ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মাথাব্যথা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর আধিক্য। তবে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সংকট ঠিক উল্টো। সব মিলিয়ে ছয় ধাপে ৪ হাজার ৩২১টি ইউপির মধ্যে মোট ৫৫৪টি ইউপিতে শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী নেই বা ছিলেন না।
এর মধ্যে শতাধিক ইউপিতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার জন্য প্রার্থীই পায়নি দলটি। আবার অনেক জায়গায় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার পরও বাধার মুখে সেই প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। আবার কোথাও চাপের মুখে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী।
ছয় ধাপে দেশের চার হাজারের বেশি ইউপিতে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শেষ হয়েছে ৪ জুন।
বিএনপির সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা ওয়ার্ড পর্যায়েও বিএনপির কমিটি আছে। কিন্তু আন্দোলনের পর নেতারা বিভিন্ন মামলায় আসামি হয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে ছিলেন বা আছেন। এ অবস্থায় আবার নির্বাচনে গিয়ে নতুন করে মামলায় জড়ানোর ঝুঁকি এড়াতে এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেকে প্রার্থী হতে আগ্রহ দেখাননি বা রাজি হননি। যে কারণে ১০০টির বেশি ইউপিতে বিএনপি প্রার্থী দিতে পারেনি। সংগঠনের জন্য এটি উদ্বেগের বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ জানান, ছয় ধাপে মোট ৪ হাজার ১১৯টির মধ্যে ১০২টি ইউপিতে বিএনপি দলীয় প্রতীকে কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। এর মধ্যে ৫৭টিতে ধানের শীষ প্রতীকে কোনো প্রার্থী না থাকলেও স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে ১৮৮টি ইউপিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। আর ৫৯টি ইউপিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের হিসাবে, প্রথম ধাপে ১১৯, দ্বিতীয় ধাপে ৭৯, তৃতীয় ধাপে ৮১, চতুর্থ ধাপে ১০৬, পঞ্চম ধাপে ১০০ ও ষষ্ঠ ধাপে ৬৯টি ইউপিতে বিএনপির প্রার্থী ছিল না।
জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, দেশে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এখন সুস্থ অবস্থায় রাজনীতি করা দুরূহ। ত্রাস সৃষ্টি করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে, বাধা দিয়ে প্রার্থীদের অনেককে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি। অনেককে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এসব কাজে জড়িত ছিলেন।
কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির কাউকে মনোনয়ন দিতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল জানান, এটি কোনোভাবেই বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়। স্বাভাবিক পরিবেশ থাকলে, নিরপেক্ষ কমিশনের অধীনে নির্বাচন হলে বোঝা যেত বিএনপির অবস্থা।
বিএনপির সূত্র জানায়, যেসব এলাকায় দলটি প্রার্থী দিতে পারেনি বা শেষ পর্যন্ত দলের প্রার্থী ছিল না, সেসব ইউপির বেশির ভাগ খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে। কিছু জায়গায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয়ভাবে সমন্বয় হয়েছে। এসব জায়গায় জামায়াতের প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছেন।
কিছু জায়গায় বিএনপির নেতারাও ‘প্রতিকূল’ পরিস্থিতির কারণে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। তা ছাড়া শুরু থেকে ইউপি নির্বাচনকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি বিএনপি। এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বিএনপির কাছে প্রধান ছিল এটি প্রমাণ করা যে বর্তমান কমিশন ও সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
বিএনপির ইউপি নির্বাচন সমন্বয়ক দলের সদস্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান জানান, আওয়ামী লীগ ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। তাদের প্রাণনাশের হুমকিধমকি, নিপীড়নের মুখে ভোটে থাকা খুব কঠিন। অনেক জায়গায় প্রার্থীরা নিজের ভোটই দিতে পারেননি। এই নির্বাচনে স্পষ্ট হয়েছে, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না।
এমবি





