উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে লন্ডনভিত্তিক একটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সে দেশের পার্লামেন্টের কয়েকজন প্রভাবশালী এমপি (সংসদ সদস্য)। তাঁরা এ বিষয়ে তাঁদের সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ভূমিকা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কনজারভেটিভ পার্টির প্রভাবশালী সদস্য ডেভিড ব্যারোজ এমপি ও অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জিম ফিজ প্যাট্রিক গত ১৫ জুলাই হাউস অব কমনসে এক সংবাদ সম্মেলনে এ উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন।
তাঁরা জানান, ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকারকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। জমির টেলিকমের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের নিরপেক্ষ, ন্যায় এবং জবাবদিহিমূলক আচরণ নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানিয়ে কমনওয়েলথের কাছেও চিঠি দিয়েছেন তাঁরা।
ওই সংবাদ সম্মেলনের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদপত্র ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসে ‘জমির টেলিকম : এমপি’স ডিমান্ড ইউকে গভর্নমেন্ট অ্যাকশন ওভার আনলফুল ডিসকানেকশন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ সংবাদপত্রে সমস্যাটি নিয়ে এর আগেও পাঁচটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
১৫ জুলাইয়ের ওই সংবাদ সম্মেলনে জমির টেলিকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর লিখিত নির্দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল তাদের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়াতে তারা ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। এর কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত অনেককেই ছাঁটাই করা হতে পারে।
জানা যায়, ওই দিন যুক্তরাজ্য সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী রদবদল হওয়ার কারণে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেননি অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যান মেইন এমপি ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির আরেক প্রভাবশালী সদস্য এবং ইমিগ্রেশন ও সিকিউরিটি মিনিস্টার জেমস ব্রোকেন শায়ার এমপি। তবে বিষয়টি নিয়ে তাঁদের অবস্থান একই। তাঁরা এ ক্ষতি বাংলাদেশের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ছেলের হিসেবে না দেখে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হিসেবে দেখছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানকে এই ঘটনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে বলেও তাঁরা মন্তব্য করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রশ্ন রাখেন, বিটিসিএলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জমির টেলিকম তাদের প্রাপ্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধ করছে না। এ বিষয়টিকে আপনারা কিভাবে দেখছেন?
এর জবাবে ওই ব্রিটিশ এমপিরা জানান, জমির টেলিকমের কাছে বিটিসিএলের যে দাবি, তা আদালতের বিচার্য বিষয়। বিটিসিএলকে আদালতেই তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ করতে হবে। এর আগে এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে জমির টেলিকমের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর জমির টেলিকম বিটিসিএলকে ৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৫৬ কোটি টাকা) বিল পরিশোধ করেছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে হঠাৎ করেই বিটিসিএল (বাংলাদেশ টেলিকম কম্পানি লিমিটেড) জমির টেলিকমের আন্তর্জাতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জমির টেলিকম ২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্যসহ বহির্বিশ্বের আন্তর্জাতিক টেলিফোন কল বাংলাদেশে পাঠিয়ে আসছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ কম্পানির সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে বিটিসিএল। ইনভয়েসিং এবং পেমেন্টকে কেন্দ্র করে বিটিসিএল এর আগে ২০১০ সালে একবার প্রতিষ্ঠানটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তখন বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ালে আইনি লড়াই শুরু হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগ তখন জমির টেলিকমের সংযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য বিটিসিএলকে নির্দেশ দেয়। উচ্চ আদালতের এক রুলিংয়ে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংযোগ অব্যাহত রাখতেও বলা হয় বিটিসিএলকে। এ ছাড়া এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন আদালতেও একটি মামলা চলমান রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় গত মার্চ মাসে হঠাৎ করেই আবার জমির টেলিকমের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিটিসিএল। এই বিষয়টি হাইকোর্ট বিভাগ এবং আরবিট্রেশন আদালতের দৃষ্টিতে আনা হয়। তখন আবারও নির্দেশ দেওয়া হয় সংযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য। কিন্তু বিটিসিএল সংযোগ না দিয়ে বরং নানা কৌশল অবলম্বন শুরু করে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের এক বিচারপতির প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিটিসিএল মামলার গতি ধীর করার কৌশল নেয়।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিটিসিএলের সঙ্গে জমির টেলিকমের আইনি লড়াই চলমান থাকা অবস্থায় সরকারের হীন উদ্দেশ্যে ভিন্ন একটি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করে জমির টেলিকমের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই জমির টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওফল জমির এবং তাঁর ভাই নওশাদ জমিরের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে নওফল জমির বলেন, ‘আমাদের কম্পানির সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বিটিসিএল অন্যান্য কম্পানির সঙ্গে কম রেটে আন্তর্জাতিক ফোন কল সরবরাহের চুক্তি করে আমাদের অসম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়। এতে আমাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, একপর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির শর্ত ভেঙে বর্ধিত হারে বিল নির্ধারণ শুরু করে বিটিসিএল। এ ছাড়া প্রকৃত কলসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি কল দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দেয়। এ নিয়ে কিছুটা ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ জমির টেলিকম মেনে চললেও ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রীর বেআইনি নির্দেশের কারণে বিটিসিএল তা মানছে না।’ সূত্র: কালের কণ্ঠ।
ঢাকা, ২২ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এনএস





