আবু তাহের মুহম্মদ গোলাম মাওলা চৌধুরী, পরিচ্ছন্ন এক রাজনীতিক। তিনি ১৯৫৩ সালে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়ার জগন্নাথ সেনাপুর গ্রামের স্বভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মরহুম আবু নাছের চৌধুরী। তাঁর পিতা আবু নাছের চৌধুরী ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মাতা আনোয়ারা বেগম ছিলেন একজন গৃহিনী।
৭ ভাই ৩ বোনের মধ্যে মাওলা চৌধুরীর ৪ ভাই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বড় ভাই আওরঙ্গজেব চৌধুরী সাজু বিএনপি, এ টি এম গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী খেলাফত মজলিশের রাজনীতি এবং ছোট ভাই মোতাহার হোসেন চৌধুরী রাশেদ জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। গোলাম মাওলা চৌধুরীর স্ত্রী শাহানারা বেগম একজন গৃহিনী।
এক পুত্র সন্তানের পিতা চির সংগ্রামী মোড় খাওয়া প্রবীন এই রাজনীতিবিদ। তার পুত্র মুহম্মদ বিজয় চৌধুরী (চৌধুরী আব্দুল্লাহিল মাওলা) অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ব্যাক্তিগত জীবনে সে একজন উদীয়মান ক্রিকেটার। অনুর্ধ্ব ১৮ তে ফেনী জেলা ক্রিকেট টিমের হয়ে খেলছেন বিজয় চৌধুরী।
ত্রিপুরার প্রথম মসলিম স্বাধীন নবাব শমসের গাজীর সপ্তম বংশধর এ টি এম গোলাম মাওলা চৌধুরী, শিক্ষা জীবন শুরু করেন শুভপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর জগন্নাথ সোনাপুর স্কুল, দক্ষিণ বল্লভপুর উচ্চ বিদ্যালয়, ফেনী সরকারী কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ এবং নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজ থেকে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করেন। স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির প্রতি দূর্বলতা ছিলো তাঁর। ছাগলনাইয়া-পশুরাম-ফুলগাজী, ফেনী-১ নির্বাচনী এলাকা নিয়ে যার রাজনৈতিক পরিমন্ডল।
৭১ এ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১ নম্বর সেক্টরের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, সবেমাত্র মেট্রিক পাশ বাউনডেলে কিশোর মাওলা চৌধুরী। আর স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের দূর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৯৭৩ সালে জাসদের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন এই মুক্তিযোদ্ধা।
৭৪ এ প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে গণবাহিনী গঠনকে কেন্দ্র করে মত-বিরোধ দেখা দিলে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। জাসদের রাজনীতিতে সক্রিয় হবার পর থেকেই তাঁর উপর চলে জেল-জুলুমসহ নানা ধরণের নির্যাতন। আর জাসদ ছেড়ে দেয়ার পর বেড়ে যায়, সেই মাত্র। তবে রাজনীতি করতে এসে শত নির্যাতনেও পিছু ফিরে তাকাননি মাওলা চৌধুরী।
ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। ১৯৭৪ সালে জাসদ ছাত্রলীগের ধানমন্ডি থানা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। জাসদের রাজনীতিতে জড়িয়ে প্রথম দিকে আত্ম গোপনে থেকেই চালিয়েছেন রাজনৈতিক কর্মকান্ড। তেমনি অবস্থায় ৭৪ এর মে মাসে আগ্নেয়াস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগে ফেনী থেকে আটক করা হয় নবাব শমসের গাজী এই বংশধরকে।
এ সময় ২ মাস ২২ দিন কারাভোগ করেন তিনি। সে সদয় পুলিশ রিমান্ডে তাঁর উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। পায়ের তালু ও হাঁটুর সেই আঘাত আজও যন্ত্রণা দেয় তাঁকে। দ্বিতীয় বার গ্রেফতারের শিকার হন ৮৫/৮৬ এর দিকে। তৎকালীন সরকার বিরোধী আন্দোলনে বেশ ক’বার আটক করা হয় তাঁকে। সবশেষ ১৯৯৮ সালের ৩০ মার্চ পার্বত্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে অনশন থেকে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী পালনের সময় আটকের শিকার হন সংগ্রামী এই রাজনীতিবিদ।
১৯৮০ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তরুন রাজনীতিক মাওলা চৌধুরী। পরে ১৯৮৪ সালে জাতীয়তাবাদি রাজনীতি নিয়ে মত পার্থক্য দেখা দিলে, পিএনপি গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তিনি। শুরুতে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেও, ৮৬ সালে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে পিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন এই রাজনীতিক।
দীর্ঘ ১৬ বৎসর পিএনপির রাজনীতিতে চারটি কাউন্সিলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি দেশের সংকটকালে জাতীয় রাজনীতিতে রয়েছে তাঁর বিশেষ ভূমিকা। রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন সক্রিয়।
২০০২ সালে তিন দলের যৌথ কাউন্সিলের মাধ্যমে জাগপা-পিএনপি বিলুপ্ত করে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। যোগদানের পর থেকে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে গেলো ১৬ বৎসর দায়িত্ব পালন করেছেন সততা, নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সঙ্গে।
আবু তাহের মুহম্মদ গোলাম মাওলা চৌধুরীর রাজনৈতিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ফেনী নদীর পানি রক্ষার দাবীতে লংমার্চ কর্মসূচীর উদ্যোগ। টিপাইমুখ লংমার্চ কর্মসূচী ঘোষনার আগেই ফেনীমুখি লংমার্চ করার প্রয়োজনীয়তা সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ ও বন্ধু মহলে তুলে ধরেন তিনি।
তাই দেশের অভ্যন্তরীন জলপ্রবাহ ফেনী নদী নিয়ে ভারতের আগ্রাসী নীতির প্রতিবাদ জানাতে প্রথম রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক দেন তিনি। তাঁর চিন্তা চেতনা নিঃসৃত ফেনী নদীর পানি রক্ষার দাবিতে লং মার্চ কর্মসূচী পালন করা হয়। শুরুতে চলে মাঠের পর্যবেক্ষণ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকা থেকে সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞ নিয়ে ফেনী নদীর প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।পরে এর উপর তৈরি করা হয় গবেষণাপত্র।

বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয় ধারাবাহিক প্রতিবেদন। চুড়ান্ত পর্যায়ে গবেষণারপত্র ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর সঙ্গে মুল্যায়ন বৈঠক করেন এ টি এম গোলাম মাওলা চৌধুরী। এর পর পরই ঘোষণা আসে ফেনী নদীর পানি রক্ষায় লংমার্চ কর্মসূচী। অনেক মতবিরোধ থাকলেও যা সাফল্যের সঙ্গে পালন করা হয় ৫ মার্চ ২০১২। এক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে ফেনীর জনসভায়। যা সমাদৃত হয় সকল মহলে।
১৯৭৫ সালে চামড়া শিল্পের কল্যাণে গঠিত হাজারীবাগ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, ১৯৮৫ সাল ১৯টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত “ফারাক্কা সংগ্রাম পরিষদ” এর মহাসচিব, ১৯৮৬ সালে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৯৯০ সালে পাঁচ দলীয় মোর্চার প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৯৯৩ তে “সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ” এর মজলিসে সুরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় রাজনীতির বাইরে, বাংলাদেশ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উপদেষ্টা, এশিয়া মুসলিম যুব কল্যাণ পরিষদের উপদেষ্টা, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির সদস্য, ঢাকাস্থ ফেনী জেলা সমিতি ৯৩ এর সহ-সভাপতি, ঢাকাস্থ ছাগলনাইয়া ছাত্র কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা এবং শমসের গাজী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এ টি এম গোলাম মাওলা চৌধুরী।
এখন তিনি ববি হাজ্জাজকে নিয়ে নতুন একটি দল গঠনে নিয়েজিত রয়েছেন। আর দলের কার্যনির্বাহী পরিচালনায় আছেন সদ্য জাপা ছেড়ে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের মুহম্মদ গোলাম মাওলা চৌধুরী। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইসলামী মূল্যবোধ ও জনগণের গণতন্ত্রকে মূল প্রতিপাদ্য রেখে তৈরী করা হচ্ছে আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় থাকা নতুন এই দলটির ঘোষনাপত্র এবং গঠনতন্ত্র।
এআই





