রাজনৈতিক যে কোনো সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে বাড়ানো হয়েছে তৃণমূল পুনর্গঠনের গতি। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো দ্রুত ঢেলে সাজানোর টার্গেট নিয়ে কাজ করছে দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

এরই অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে নোয়াখালী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে ৭৫ সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩০টির পুনর্গঠন শেষ হয়েছে।

চলতি মাসে আরও ১০টি জেলা ও মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি গঠনও শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি এই কমিটির অধীনে থাকা ৪৯টি থানা, ১০০টি ওয়ার্ড ও ৭টি ইউনিয়নের কমিটিসহ অঙ্গসংগঠনের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, নতুন কমিটি ঘোষণার পর যেসব এলাকায় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তা মিটিয়ে ফেলারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রাজশাহী মহানগর নেতারা খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে তাদের বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।

পুনর্গঠন বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। দ্রুতগতিতেই কাজ হচ্ছে।

সম্প্রতি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান এবং তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে চলমান পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে সিরিজ বৈঠক করেছেন। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে আরও শক্তিশালী করতে পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশ দিয়েছেন।

এসব বৈঠকে বিএনপি নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরে বলেছেন, সামনের দিনগুলো দেশের মানুষের জন্য সংকটময় হবে। এই সময়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। দলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ সরকার আবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করতে চাইবে। যদি দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সঠিকভাবে আন্দোলন গড়া সম্ভব হয়, তাহলে সরকার নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। নেতাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন দলের চেয়ারপারসনও।

বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান এসব বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হচ্ছে আমাদের মূল দাবি। সে নির্বাচন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সম্ভব নয়। তাই সংগঠনকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শক্তিশালী করে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করতে হবে।

এসব বৈঠকের পর গত সপ্তাহে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের যুগ্ম-মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে নেতাদের কাছে তৃণমূল পুনর্গঠনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। এখনও যেসব ইউনিট কমিটি গঠন হয়নি, তা করতে নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন মির্জা ফখরুল।

তৃণমূল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সরকারের বাধাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তৃণমূল পুনর্গঠন কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। প্রতিটি কমিটি গঠনে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আমাদের উদ্দেশ্য একটিই, তা হচ্ছে দলকে কিভাবে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সার্বক্ষণিকভাবে সে কাজটিই আমরা করে যাচ্ছি।

যেসব এলাকায় কমিটি গঠনের পর ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতারা কাজ করছেন। এরই অংশ হিসেবে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু, বর্তমান কমিটির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে রাজশাহী বিএনপি যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে থাকবে।

জানতে চাইলে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, নিজের সন্তানের মতো দলকে ভালোবাসি। সেই দল চোখের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা হতে পারে না। ম্যাডামকে বলে এসেছি, আগের মতোই বিএনপি রাজশাহীতে মাঠে থাকবে।

মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠনও চলছে পুরোদমে। সম্প্রতি মহিলা দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, জাসাসের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবর্তন আনা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক পদেও। কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দলের কমিটি গঠন নিয়ে কাজ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি কৃষক দলের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

সূত্র মতে, অনুমোদনের জন্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছে মহিলা দল। এছাড়া সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনের কাজও করছেন। টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি জেলা কমিটি তারা অনুমোদনও দিয়েছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও জাসাসের শীর্ষ নেতারাও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে কাজ করছেন।

যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন,আশা করছি আগামী মাসের মধ্যে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে পারব। শুধু যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নয়, গুরুত্বপূর্ণ জেলা বা মহানগর কমিটি নিয়েও আমরা কাজ করছি। যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার সঙ্গেই চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনাসহ সাংগঠনিক বিভাগীয় জেলা বা মহানগরের কমিটি ঘোষণা করা হবে।

মাহমুদ