ক্ষমতাসীন মন্ত্রী-এমপিদের আচরণ বিধি লঙ্ঘন, বিরোধী জোটের প্রার্থী-সমর্থকদের ওপর অব্যাহত হামলা-মামলার অবিযোগসহ নানা অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে প্রচারণা শেষ হয়ে এখন অপেক্ষা ভোট গ্রহণের।
তবে প্রথমবারের মত দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও দৃশ্যত সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি।আর এমন অস্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশে সন্ত্রাসী হামলাসহ নানা ধরনের নাশকতার ঝুঁকি থাকায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন অনেকেই।

এ ছাড়া গত কয়েকদিন ধরে বিরোধী দলের মেয়রপ্রার্থীসহ নেতাকর্মীদের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদেরকেই হয়রানি-নির্যাতন করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না সাধারণ ভোটাররা। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না পারার শঙ্কাতে অনেকে সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তাই আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে ভোটারের ন্যূনতম উপস্থিতি নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়। আর এ পরিস্থিতিতে জাল ভোটের হিড়িক ও ভোট ডাকাতির আশঙ্কা করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের দাবি, ন্যূনতম ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না হলে পৌরসভা নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠবে। ফলে নির্বাচনে যে দলের প্রার্থীই জয়ী হোক না কেন, তাদেরকে স্থানীয়ভাবে পদাধিকার ক্ষমতা প্রয়োগে চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনী হঠকারিতার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এদিকে পৌর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ভোটের দিন রাজনৈতিক দলসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সোমবার রাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সবার উদ্দেশে বলব, প্রার্থী-সমর্থকরা যেন আইনশৃংখলা ভঙ্গ না করেন। সুষ্ঠু নির্বাচনে যেন আমাদের সহযোগিতা করেন। রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের প্রার্থীদের এবং প্রার্থীরা যেন তাদের সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।’

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবরকম প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অধিকতর নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্বাচনে কোনো শংকা নেই।’

তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন ভিন্ন কথা, এবারকার পরিস্থিতি বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠেই নামতে পারেনি। ঝুঁকি নিয়ে যারা প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন তারাই হামলা-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই জয় নিশ্চিত করতে ভোটের দিন তাদের ঝুঁকি নিয়ে সোচ্চার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ক্যাডারবাজ প্রার্থীরা বিকল্পব্যবস্থায় নিজেদের এগিয়ে রাখতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের শরণাপন্ন হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাই নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক আছে এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন পর্যবেক্ষকরা।

আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের যে অবস্থা দেখছি তাতে এ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে মনে হয় না। ভোটের দিন বেশিরভাগ পৌরসভায় মারামারি, হানাহানি হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন এখনো শক্ত হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটবে। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর সব ছেড়ে দিলে নির্বাচনে অনিয়মের দায় কমিশনকেই নিতে হবে। এ ছাড়া সরকারও ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ইসিকে এ ধাপ পার হতে হবে। এ লক্ষ্যে ভোট গ্রহণ ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনোদিকে হেলে পড়লে প্রশ্নবিদ্ধ হবে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা।

এছাড়াও সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনে ইসির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এবার পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে নির্বিকার দেখা যায়।তাই পৌর নির্বাচন ভোটাররা খুব স্বস্তিতে নেই এটাই বলা যায়।

পৌর নির্বাচনের পরিবেশের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের দেশে এখন নির্বাচনের দিনও শুরু হয় নানা প্রশ্ন নিয়ে। যেমন ভোট দেওয়া গেল কি না, জাল ভোট পড়ল কি না, ভোটারের ভোটের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচিত হলেন কি না। প্রশ্ন থাকে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ঠিক ভূমিকা পালন করল কি না, তা নিয়েও।

তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জনরায় প্রতিফলিত করা; বিভিন্ন কৌশলে একে নাকচ করা নয়। নির্বাচনে বিভিন্নভাবে জনগণের রায় বানচাল করার ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, গণতন্ত্রের মেরুদন্ড নিয়েই প্রশ্ন উঠবে বিভিন্ন মহলে।

সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হলে জনগন এই অগতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে তাদের রায় প্রকাশ করত। কিন্তু সরকারের নির্দেশে ইসি ও প্রসাশনের লোকজন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে জয়ের জন্য সব চেষ্টাই করছে।

তিনি আরও বলেন, এই সরকারের অধীনে যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না তার প্রমাণ আগে বহু পাওয়া গেছে।দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচনে তার ষোলকলা পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

এমএইচ