আজ সেই বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট । ১০ বছর আগে ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড হামলা চালায় । আর এ নারকীয় হামলায় সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে রক্তের স্রোত বয়েছিল।
হামলায় মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী গ্রেনেডের আঘাতে মৃত্যুর বরণ করেন। আর আওয়ামীলীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও হতাহত হন অনেকে। স্পিন্টার দেহে বহন করে এখনও বেঁচে আছেন অনেকে। এমনকি ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মো.হানিফের মতো অনেকের শরীরে শত শত স্পিন্টার নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেছেন।
আহত হন অসংখ্য নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। তাদের অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আবার অনেকে অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। তাদের কেউ খবরও রাখে না। এমনই কয়েকজন পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা হয় টাইম নিউজ বিডির সাথে। নিম্মে তাদরে কয়েকজনের পরিচয় তুলে তুলে ধরা হলো।
নিহত শামসুদ্দিন আহমদের পরিবার : ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত হন শামসুদ্দিন আহমদ। তার পরিবার বর্তমানে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসাবো এলাকায় থাকেন। শামসুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায়।
তার স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন,স্বামী মাছের ব্যবসা করতেন এবং তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২১ আগস্টের হামলায় তিনি মারা যাওয়ার পর চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমি খুব কষ্টেই আছি। এক ছেলে মুদি দোকানে, আরেক ছেলে গ্রিলের দোকানে কাজ করে। আর দুই ছেলে বেকার। এভাবেই আমরা কষ্টের সাথে দিনানুপাত করছি।
তিনি আরও বলেন, কেউ এখন আর আমাদের খোঁজ-খবর নেয় না। আমি আমার স্বামী হত্যার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই।
নিহত যুবলীগ নেতা আতিক সরদারের পরিবার: গ্রেনেড হামলায় নিহত যাত্রাবাড়ী যুবলীগের নেতা আতিক সরদারের পরিবারও অর্থকষ্টে আছেন। আতিক মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ও ছোট ছোট তিন সন্তান নিয়ে চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
এ বিষয়ে আতিকের চাচা যাত্রাবাড়ীর যুবলীগের কর্মী ইকবাল হোসেন বলেন, আমার বড় ভাই (আতিকের) বড় মেয়ে এ বছর এসএসসি পাস করেছে। বাকি তিন জনই স্কুলে পড়ে। তার (আতিকের ) স্ত্রী জাহানারা বেগম চায়ের দোকান দিয়েছে। তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলছে। গ্রামের মানুষ যে যেভাবে পারে, তাদের সাহায্য করে । আমি আমার ভাই হত্যার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই।
নিহত রতন শিকদারের পরিবার : ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার চরকালীগঞ্জ এলাকায় বাড়ি রতন শিকদারের। দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় তিনিও নিহত হন। রতন শিকদার যখন মারা যান, তখন তাঁর বড় ছেলে নিয়াজুল হকের বয়স ছিল আট বছর। আর মেয়ে আমেনা জাহান স্বপ্নার বয়স মাত্র তিন বছর। এই দুই সন্তানকে আগলে এখনো বেঁচে আছেন স্ত্রী রোজী বেগম।
দয়াগঞ্জের মহুরীপট্টি এলাকার একটি ছোট্ট বাসায দুই সন্তান নিয়ে তিনি থাকেন। রোজী বেগম বিগত ২০০৪ সালের স্মৃতি চারণ করে বলেন, ২১ আগস্ট রাত ১১টার দিকে জানতে পারি আমার স্বামী মারা গেছে। পরদিন সকালে দুই সন্তান নিয়ে আমি স্বামীর লাশ নিতে আসি।
তিনি আরও বলেন, ২১ আগস্টের হামলায় তিনি মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে জীবন-যাপন করছি। বাসা-বাড়িতে কাজ করে কোন রকম খেয়ে-পরে আছি। কেউ আমাকে দুই টাকা দিয়েও সাহায্য করেনি। এমনকি কেউ এখন আর আমাদের খোঁজ-খবর নেয় না। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি টাকা-পয়সার দরকার নেই। আমি আমার স্বামী হত্যার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই।
পঙ্গু হালিম হাওলাদার : ফরিদপুর পৌরসভার বিভাগদী গ্রামের বাসিন্দা হালিম হাওলাদার । বর্তমানে তিনি ঢাকার মিরপুরের ১২ নম্বর খালেক মোল্লার বস্তিতে থাকেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় একটি পা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ডাক্তার একটি পা কেটে ফেলেছেন। গ্রামের জমি বিক্রি করে ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ্য হতে পারেনি।অর্থের অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, মিরপুর -১২ নম্বারে পিঠা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি। আমাকে কেউ কোন অর্থ দিয়েও সাহায্য করেনি। যারা আমার উপর গ্রেনেড হামলা করেছে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই।
পঙ্গু লিটন মুন্সির পরিবার : ঝিনাইদহ কোঁটচাঁদপুর উপজেলার সলেমানপুর গ্রামের ছাত্রলীগ নেতা পঙ্গু লিটন মুন্সির মা আছিয়া বেগম ও বাবা আইয়ুব আলী মুন্সিরও কান্না আজও থামেনি। তারা বর্তমানে পুরান ঢাকার ছোট কাটরায় থাকেন। একমাত্র ছেলে পঙ্গুত্ব বরণ করায় কষ্টে জীবন কাটছে তাদের ।
এ বিষয়ে কথা হয় লিটন মুন্সির মা আছিয়া বেগমের সাথে । তিনি জানান, একমাত্র ছেলে গ্রেনেড হামলায় আহত হলে দুই পা কেটে ফেলে ডাক্তার । এর পর থেকে বাসা-বাড়িতে কাজ করে খুব কষ্ট দিন পার করছি। আমাদের কেউ সাহায্য করেনা এবং খোজ-খবর নেয়না। তাতে কোন দু:খ আমার নাই । শুধু একটাই দাবি আমার নিরাপরাধ ছেলেকে যারা পঙ্গু বানিয়েছে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেখতে চাই।
উল্লেখ্য, বিগত ২০০৪ সালের সারাদেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২১ আগষ্ট বিকালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকেল পাঁচটায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন। আর আহত হন প্র্রায় ৩০০ জন ।এ ঘটনায় বিগত চারদলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদ প্রধান মুফতি হান্নান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুতফুজ্জামান বাবরসহ ২২ জনকে আসামি করা হলেও দীর্ঘ দশ ১০ বছরেও এর বিচার কাজ শেষ হয়নি ।
ঢাকা, ২১ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ