বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতে ইসলামীকে সরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।তিনি বলেন ,এই মহুর্তে জামায়াত ত্যাগ করার কথা আমি ভাবছি না।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল সেরিনায় জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জামায়াত ছাড়ার এ প্রস্তাব দেন।

খালেদা জিয়ার উদ্দেশে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে ১৯৯১ সালের মতো আপনাকে (খালেদা জিয়া) আন্দোলনে নামতে হবে। জামায়াত অপরাধ করেছে তার বাপ-দাদারা। তারা যদি আপনার সঙ্গে থাকতে চায়, আবার তারা ঘোষণা দিক- আমাদের পিতা-মাতারা ভুল করেছিল, তাদের ভুলের জন্য শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি, মুক্তিযোদ্ধাদের কবর জিয়ারত করব, তাদেরকে সঙ্গে নেন। কামাল হোসেনকে নেন, কাদের সিদ্দিকীকে নেন। আমাদের অলি আহমেদরা এখনও পুরোপুরি, বদরুদ্দোজা চৌধুরী আপনাদের সঙ্গে নাই, আমি জানি না।ংজামায়াতকে ছেড়ে দেন।’

খালেদা জিয়া এ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে জাফরুল্লাহকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘উনি অসুস্থ। তারপরও উনি ভালো কথা বলেন, সত্য কথা বলেন, অনেক উপদেশও দেন। উনার উপদেশ কিছু শুনি, কিছু শুনতে পারি না আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে।’

জাফরুল্লাহকে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়া আরও বলেন, ‘আমরা চাই, আপনার মতো আরও যারা আছেন, আপনি তাদের নিয়ে আসুন। আমি সবার সঙ্গে কথা বলব বা যেখানে বসতে চায়, আমি বসব। আমি কথা বলতে রাজি আছি। আমি কারও সঙ্গে এখন ছাড়াছাড়ি করতে চাই না। এখন দেশটাকে রক্ষা করা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে আমাদের এক হতে হবে।’

ইফতারে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, কর্নেল (অব.) জয়নুল আবেদীন, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি সৈয়দ ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খান, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, মশিউর রহমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, শাহ আবু জাফর, আতাউর রহমান ঢালী, শায়রুল কবির খান, আজিজুল হক লেবু কাজীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনে নির্ধারিত ট্রানজিট ফি’র কম নেয়া দেশের জন্য ‘অসম্মানজনক’ বলে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশ স্বাধীন করেছি অন্য কারও হাতে তুলে দেয়ার জন্য নয়। এই যে ট্রানজিটের জন্য ফি ধরা হয়েছে ১৯২ টাকা। ২০০ টাকাও না। ছি ছি। এই টাকাটা না নেয়াই উচিত। এটা নেয়ার কোনো দাম নাই। এটা দয়া করা নয়।’

আজ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নেই মন্তব্য করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, স্বাধীনতার জন্য দেশের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, মা-বোনসহ অনেকে রক্ত দিয়েছেন, সম্মান হারিয়েছেন, আজকে দেশের এ অবস্থা দেখার জন্য তো নয়। এখনও আমরা যারা দেখছি, তারা তো বসে থাকতে পারি না। দেশটাকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সবাইকে সাহস করে কথা বলতে হবে। আপনাদের সঙ্গে সব সময় ছিলাম, আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। রাস্তায় যেতে বললে এখনও যেতে সাহস এবং ক্ষমতা রাখি।

বিডিআর হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, কারা এর সঙ্গে জড়িত আমরা জানি। আজ বিডিআর নেই। একসময় এই বিডিআর বাঘ ছিল এখন তাদের বিড়াল বানিয়ে ফেলা হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। মিয়ানমার আমাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছে কিন্তু তাদের গুলি করার সাহস পাচ্ছে না। তারা আমাদের মানুষের ওপর গুলি চালাতে পারে। এভাবে হাসিনা দেশের মানুষকে বিড়াল বানিয়ে রাখতে চায়। কারও সঙ্গে মিলে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। খালেদা জিয়া বলেন, আজকে সবাইকে টাইগারের ভূমিকায় আসতে হবে, লায়নের ভূমিকায় আসতে হবে, তাহলে শুধু দেশটাকে রক্ষা করা যাবে।

তিনি বলেন, দেশ আজ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পুলিশ-র‌্যাব একের পর এক মানুষ হত্যা করছে। তারা যা খুশি তাই করছে। নিজের আত্মীয়স্বজনকেও মেরে ফেলছে পুলিশ।

এর আগে বিএনপির নতুন কমিটি গঠন প্রসঙ্গে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপি সম্পর্কে বলতে চাই, আমি বলব, আপনার (খালেদা জিয়া) দিকে দেশবাসী তাকিয়ে আছে। আপনার দলের গণতন্ত্র প্রয়োজন। গণতন্ত্রের জন্য বলছি দলের স্থায়ী কমিটিতে ১৮ জনের স্থলে ২০ জন করেন। এর মধ্যে ১৫ জন নির্বাচিত হবেন আর ৫ জন আপনি মনোনয়ন দেবেন যাকে ভালো মনে করেন। আর জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ৬৫টা জেলা আছে, তাতে ৬শ’ নির্বাচিত করেন। আপনি প্রধান হিসেবে আপনার হাতে ২০-২৫ জন থাকবে। এভাবে করে দলের গণতন্ত্র নিয়ে আসুন।’

নিজের প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা, এভাবে দলকে সংগঠিত করে আপনাকে পথে নামতে হবে। এভাবে সবাইকে নিয়ে আপনি পথে নামলে কখনোই বিফল হবেন না।’ তিনি বলেন, রাস্তায় আপনার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে থাকবার কামনায় থাকলাম।

কথিত বন্দুকযুদ্ধে ‘ফাহিম’ হত্যার বিষয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রশংসা করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েকদিনে হঠাৎ যেন আমার মনে হল, আপনার (খালেদা জিয়া) একটু নড়াচড়া আছে। সামান্য নড়াচড়াতে আমাদের সংসদে কম্পমান সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আপনার এই দুই লাইন কথার জন্য সংসদে কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়েছে।’

এআই