নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার, দলীয় অভ্যন্তরীন কোন্দল পূর্বশত্রুতা ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উদযাপনকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগের দুপক্ষ ফের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
যেকোন সময় দু'গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণ হানির আশংকা করছে হাতিয়াবাসী। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলীয় কর্মী-সমর্থকরা একের পর এক গুলি, বোমা ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটিয়েই চলেছে।
হামলাকারীরা কথায় কথায় আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও বোমা ব্যবহার করে একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় আতংকে রয়েছে হাতিয়ার ৬ লক্ষাধিক জনসাধারণ।
অব্যাহত সংঘর্ষের কারণে পর্যটন মওসুমে নিঝুম দ্বীপ ও হাতিয়া সফরকারী পর্যটকরা হাতিয়ায় যাচ্ছে না। এতে করে পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে নৈসর্গিক লীলাভূমি। ফলে সরকার বড় ধরণের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নোয়াখালী শহর থেকে ৫০ কি.মি দূরে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মাঝে হাতিয়া দীপ উপজেলা অবস্থিত। এর আয়তন এক হাজার ৫শত ৮.২৩ বর্গ কি.মি। ১টি পৌরসভা ও ১১ টি ইউনিয়ন নিয়ে হাতিয়া উপজেলা গঠিত। প্রাকৃতিক নৈসর্গের লীলাভূমি হাতিয়ার রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আ’লীগের দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন থেকে সক্রিয়।
এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামীলীগ উপদেষ্টা মোহাম্মদ আলী ও তার স্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য বেগম আয়েশা ফেরদৌস এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি-সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও তার ভাতিজা উপজেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় চরকিং ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ মহিউদ্দিন আহমেদ।
দীর্ঘদিন থেকে এ দু’পক্ষের কর্মী সমর্থকদের গুলি ও জবাই করে হত্যা, অপহরণ, গোলাগুলি ও সন্ত্রাসী হামলার ভয়ে হাতিয়া উপজেলা আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। হাতিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে অলি (ওয়ালি উল্লাহ) ও আলী (মোহাম্মদ আলী) গ্রুপের মধ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে গত ৩০ মার্চ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় যুবলীগের নেতা আশরাফ উদ্দিনসহ উভয় পক্ষের ৪ জনকে গুলিবিদ্ধ ও জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।
এসকল ঘটনায় ২ শতাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। এ সকল হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও পুলিশ রহস্যজনক কারণে খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত রুই-কাতলাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে না পারায় স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে হাতিয়াবাসীর মাঝে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ গত শনিবার আওয়ামীলীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নিয়ে ওলি ও আলী গ্রুপের মাঝে চরকৈলাশ ও খাসের হাট এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, হামলা, পাল্টা হামলা, বসতবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
দীর্ঘদিন থেকে এ দু’গ্রুপ পৃথক পৃথকভাবে দলীয় ও জাতীয় কর্মসূচী পালন করে আসছে। স্থানীয় উপজেলা ও পৌর আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা বলেন, আওয়ামী যুবলীগের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার দুপুরে পৌরসবার চর কৈলাশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ওলি উল্লাহর অনুসারীরা আলোচনা সভা করে।
বেলা ২ টার সময় আলোচনা সভা শেষে ওলির কর্মী-সমর্থকরা খাসের হাট বাজার ও পৌর আওয়ামীলীগ সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদের বসতবাড়িতে বিপুল পরিমাণ ইট পাটকেল, লাঠি-সোঁটা ও ধারালো আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়।
এদিকে সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী বর্তমান সংসদ বেগম আয়েশা ফেরদৌস এর অনুসারীরা হাতিয়া দ্বীপ সরকারী কলেজ মাঠে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও যুব সমাবেশের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আয়েশা ফেরদৌস এমপি।
স্থানীয় দলীয় নেতা-কর্মীরা জানান, বিকেলে সাংসদের অনুসারীরা হাতিয়া দ্বীপ কলেজ মাঠে যাওয়ার সময় খাসের হাট বাজার ও পৌর আওয়ামীলীগ সভাপতির বাড়ি অতিক্রম করার সময় ওলির কর্মী-সমর্থকরা তাদের উপর অতর্কিত ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠি-সোঁটা নিয়ে হামলা করে।
এ সময় এমপির অনুসারীরাও পাল্টা হামলা চালায়। এতে তুমুল সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষের লোকজন ধারালো আগ্নেয়াস্ত্র ও ককটেল বোমা ব্যবহার করে।
এ সময় দু’গ্রুপের লোকজন বৃষ্টির মতো গুলি ও ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে উভয়ে তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে হাতিয়া থানার ওসি কামরুজ্জামান সিকদার পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে শতাধিক টিয়ার সেল ও ফাঁকা গুলি নিক্ষেপ করে।
এ সময় উভয় গ্রুপের সংঘর্ষে অর্ধ শতাধিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হন। সংঘর্ষের সময় আলীর লোকজন পৌর আওয়ামীলীগের লোকজন পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদের বাসভবন ও তার আইন পেশার চেম্বার ভাঙচুর করে নথিপত্রে অগ্নি সংযোগ করে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ৬জনকে আটক করে। এই ঘটনার পুুলিশের ওপর হামলা ও আহত করার অভিযোগে হাতিয়া থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এস.আই) স্বপন কুমার বাদী হয়ে রোববার রাতে মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ৩৭০ জন আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীদের আসামী করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার রেজাউল করিম বলেন, উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা থাকায় এবং ফের সংঘর্ষের আশংকায় হাতিয়া শহরে সোমবার বিকেল থেকে সকল ধরণের সভা-সমাবেশ না করতে সতর্কতামূলকভাবে মাইকিং করা হয়েছে। র্যাব-১১ এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মোঃ জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হাতিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতত শান্ত রয়েছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, সংঘর্ষের পর উভয় পক্ষের লোকজন শান্ত রয়েছে। পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
পরবর্তীতে কোন প্রকার সংঘর্ষ, হামলার ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হলে প্রশাসন তা কঠোর হাতে দমন করতে প্রস্তুত রয়েছে।
এমএ





