ঢাকা মহানগরীতে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা আজ নতুন নয়। তার সাথে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে জঙ্গি আতঙ্ক। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কেউ আসে ভাল একটি প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার জন্য, আবার কেউ আসেন পেটের দায়ে যার বেশির ভাগেই ব্যাচেলর। তাদের নিরাপত্তা ও থাকার স্থান নিয়ে শঙ্কায় আছেন অভিবাকেরা। সাধারণ শিক্ষার্থীও ব্যাচলরদের দিন কাটছে আতঙ্কে ।
এমনিই একজন সুনামগঞ্জ জেলার মো: সুন্দর আলী তিনি বলেন, আমার একমাত্র ছেলে ঢাকা বিশ্ব্যবিদ্যালয়ে পড়ে, এক বছর আগে হলে ছিল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকায় তাকে হল খেকে বের করে দেওয়া হয়, বর্তমানে যে বাসায় থাকে বাড়িওয়ালা বলে দিয়েছে আগামী মাস থেকে বাসা ছেড়ে দিতে , আজ তিন দিন ধরে আমার ছেলে কোথাও বাসা খুঝে পাচ্ছে না, যেখানে যায় স্পস্ট বলে দেয় যে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেওয়া হবে না। তাহলে কি ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসতে হবে?
রাজধানীর শান্তিনগর এক ভবনের মালিক ইউসুফ রানা বলেন, ‘ব্যাচেলররা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, বাসা ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করে। কীভাবে বাসা ভাড়া দেব ওদের!। আবার অনেকেই বলেছেন, ব্যাচেলররা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় বানিয়ে বানিয়ে কথা বলেন। তাই তাঁদের বিশ্বাস করা যায় না।
"জীবন" নামে এক ব্যাচেলর দাবি, তাঁরা যতই বোঝান না কেন দেশে আইন-কানুন আছে, সবাই এক রকম নয়, তবু বাড়িওয়ালার মন গলে না তাহলে কোথায় যাব আমরা? যারা বাড়ীর মালিক তারা কি কখনো ব্যাচেলর ছিল না?। ব্যাচেলর আর বাড়িওয়ালাদের এই বিরোধ চলে আসছে অনেক দিন ধরেই।কিন্তু মুক্তির যেন উপায় নেই।
পরিবার যার পাশে থাকে সে হয়তো আরাম আয়েশে দিন পার করছে কিন্তু দিন শেষে বাসায় ফিরে যাকে আবার রান্না ও বিভিন্ন ঝামেলার কথা ভাবতে হয় তার ভাবনার সীমা কতদূর কে জানে। প্রতি মাসে পরিবার থেকে আসা সীমিত টাকা দিয়ে সারা মাস চলতে হয় এদের। জীবন এক এক জায়গায় এক রকম। জীবনের অর্থ হয়তো ঢাকার স্থানীয়দের মতো না ব্যাচেলরদের। এমনিতেই ব্যাচেলরদের বাড়ী ভাড়া দিতে নারাজ, তাদের ব্যাপারে ঘোর আপত্তি মালিক পক্ষের ।
সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলায় দেশের কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জড়িত থাকায় নড়েচড়ে বসেছেন বাড়ির মালিকগণ, এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা।
গত মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর কল্যাণপুরে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কল্যাণপুরে আর ব্যাচেলরদের আর বাসা ভাড়া দিবেন না, যারা আছে তাদেরও বাসা
ছাড়তে হবে বলেন বাড়ির মালিকরা। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলে দাবি করেছেন এলাকার ব্যাচেলররা ও তাদের স্বজনেরাও।
রাজধানীতে রয়েছে ৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অন্তত ৪৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও আনুমানিক ৬০টি কলেজ । আশপাশের জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়ছেন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হলের কিছু ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারিগুলোতে নেই। শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছেন মেস বা হোস্টেল, গুনছেন অধিক টাকা।
ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা, মুহাম্মাদপুর, মিরপুর, ফার্মগেট, উত্তরা, নতুন বাজার, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসহ আরও কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীরা হোস্টেল বা মেস ভাড়া নিয়ে থাকছেন। এখানকার প্রায় প্রতিটি গলিতেই একাধিক মেস বা হোস্টেল দেখা যায়।
কাল রাতে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চলে পুলিশের অভিযান, ধানমন্ডির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্রডে ছাত্র কাউছার আলম বলেন, অভিযানের সময় বাড়িওয়ালা এসে আমাদের আরও সতর্ক করে এসব বেপারে। আমরাও খুব ভয়ে ছিলাম কখন কি হয়। রাজধানীতে ব্যাচেলরদের বাড়িভাড়া না দেয়াটা অযৌক্তিক। ভাড়া না দিলে আমরা যাবো কোথায় ?’। কাউছারের মতো পুরো ঢাকা জুড়েই ব্যাচেলর বাসিন্দারা রয়েছে চরম উৎকণ্ঠায়।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ও বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে বসবাসরত ব্যাচেলর শিক্ষার্থীরা পড়ছে বিপাকে। অনেকেরই বাসা ছাড়তে হয়েছে, বাসায় বাসায় তল্লাশি অভিযানও চালায় পুলিশ।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রায়হান বলেন ‘আগের থেকে অবস্থা এখন অনেক কড়াকড়ি। রাতে সময় মতো বাসায় আসতে হয়। নতুন করে ছবি আর জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছি। কল্যাণপুরের বাড়িওয়ালাদের সিদ্ধান্ত এক তরফা সিদ্ধান্ত’।
তেজগাঁও সরকারী করেজের ছাত্র 'মনির" থাকেন সাতরাস্তায়। বন্ধুদের সাথে ব্যচেলর বাসায় থাকেন তিনি। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘৬মাস ধরে আছি এখানে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু ঘটনার জন্য বাড়িওয়ালা চাপ দিচ্ছে বাসা ছাড়ার জন্য। সরাসরি না বললেও বাসা ভাড়া বাড়ানো, পানির সমস্যা এসব শুরু করেছে। এমন অবস্থায় কি করব বুঝতে পারছি না।
ঢাকার বাইরে থাকা অবিভাবকরা উদ্বেগে রয়েছেন। সন্তানের জন্য এমনিতেই চিন্তার শেষ নেই। সম্প্রতি পুলিশের ধর পাকড় ও জঙ্গি হামলায় নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলছে অবিভাবকদের।
এমবিএইচ





