‘ঈদের পরেই কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারের পতন ঘটানো হবে!’ প্রতিবার ঈদের নিয়মে ঈদ এসেছে আবার চলেও গিয়েছে। তবে বিএনপির এই বক্তব্য আজও আন্দোলনে রূপ নিলো না।

জাতীয় নেতাদের পাশাপাশি বিএনপির তৃণমুলের নেতারাও পিছিয়ে ছিলেন না এমন বক্তব্য প্রদানে। সর্বশেষ দলটির বিভিন্ন বিক্ষোভ কর্মসূচীগুলোতেও নেতারা ‘ঈদের পর সরকার পতনের কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে আসছে।’

বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ বলছে, অতীতে তারা অনেক বার বলেছেন ঈদের পরে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে সে বিষয়ে কিন্তু ঈদের পর আর কোনো আন্দোলন করতে পারেনি তার।

তাই মানুষ এখন আর এমন বক্তব্য শুনতে চায় না বিএপির নেতাদের কাছে। বারবার মানুষের কাছে হাসির খোড়াক হয়েও তারা এই বক্তব্য থেকে বেড়িয়ে আসেনি। তবে এবার আর আন্দোলনের সে সুযোগ নেই।

নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা টাইম নিউজকে জানান, ডিসেম্বরে একদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলিও জোট অংশগ্রহণ করলেও তাদের ভরাডুবি হয়। ফলে এখন বিএপির নেতা কর্মীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এমতো অবস্থায় দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি ও তাদের পুনরায় ঘুরে দাড়ানোর জন্য সত্যিকার অর্থে রাজপথে নামতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভিগের শিক্ষার্থী মো. নাছির হোসাইন টাইম নিউজকে জানান, মুখ রক্ষার জন্য হলেও ঈদের পরের আন্দোলন ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই বিএনপির হাতে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর আগের মতো ছাত্রদলকে দেখা যায় না। বিএনপির এই করুন অবস্থার জন্য তারা নিজেরাই দাই।

রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করেন, বিএনপি ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন যে এমন গান্ধিবাদী আন্দোলনে সরকার বিএনপির দাবি মানবে না। ফলে তারাও কঠোর আন্দোলনের ছক কষতে হবে তাদের। অন্তত শেষ কয়েক মাসের কার্যক্রম থেকেও তা আঁচ করা যায় যে এবার প্রকৃত পক্ষেই কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।

সে ছক অনুযায়ীই মহানগর ও জেলাসহ তৃণমুলের কমিটি গুলো আরও সচ্ছার করতে হবে।এতে করে সহযোগী সংগঠনগুলো ঘুম ভেঙ্গে আড়মোড়া দিয়ে উঠবে।

আন্দোলন নিয়ে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এড. তৈমূর আলম খন্দকার টাইম নিউজকে বলেন, সরকার যেভাবে নিপীড়ন নির্যাতনের মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছে। অপর দিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার নির্যাতন ঘুম-খুন করছে। তাদের লাশ ভেসে উঠছে নদীতে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের গুটিকয়েক লোক ছাড়া আর কেউই ভাল নেই।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির গণমানুষের একটি দল। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে আমরা ঈদের পর সারাদেশে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলে খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনবো এবং মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেবো।

নারায়নগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীদেরসহ সার দেশের সকল নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সামনে কঠিন সময়। সকল ভয় ভীতি উপেক্ষা করে কর্মীদের আস্থা অর্জন করে আগামীতে আরও দক্ষভাবে নেতৃত্ব দিতে হবে।

বিএনপি ধানমন্ডি থানা বিএনপির সভাপতি শেখ রবিউল আলম রবি টাইম নিউজকে বলেনন, বিএনপি একটা শান্তি প্রিয় দল। তাই বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার পর আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন চালিয়েছি। কিন্তু এখন বুঝে গেছি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আর আইনি লড়াই দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা সম্ভব না।

জনগনের কাছেও বিষয়টি স্পষ্ট। যেহেতু সরকার একপ্রকার তাল বাহানার মাধ্যমে আদালতকে প্রভাবিত করে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রেখেছে। সেহেতু আমরা এখন বিকল্প পথে আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। আমাদের নেতৃবৃন্দও প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

কঠিন এবং কঠোরতম আন্দোলনের মাধ্যমেই বেগম জিয়ার মুক্তি দিতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। সে হিসেবে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো বিএনপি কঠোর আন্দোলনে যেতে পারে। সেটা কেন্দ্র থেকে যথা সময়ে ঘোষণা করা হবে। আমরা তার অপক্ষোয় আছি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান দুদু টাইম নিউজকে বলেন, সরকার দেশের বিচার ব্যবস্থার উপর বন্দুক রেখে দেশের আইনের শাসনকে গলা টিপে হত্যা করেছে। প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে একটি মিথ্যা মামলায় বেগম জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দী করে রেখেছে। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে চিরতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে। আমরা অনেক ধৈর্য ধরেছি। এবার গণমানুষকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত ও মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, দেশ একনায়কতান্তিকভাবে চলছে। গণতান্ত্রিকভাবে বড় ধরনের কর্মসূচি পালনের পরিবেশ নেই। হরতাল–অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করলেই নির্যাতনের স্টিম রোলার চলতে থাকে। একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। ধরপাকড় চলে নির্বিচারে। বাসায়ও নেতাকর্মীরা থাকতে পারে না। ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারে না। পালিয়ে থাকতে হয়। এ জন্য শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন।

দলীয় সিদ্ধান্তে এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে বিএনপি, সামনে কঠোর কর্মসূচি দেয়ার আরো সময় আছে বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, হরতাল–অবরোধের মত কর্মসূচিতে সরকার বিএনপির নামে অপপ্রচার চালিয়ে থাকে। যেমন আগের হরতাল–অবরোধে সরকার জ্বালাও–পোড়াও করে দোষ দিয়েছে বিএনপিকে। এ জন্য এবার আমরা এ ধরনের কর্মসূচিতে যাচ্ছি না। কারণ, বিএনপি এ ধরনের কর্মসূচিতে গেলে আবারও সরকার নিজেরা জ্বালাও–পোড়াও করে বিএনপির নামে বদনাম ও অপপ্রচার চালাবে।

রাজনৈতিক বিশেজ্ঞরা মনে করেন বিএনপির শান্তিপূর্ণভাবেই আন্দোলন করে যাওয়া উচিত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে–পরে জ্বালাও–পোড়াওয়ের মতো নেতিবাচক রাজনীতি মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। বিএনপির প্রতি ওই সময় সবার একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছিল। দলটির ওই নেতিবাচক রাজনীতিটাই আওয়ামী লীগ পুঁজি করে ব্যবহার করছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। তাদের মতে, বেগম খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে গেলেও নমনীয় আন্দোলন–কর্মসূচি ও সংযত থেকে দলটি রাজনৈতিক পুঁজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। দলটির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ এটা। রাজনৈতিক কৌশলে আপাতত: আওয়ামী লীগ সফল হলেও খালেদা জিয়ার কারাবরণে বিএনপির প্রতি মানুষের কিছুটা হলেও সহানুভূতি বাড়ছে বলেও মনে করেন তারা।

এসএম