বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও আপাতত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার।

চলমান সঙ্কট আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কা, জনমনে বিরূপ প্রভাব এবং প্রবল কূটনীতিক চাপের মুখে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা।

সেজন্য আদালতের নির্দেশের পরও এখনই খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের ঝুঁকি নেয়া হচ্ছে না বলে আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন চাপের মুখে সাময়িকভাবে গ্রেফতার এড়ানো গেলেও খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবেনই। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সরকারের সর্বোচ্চ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রেফতার কার্যক্রম হতে পারে কয়েক ধাপে ও ভিন্ন কৌশলে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, সরকার খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে অনেক আগেই। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে এ কাজে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা। সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও শেষ করা হয়।

তবে শেষ মুহূর্তে গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরকারকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে চলমান অস্থিতিশীলতা চরম পর্যায়ে পৌঁছতে পারে এবং গণতন্ত্রের যাত্রাও ব্যাহত হতে পারে ঢাকায় অবস্থানকারী কূটনীতিকেরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১৬ দেশের কূটনীতিকেরা গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার গ্রেফতার এবং দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহলের কঠোর নজরদারি সরকারকে ভাবিয়ে তোলে।

এ দিকে ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ক্রাইসিস গ্রুপ’ গত মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনে গত জানুয়ারি থেকে ১০০ জনেরও বেশি লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের আদালত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট আরো বাড়বে।’

সরকারের ভেতরে বড় একটি অংশ মনে করছে, এ অবস্থায় দেশের সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হলে গণতান্ত্রিক সরকারের সবচেয়ে বড় অগণতান্ত্রিক আচরণই প্রমাণ হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা সরকারের জন্য বাড়তি ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

অন্য দিকে দুই মাস ধরে চলা বিএনপি জোটের অবরোধ-হরতালে ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি গভীর খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী এরই মধ্যে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে।

এ অবস্থায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে তাদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বাড়তে পারে অস্থিতিশীলতা ও নাশকতা। এতে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সরকারের উচ্চপর্যায়ে এমন রিপোর্ট দিয়েছে। ফলে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও সরকার আপাতত সেখান থেকে সরে আসে।

ওদিকে মতাসীনদের কেউ কেউ মনে করছেন, আন্দোলনে গতি আনতে এবং দেশ-বিদেশের আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে বেগম জিয়া নিজ থেকেই গ্রেফতার হতে চান। মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দিয়ে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন তিনি। তাই সরকার তাকে এখনই গ্রেফতার করে ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছে না। কারণ এতে গ্রেফতারের সুফল সরকারের চেয়ে বিরোধীদের ঘরেই যাবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বুধবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, আদালতে গরহাজির হয়ে খালেদা জিয়া নিজেই গ্রেফতার হতে চাইছেন। উনি (খালেদা জিয়া) বিদেশীদের সিমপ্যাথি (সহানুভূতি) চান। বিদেশী পত্রিকায় একটু পাবলিসিটি চান। এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী পদপে নেয়া হবে।

তবে ভিন্ন কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, হুটহাট এখনই গ্রেফতারের ঝুঁকি না নিলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হবে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী নেতাদের মতে তার উসকানিতে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাই খালেদা জিয়াকে ছাড় দিতে চায় না সরকার।

এ ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যেকোনো সময় খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে এক দফা তল্লাশি চালানো হতে পারে। ওই তল্লাশিতে কার্যালয়ে অবস্থানরত সব স্টাফকে বের করে দেয়া হবে। এ অবস্থায় কমপে দুই-এক সপ্তাহ তাকে একা থাকতে হতে পারে। শেষ ধাপে আদালতের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হবে। এর আগে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারে দেশে-বিদেশে ইতিবাচক মনোভাব ও জনমত সৃষ্টি করতে নানা উদ্যোগ নেবে সরকার।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতিম লীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারে আওয়ামী লীগ কোনো চাপের ভয় করে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(সূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত)

 

এমকে