মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধীনে করা যাবে কিনা এ নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে।
জামায়াতের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত শেষে যখন অভিযোগপত্র প্রসিকিউশনে জমা পড়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে গত বৃহস্পতিবার রাতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলমান ট্রাইব্যুনাল আইনে জামায়াতের বিচার সম্ভব নয়।
অন্যদিকে এতদিন সরকারের যেসব এমপি মন্ত্রীরা চলমান আইনেই সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার সম্ভব বলে বক্তব্য দিয়ে এসেছেন, তারাও আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধীনে জামায়াতের বিচার সম্ভব কিনা এ নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599082.jpg[/img]
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘এ আইনের অধীনে বিচার করা সম্ভব নয়। তারপরও কেন তদন্ত করা হলো তা ঠিক বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘শাস্তির বিষয়টি যুক্ত করতে আমি আগেই বলেছিলাম, কিন্তু তারা তো সে সময় (গত বছর আইন সংশোধনের সময়) আমলে নেয়নি।’
আনিসুল হক আরও বলেন, ‘আমি বিচারের পক্ষে। কিন্তু বিচার শুরুর পর তো আর বলতে পারব না যে, শাস্তির কথা আইনে উল্লেখ নেই, তাই এখন কি করব। শাস্তি দেব কি দেব না।’
গত বছরে এ আইনটি সংশোধন করার সময় আপনি কি শাস্তির বিষয় যুক্ত করার জন্য বলেছিলেন? জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ইঙ্গিত দিয়েছিলাম যে, সংগঠনের বিচার করতে হলে শাস্তির বিধান রাখতে হবে। কিন্তু তখন সেটা রাখা হয়নি।’
‘শাস্তির বিধান উল্লেখ করে আইনটি পরিবর্তন করা হবে কিনা’ প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘এটা তো পরিষ্কার যে আইন পরিবর্তন করতে হবে। শাস্তির বিধান রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধন করা হবে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(১) ধারা অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল বিচার করতে পারবে।
আইনের ২০(২) ধারায় আছে ‘এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড বা অপরাধ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল যা সঠিক ও বিবেচ্য মনে করেন তা প্রদান করতে পারবেন’। কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হলে সংগঠনের বিরুদ্ধে কি শাস্তি হবে তার কোনো উল্লেখ নেই এ আইনে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599088.jpg[/img]
এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আইনের অধীনেই জামায়াতের বিচার করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনটি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানে। এ ছাড়া সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুদ্ধপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিচার করা যাবে।’
শফিক আহমেদ আরও বলেন, ‘বর্তমান আইনমন্ত্রী বলেছেন, এ আইনের অধীনে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব নয়, এটা ঠিক নয়। কারণ বিচার তো করবে ট্রাইব্যুনাল। আইনমন্ত্রী তো আর বিচার করবেন না। আদালতের কাছে প্রসিকিউশন প্র্রমাণপত্র দাখিল করবেন, এরপর ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত নিবেন যে, জামায়াতের বিচার করা যাবে কিনা। আর করলে কিভাবে করা যাবে এবং অপরাধ প্রমাণ হলে কি শাস্তি দেওয়া হবে।’
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599064.jpg[/img]
মামলার প্রায় সকল কাজ শেষ করার পরও জামায়াতের বিরুদ্ধে বিচার সম্ভব নয় কেন? জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর হায়দার আলী বলেন, ‘এ আইনের মাধ্যমে বিচার করে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যাবে না। কারণ সংগঠন নিষিদ্ধের কোনো বিধান এ আইনে নেই। এছাড়া শাস্তি কাকে, কীভাবে দেওয়া হবে তাও বলা নেই।’
শাস্তির বিধান উল্লেখ নেই তারপরও আপনারা কেন তদন্ত করার কথা বলেছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে হায়দার আলী বলেন, ‘জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কিভাবে করা হবে, কি শাস্তি চাওয়া হবে এ বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি।’
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599075.jpg[/img]
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এ আইনে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াত যদি কোনো অপরাধ করে তাহলে তার কর্মকর্তারা দায়ী হবেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে। সুতরাং সংগঠনের জন্য যদি তাদের আবারও বিচার বা শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে তা সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হবে।’
খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘এ আইনটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়। তাই এখন সংগঠনের বিচার করলে আন্তর্জাতিকভাবে বেশি নিন্দিত হতে পারে।’
এ ছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে গেলে আদালতের বিচার করার ক্ষমতা আছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599101.jpg[/img]
সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের প্রধান সমন্বয়ক এমকে রহমান বলেন, ‘এ আইনের অধীনে জামায়াতের বিচার ট্রাইব্যুনালে করা সম্ভব।’
অপরাধ প্রমাণের উপর ভিত্তি করে শাস্তির বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401603092.jpg[/img]
এ বিষয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তৈরির প্রসিকিউটর টিমের সমন্বয়ক ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘মামলার কোনো অবস্থান নিয়ে আমি কথা বলব না। তবে গত ১৯ মে থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরির কাজ বন্ধ রয়েছে। যেহেতু আইনমন্ত্রী বলেছেন, এ আইনের অধীনে মামলা সম্ভব নয়। সুতরাং এখন কি করা হবে তা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান জানান, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গত বছর নতুন করে আইনটি সংশোধন করা হয়েছিল। এখন জনগণের আকাঙ্ক্ষার দিকে লক্ষ্য রেখে আবার সংশোধন করা দরকার।
শাস্তির কোনো কথাই আইনে উল্লেখ নেই তারপরও তদন্ত সংস্থা কিভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চাইল-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত সংস্থা তার নিজ ক্ষমতাবলে কারও বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে। তদন্তের পর আমরা শাস্তি চেয়েছি, সেটা প্রসিকিউশন ঠিক করে আদালতে উপস্থাপন করবে। এরপর ট্রাইব্যুনাল যা ভালো মনে করেন তা নির্ধারণ করবেন।’
[b]ভোল পাল্টালেন এমপি-মন্ত্রীরা[/b]
এদিকে বর্তমান আইনেই ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের বিচার এবং নিষিদ্ধ সম্ভব বলে আগে যেসব মন্ত্রী ও এমপি বক্তব্য দিয়েছেন, তারাও এখন ভোল পাল্টিয়ে ফেলেছেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599094.jpg[/img]
গত ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন ,‘চলমান ট্রাইব্যুনালেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।’
চলমান আইনে জামায়াতের বিচার সম্ভব নয় আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্য জানতে চাইলে সুরঞ্জিত সেন বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আইনে জামায়াতের বিচার সম্ভব নয় মর্মে আইনমন্ত্রী যা বলেছেন তার ব্যাখ্যা তিনিই দিবেন। তবে জামায়াতের বিচার কবে হবে, কবে নিষিদ্ধ হবে এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।’
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599072.jpg[/img]
‘জামায়াত নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র’ বলে বিভিন্ন সময় মন্তব্য করেন সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। এখন তিনি বলছেন, ‘তাড়াহুড়োর তো কিছু নেই, জামায়াতের বিচার আস্তে আস্তে হবে।’
কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে যে মামলাগুলো বিচারের অপেক্ষায় আছে সেগুলো শেষ করার পর জামায়াতের মামলা নিয়ে ভাবা হবে।’
কামরুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াতের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে একটা মামলা বিচারাধীন আছে। ট্রাইব্যুনালে বিচার করার জন্য এত তাড়াহুড়োর তো কিছু নেই। আস্তে আস্তে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার জামায়াতের ভিতরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। সুতরাং ট্রাইব্যুনালের বিচারে আমরা সফল। এখন যেগুলো আছে সেগুলো শেষ করে তারপর জামায়াতের মামলার দিকে নজর দেওয়া হবে।’
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599091.jpg[/img]
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছিলেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে দ্রুতই জামায়াত নিষিদ্ধ করা হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।’
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201406/1401599060.jpg[/img]
গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার জন্য জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হবে।’
একই বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বঙ্গবন্ধু একাডেমি আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে।’
জানতে চাইলে নাসিম বলেন, ‘জামায়াতের মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রী তো কথা বলেই দিয়েছেন। ওটার সাথে আমি একমত। আইনমন্ত্রীর কথার পর আমার আর কোনো কথা নেই।’
প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধীসহ সাত ধরনের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনে গত ২৫ মার্চ জামায়াতের বিরুদ্ধে ৩৭৩ পৃষ্ঠার মূল তদন্ত প্রতিবেদনসহ ৯ হাজার ৫৫৭ পৃষ্ঠার নথিপত্র চূড়ান্ত করে তদন্ত সংস্থা। গত ২৭ মার্চ ওই প্রতিবেদন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। এরপর থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে আনু্ষ্ঠানিক অভিযোগ তৈরির জন্য কাজ করে আসছে তুরিন আফরোজের নেতৃত্বে গঠিত প্রসিকিউশন টিম।
কিন্তু, হঠাৎ করেই গত বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের আইনের আওতায় জামায়াতের বিচার সম্ভব নয় বলে গণমাধ্যমকে জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এ নিয়ে মতানৈক্য শুরু হয়েছে আইনজ্ঞদের মধ্যে। সূত্র দ্যা রিপোর্ট
ঢাকা, ১ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ