গত ১৫ই আগষ্ট জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জনাব মাহবুব উল হক হানিফ এর ধর্মনিরপেক্ষতার বক্তব্য নিয়ে জামায়াতি, হেফাজতি, জঙ্গীবাদি এবং শিবিরের ক্যাডার বাহিনীরা বিষয়টুকু ভালোভাবে উপলব্ধি না করে গত কয়েকদিন রীতিমত বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ করে হানিফ ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করে আসছে।

তারই আলোকে ধর্ম নিপেক্ষতা ও মদিনা সনদের নূন্যতম বিষয়টুকু জাতির সামনে লেখনীর মাধ্যমে পেশ করেছেন সম্মিলিত ইসলামী গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা আব্দুস সাত্তার।

ধর্ম মানবজীবনের অপরিহার্য পালনীয় বিষয়। ধর্ম মানুষকে পরিশীলিত করে, ধর্মপরায়ন জীব পরিচালনাকারী মানুষগুলো। পৃথিবীর কোন কিছুই ধর্মকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করতে পারে না।

ধর্মের বিস্তার সর্বব্যাপী। তাই সত্যানুরাগী মানুষ হয় ধর্মের সেবক ও ভক্ত। ধর্মের মূল শিক্ষা হলো উদারতা ও অন্যের অধিকার রক্ষার জন্য ধর্ম মানুষকে উৎসাহ প্রদান করে।

ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা স্বয়ং বিশ্ব জাহানের মালিকেরই পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে পবিত্র কোরআনের ভাষায়।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে চরম পন্থা অবলম্বন করো না”।

যার যার ধর্ম সে পালন করবে, স্বীয় ধর্মেও বিষয়াদি অন্য ধর্মের উপর চাপিয়ে দেয়ার বস্তু নয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই।

বস্তুত ধর্ম পালন যেমন ভক্তের আরাধ্য ব্যাপার তেমনি তাতে বিবেক বুদ্ধির উপাদানও সক্রিয় থাকতে হবে।

বিবেক বর্জিত ধর্ম পালন অন্ধত্বের নামান্তর আর আবেগহীন ধর্মচর্চা হলো প্রাণহীন দেহের ন্যায়। তাই ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় থাকা অত্যাবশ্যক।

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলাম তার শিক্ষামালায়অত্যন্ত সচেতনভাবে এ ব্যাপারে আন্তরিক। এক মুহূর্তের জন্যও ইসলাম এ থেকে বিচ্যুত হয়নি।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) প্রবর্তিত সমাজ ব্যবস্থা এর প্রকট জলন্ত উদাহরণ। তবে ধর্ম নিরপেক্ষতার সাথে রাসুল (সাঃ) কে জড়ানো কোন ভাবেই উচিৎ নয়। জড়ালে রেসালতের শানে বেয়াদবি হয়।

মহানবী (সাঃ) কর্তৃক প্রণীত মদিনা সনদ ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রসূত। এতে ধর্ম ও গোষ্ঠী প্রথার উর্ধ্বে মানবজাতির সর্বজনীন অখন্ডতা বিমূর্ত হয়ে উঠেছে।

গোত্র প্রথার অবসান ঘটিয়ে সকল শ্রেণীর লোকদের সমন্বয়ে একটি সাধারণ জাতি গঠন করে নবগঠিত মদিনা রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধানে তিনি সক্ষম হন এবং ধর্মীয় ও আঞ্চলিক গোড়ামি থেকে মুক্ত করে সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রচেষ্টায় সফল হন।

অপরাধের জন্য কেবল অপরাধীকেই দায়ী করা হবে এবং অপরাধের জন্য অপরাধীকে শাস্তি পেতে হবে ঘোষণা প্রদান করে একটি অপরাধমুক্ত সমাজ তৈরী করতে সক্ষম হন। দুর্বল ও অসহায়কে সর্বোতভাবে সাহায্য করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি শান্তিকামী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আবির্ভুত হন।

যুদ্ধ ঘোষণা করার ইখতিয়ার নিজের হাতে সংরক্ষিত রেখে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের কবল থেকে মানুষকে রক্ষা করেন এবং বিচার মীমাংসার দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেন। এভাবে তিনি সকলের অকুন্ঠ সমর্থনে বিশ্ব-সভার অভিভাবকের আসন অলংকৃত করেন।

মহানবী (সাঃ) এর এ কালজয়ী পদক্ষেপ মানব সভ্যতার উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছে। উন্নত সমাজ বিনির্মাণে মহানবী (সাঃ) কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচীর বিকল্প হতে পারে না।

ইতিহাস প্রমান করে, মহানবী (সাঃ) প্রণীত এই ঐতিহাসিক সনদ বিবদমান সম্প্রদায় সমূহের মধ্যে অন্তঃবিরোধ ও কলহের অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সম্প্রীতি, প্রগতি ও সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় অহমিকা, ধর্মবিদ্বেষ ও আঞ্চলিকতা মানবতারশত্র, প্রগতির অন্তরায়।

মদিনা সনদ এ দুষ্ট ক্ষতগুলো মুছে ফেলে এবং সামাজিক নিরাপত্তাবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা শানিত করে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সনদের ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে মানবাধিকার সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) এর মানবচেতনার যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায়।

১২১৫ সালের মেগনা কার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট, ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস এ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইট এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এর চৌদ্দশত বছর আগেই মানবতার মুক্তির কান্ডারী মহানবী (সাঃ) সর্বপ্রথম মানুষের আর্থ সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকার ঘোষণা করেন।

পরস্পর বিরোধী ধর্মীয় স¤প্রদায়ের মধ্যে মহানবী (সাঃ) কর্তৃক সম্পাদিত এ সনদ সমগ্র মানবমন্ডলী ও অখন্ড মানবতার এক চূড়ান্ত উত্তরণ।

সম্পাদিত সদন বলে মদিনায় একটি সাংবিধানিক আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরমহানবী (সাঃ) নানাবিধ বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন।

এ সময় অকল্পনীয় ভাবে একের পর এক ঐতিহাসিক ঘটনা সংগঠিত হতে থাকে। চতুর্দিক থেকে শত্র“ দ্বারা পরিবেষ্ঠিত হয়ে পড়েন।

কিন্তু মদিনা সনদে তিনি মানবতা ন্যায়ের যে বীজ বপন করেন তার মুকাবেলায় শত্র“পক্ষের সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

এভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে সততা-মানবতা-উদারতা-ন্যায়পরায়নতা এবং স্বীয় আদর্শের মাধ্যমে সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করেন। রাসুল (সাঃ) মদিনা সনদ সম্পাদন করার পর তিনি যে সব ঐতিহাসিক কর্তব্যাদি সম্পন্ন করেন তন্মধ্যে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয় উলে­খযোগ্য।

মদিনার সনদ ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত আন্তর্জাতিক সনদ:

বিভিন্ন গোত্র, গোষ্ঠি বা জাতির মধ্যে শান্তি স্থাপন ও পরস্পর নিরাপত্তার যে অঙ্গীকার করা হয়, তাকে আরবীতে মোয়াহাদা বা চুক্তি বলা হয়। আধুনিক বিশ্বেও সর্বপ্রথম লিখিত সনদকে ম্যাগনা কার্টা বলা হয়ে থাকে।

তারই পথ ধরে আজ জাতিসংঘ সনদ রচিত হয়েছে। কিন্তু ম্যাগনা কার্টা সনদের বহু পূর্বেই এখন থেকে ১৪২৮ বৎসর পূর্বে প্রথম হিজরী সালে মদিনায় সর্বপ্রথম লিখিত সনদ সম্পাদন করেছিলেন) গোটা জাতির সম্মানিত শিক্ষক নবী করিম (দঃ)।

মদিনায় হিজরত করে তিনি দেখতে পেলেন, সেখানে ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র-আউছ ও খাযরাজ বসবাস করছে। তদুপরি মক্কা হতে নবাগত মোহাজিরগণের একটি দল মদিনায় এসে বসতি স্থাপন শুরু করেছেন।

এমতাবস্থায় পরস্পরের মধ্যে সহাবস্থান, শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশসৃষ্টি করার একান্ত প্রয়োজন ছিল। তাই নবী করিম (দঃ) সকলকে নিয়ে একটি সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদন করলেন। এতে উল্লেখ ছিল-

“বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের লোক নিজ নিজ ধর্মমতে অটল থেকে নিজেদের মধ্যে সহনশীলতা ও সহাবস্থান বজায় রাখবে এবং বহিরাক্রমণ থেকে সম্মিলিতভাবে মদিনাকে রক্ষা করবে।

পরস্পরের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ দেখা দিলে সে ক্ষেত্রে নবী করিম (দঃ)-এর ফয়সালা চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে”। এভাবে আন্তঃধর্মীয় ও মাল্টি কালচার বিশিষ্ট একটি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হলো।

এই সনদ বা দলিলকে মদিনার সনদ হিসেবে বিশ্বের সকল মুসলমানসহ সকল ধর্মের মানুষ জানে এবং মানে।

এই মদিনার সনদকে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি ভিন্ন খাতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে সে মদিনার সনদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনবিজ্ঞ।

ইআর/এসএইচ