আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে ‘নীরব বিপ্লবে’র মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

 

মঙ্গলাবার বিকালে নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাসাসের নববর্ষের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়তিনি এ আহবান জানান।

 

খালেদা জিয়া বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। সিটি নির্বাচনেও মানুষ সেই পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দেবে। মানুষ এ সরকারের হাত থেকে রেহাই পেতে চায়। খালেদা জিয়া এসময় ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও মির্জা আব্বাসকে ভোটদেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানান। তিনি প্রার্থীদেরও এসময় পরিচয় করিয়ে দেন।

 

 

তিনি বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণে আব্বাসকে ভোট দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করে উন্নয়নের সুযোগ এবং উত্তরে আরেক শিক্ষিত ও মেধাবী প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকে সেবা করার সুযোগ দেবেন। আর, চট্টগ্রামে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলমকে নির্বাচিত করবেন।’

 

 

 

সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনলঙ্ঘন করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এই অবৈধ সরকার আইন লঙ্ঘন করে সবকিছু করছে আর আমাদের বাধা দিচ্ছে। আপনাদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি ২৮ এপ্রিল নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে নীরব বিপ্লব ঘটাবেন। এর মাধ্যমে জালেম সরকারকে দেখিয়ে দেবেন আপনারা কি করতে পারেন।’

 

 

 

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী হিসেবে দক্ষিণে মির্জা আব্বাস এবং উত্তরে তাবিথ আউয়ালকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলনে’র ব্যানারে তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন। উত্তরের প্রার্থী তাবিথের প্রতীক ‘বাস’। আর আব্বাসের প্রতীক মগ। এ ছাড়া চট্টগ্রামের মেয়র পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম।

 

হাইকোর্টে জামিন চাওয়া বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাস এখনো পর্যন্ত প্রচারণায় নামতে পারেননি। যদিও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকন পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণায় রয়েছেন। তবে আব্বাসের স্থলে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে উত্তরেও তাবিথ গণসংযোগে নেমেছেন।

 

সিটি কর্পোরেশনের আগের নির্বাচনগুলোতে বিএনপি জয়ের চিত্র তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, ‘অবৈধ সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘোষণা করেছে। তারা ভেবেছিল, আন্দোলনে থাকায় বিএনপি নির্বাচনে আসবে না।’

 

‘কিন্তু আমরা বলতে চাই, আমাদের আন্দোলন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে। যতগুলো স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে, বিএনপি তার সবগুলোতে অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করেছে। আপনাদের সহযোগিতায় এবার ঢাকাতেও জয় হবে।’

 

সিলেট, খুলনা, বরিশাল রাজশাহীসহ বিভিন্ন সিটি নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর জয় প্রমাণ করে, মানুষ পরিবর্তন চায়- এমন মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘এই নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, মানুষ গুম-খুনের সরকারকে আর দেখতে চায় না। মানুষ পরিবর্তন চায়, তাই ঢাকাতেও অন্যান্য জেলার মত ফলাফল আসবে।’

 

মঙ্গলবার বিকেলে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাস এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে যোগদানকে উপলক্ষ করেই এক বছর পর বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর আগে গত ৩০ মে দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদৎ বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে খাবার বিতরণের একপর্যায়ে কার্যালয়ে এসে যাত্রা বিরতি করেছিলেন তিনি। ওই সময়ে কার্যালয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে যোহরের নামাজ আদায় করেন তিনি।

 

তার উপস্থিতির আগেই দলের এই কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। একপাশে নাইটিংগেল মোড়, অন্যদিকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। নেতা-কর্মীদের প্রচ- ভিড়ে প্রায় ১০ মিনিট কার্যালয়ের সামনে নিজের গাড়িতেই বসে থাকেন তিনি।

 

তবে বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষী আর কেন্দ্রীয় নেতাদের চেষ্টায় তিনি গাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু ভিড়ের কারণে তার জন্য নির্মিত মঞ্চের কাছে যেতে পারেননি খলেদা। অবশেষে রাস্তার মধ্যেই তাকে চেয়ার দেওয়া হয়। সেখান থেকেই বক্তব্য রাখেন তিনি।

 

বিএনপি নেত্রী তার বক্তব্যে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে মির্জা আব্বাসকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নগরবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মির্জা আব্বাসকে এর আগেও আপনারা মেয়র করেছেন। সে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে পরিচিত করেছে। কিন্তু এখন ঢাকা বসবাসের অনুপযোগী আর নোংরা শহরের তালিকার শেষ দুইয়ে আছে। নির্বাচিত হলে আবারো ঢাকাকে সব মানুষের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। তখন নিচের দিকে নয়, ঢাকার অবস্থান ওপরের দিকে থাকবে। আগের মতই ঢাকার পানি, গ্যাস, যানজট সমস্যা নিরসন করা হবে।’

 

উত্তরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তাবিথ উত্তরের শিক্ষিত ও মেধাবী প্রার্থী। সে বিদেশে পড়াশোনা করেছে, তার ব্যবসা রয়েছে। নির্বাচনে দাড়ানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু সে নগরবাসীর সেবা করার জন্য নেমেছে। তাকে সুযোগ দেবেন। তার কাছে উন্নয়নের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে।’

 

এ সময় চট্টগ্রামের বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলমের জন্যও ভোট চান তিনি। সরকার ‘চুরি করার’ কারণে ঢাকার রাস্তাঘাটের ‘বেহাল দশা’ হয়েছে’ দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে ঢাকা ‘তিলোত্তমা’ নগরী হবে।

 

বক্তব্যের শুরুতে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আশা করি, বাংলা নববর্ষ আমাদের জন্য ও দেশের জন্য শুভ হবে। আজ নতুন বছরে সবাই আনন্দ, গান বাজনা করবে- এটাই নিয়ম। সেই ধারাবাহিকতায় এখানে (দলীয় কার্যালয়) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু অনুমতি দেয়নি পুলিশ। অনুষ্ঠানের মঞ্চও বানাতে দেয়নি। এটি অত্যন্ত দু:খের বিষয়।’

 

তিনি বলেন, ‘এমন এক দেশে বাস করছি, যেখানে মানুষের কোনো অধিকার নেই। কথা বলার অধিকার নেই। প্রতি পদে পদে হত্যা নির্যাতন গুম, খুন। এই অবস্থান পরিবর্তন আনতে হবে।’

 

জাসাস সভাপতি আবদুল মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক কণ্ঠ শিল্পী মনির খান। উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ, বিএনপি সিটি নির্বাচন পরিচালনাকারী ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলনে’র স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজ উদ্দীন আহমেদ এবং সদস্য সচিব শওকত মাহমুদ, যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা প্রমুখ।

জেএ