনেই কুইক রেন্টাল সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের লোকজনদের লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের ঘাটতি মেটাতে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সড়ক পথে টোল নেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।উপদেষ্টাদের এসব উদ্ভট পরামর্শ নেয়া বন্ধ করেন। তা না হলে আরও ডুবে যাবেন।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট দিয়ে ভারতের কাছ থেকে ফি নিলে নাকি বেয়াদবি হবে। তাহলে দেশের জনগণের কাছ থেকে টোল নেয়া কি আদবি হবে?’
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘এ সরকারের দেশের মানুষের প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই। তারা নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করছে, অথচ সীমান্তে মানুষ হত্যা হলে কোনো প্রতিবাদ করছে না।’
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি রুহুল আমিন গাজী সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন  বিএফইউজের মহাসচিব শওকত মাহমুদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার, প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাধারন সম্পাদক ইলিয়াস খান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শামসুল হক, খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আনিস-উজ-জামান, বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সৈয়দ ফজলে রাব্বি ডলার, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সরকার আবদুর রহমান, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বদিউল আলম, কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম শফি, কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বাচ্চু প্রমুখ।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ও বেগম সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিমউদ্দিন আলম, ঢাবির সাবেক ভিসি প্রফেসর ড.এমাজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
[b]ঢাকা, এমএইচ, ২৯ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসআর[/b]