টানা অবরোধ ও দফায় দফায় হরতালের মধ্যদিয়ে মাস পেরিয়েছে ২০ দলের আন্দোলন। ৫ই জানুয়ারি শুরু হওয়া এ আন্দোলনে প্রতিদিনই ঘটছে সহিংস ঘটনা। রাজপথে পুড়ে কয়লা হচ্ছে মানুষ। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর গুলিতে নিহত হচ্ছে একের পর এক বিরোধী নেতাকর্মী।

ইতিমধ্যে সারা দেশে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছে বিরোধী নেতাকর্মীসহ ৬০ জন। যাদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে অন্তত সহস্রাধিক যানবাহন। রাজপথের পাশাপাশি রেলপথ-নৌপথেও ঘটছে নাশকতা। এসব ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়াসহ বিরোধী জোটের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই দায়ের হচ্ছে একের পর এক মামলা।

খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে দায়ের হয়েছে নতুন ৫টি মামলা। ইতিমধ্যে সারা দেশে দায়ের হয়েছে অন্তত ৭০০ মামলা। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে দেড় লক্ষাধিক। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিরোধী জোটের অন্তত ১৭ হাজার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। তবে ২০ দলের দাবি গ্রেপ্তারের সংখ্যা ২৫ হাজারের মতো।

হতাহতের সংখ্যা:

৫ই জানুয়ারি থেকে চলমান অবরোধ-হরতালকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নিহত হয়েছে ৬০ জন। এর মধ্যে দলীয় কর্মী ১৭ জন ও সাধারণ মানুষ ৪৩ জন। ককটেল ও পেট্রল বোমায় নিহত হয়েছে ৩৪ জন, সংঘর্ষ ও হামলায় ১০ জন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ১৪ জন ও অন্যান্য ২ জন।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ, পেট্রলবোমা হামলা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় আহত হয়েছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীসহ অন্তত কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতারের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত কয়েক শ’ মানুষ।

মামলা ও গ্রেপ্তার:

চলতি বছরের ১ থেকে ১৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত হামলা-ভাঙচুর, নৈরাজ্য-অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়াসহ নানা অভিযোগে সারা দেশে দায়ের হয়েছে অন্তত ৩০০ মামলা। এসব মামলায় আসামি করা হয় ৬০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ৭০০০ নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ।

যদিও সরকারি হিসাবে আন্দোলনের প্রথম ১৫ দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৭০১৫। তবে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের তরফে গ্রেপ্তারের এ সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বলে দাবি করা হয়।

এ দিকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ১৭ই জানুয়ারি থেকে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা পর্যন্ত দলীয় জোটের ৯৫৮৫ জন নেতাকর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। এর মধ্যে- ১৭ই জানুয়ারি ৩৯৫ জন, ১৮ই জানুয়ারি ৫৮০ জন, ১৯শে জানুয়ারি ৪২০ জন, ২০শে জানুয়ারি ৪০০ জন, ২১শে জানুয়ারি ৭০০ জন, ২২ শে জানুয়ারি ৭০০ জন, ২৩শে জানুয়ারি ৫৮০ জন, ২৪শে জানুয়ারি ৫৫০ জন, ২৫শে জানুয়ারি ৫৪৫ জন, ২৬শে জানুয়ারি ৫৫০ জন, ২৭শে জানুয়ারি ৫২০ জন, ২৯শে জানুয়ারি ৬০০ জন, ৩০শে জানুয়ারি ৪৮০ জন, ৩১শে জানুয়ারি ৫৮০ জন।

১লা ফেব্রুয়ারি ৬০০ জন, ২রা ফেব্রুয়ারি ৫০৫ জন, ৩রা ফেব্রুয়ারি ৪৯০ জন ও ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ৩৮০ জনকে গ্রেপ্তার করে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। তবে বিএনপি-জামায়াতের কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, ১৭ই জানুয়ারির পর থেকে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি।

বিএনপিপন্থি কয়েকজন আইনজীবী জানান, দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় বিরোধী নেতাকর্মীদের প্রতিদিনই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তার অনেক তথ্যই গণমাধ্যমে পৌঁছে না। আবার অনেক তথ্য প্রকাশিত হয় না। এদিকে একই সময়ে রাজধানী ঢাকা, যশোর, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ঝালকাঠি, জামালপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দায়ের করা হচ্ছে অন্তত ৪০০ বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

চলমান আন্দোলনে মামলা ও গ্রেপ্তারের সিডর বয়ে গেছে দেশের কয়েকটি জেলায়। বিশেষ করে যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজারে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। কোন কোন দিন এসব এক একটি জেলা থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭০-১২০ জন পর্যন্ত। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের স্থায়ী কমিটির, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব ও বিভিন্ন জেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  

যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের চিত্র:

৫ই জানুয়ারি ১০০টি, ৬ই জানুয়ারি ১০টি, ৭ই জানুয়ারি ২৭টি, ৮ই জানুয়ারি ৪৮টি, ৯ই জানুয়ারি ৪৩টি, ১০ই জানুয়ারি ১৩৪টি, ১১ই জানুয়ারি ৪৯টি, ১২ই জানুয়ারি ৩১টি, ১৩ই জানুয়ারি ১০৭টি, ১৪ই জানুয়ারি ৫০টি, ১৫ই জানুয়ারি ৪০টি, ১৬ই জানুয়ারি ৩৮টি, ১৭ই জানুয়ারি ৪০টি, ১৮ই জানুয়ারি ১৩টি, ১৯শে জানুয়ারি ৫০,

২০শে জানুয়ারি ২০টি, ২১শে জানুয়ারি ৪০টি, ২২শে জানুয়ারি ৫৩টি, ২৩শে জানুয়ারি ২৫টি, ২৪শে জানুয়ারি ৬টি, ২৫শে জানুয়ারি ৭টি, ২৬শে জানুয়ারি ২১টি, ২৭শে জানুয়ারি ৩০টি, ২৮শে জানুয়ারি ২৫টি, ২৯শে জানুয়ারি ২৮টি, ৩০শে জানুয়ারি ২০টি, ৩১শে জানুয়ারি ৪০।১লা ফেব্রুয়ারি ৩৫টি, ২রা ফেব্রুয়ারি ৩১টি, ৩রা জানুয়ারি ২৬টি, ৪ঠা জানুয়ারি ১২টি যানবাহন ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এছাড়া গত একমাসে রাজধানীতে ২২৭টি যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এদিকে কুলাউড়া, জয়পুরহাট, বগুড়া, চট্টগ্রামের মীরসরাই, কুমিল্লায় রেললাইন তুলে ফেলার ঘটনা ঘটে। ১২ই জানুয়ারি নরসিংদীতে রেললাইনের ব্রিজে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। গাজীপুরে শ্রীপুরে একটি ট্রেনে পেট্রল বোমা হামলায় ৫ যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সেপ্রেসে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

এছাড়া সদরঘাট ও বরিশালে লঞ্চে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ওদিকে কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের জোলাগাতি গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব জোলাগাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কার্যালয়ে পাল্টাপাল্টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া দেশের কয়েক জেলায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

অতীতের আন্দোলনে হতাহতের চিত্র:

১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারি-জুন মাসে ৬ষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছিল ৮২ জন। এর মধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ৩৬ ও সাধারণ মানুষ ৩২ জন এবং অজ্ঞাত ১৪ জন। ৮২ জনের মধ্যে পুলিশের গুলিতে ২২ জন, সংঘর্ষ-হামলায় ২৬ জন, বোমা হামলায় ১৯ জন ও অন্যান্য ১৫ জন। ২০০১ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছে ৯৬ জন। এর মধ্যে দলীয় কর্মী ৭৯ জন ও সাধারণ মানুষ ১৭ জন। হামলায় ৫৫ জন, বোমায় ১৮ জন, গুলিতে ১৪ জন ও অন্যান্য ৯ জন।

২০০৬ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছে ৩২ জন। এর মধ্যে দলীয় কর্মী ২৮ জন, সাধারণ মানুষ ৪ জন। হামলায় নিহত হয়েছে ২৭ জন, গুলিতে ৩ জন ও অন্যান্য ২ জন। সর্বশেষ ১০ম জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ৫ই জানুয়ারি পর্যন্ত ৫৯ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন দলীয় কর্মী ও ৪০ জন সাধারণ মানুষ। হামলায় নিহত হয় ২৫ জন, পেট্রল বোমায় ২২ ও অন্যান্য ১২ জন। সূত্র: মানবজমিন

ইআর