বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ছাত্রদল হিসেবেই বহুল পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করা হয় এই সংগঠনটিকে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান। উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং শিক্ষা-ঐক্য-প্রগতি এই তিন মূলমন্ত্রকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই ছাত্রসংগঠনটি।
নব্বইয়ের গণঅভুত্থানে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার মাধ্যমে এই সংগঠনটি বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিতি পায়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401003190.jpg[/img]
কিন্তু স্বৈরাচার পতনের পর গণতান্ত্রিক উপায়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্ধারণে সাবেক বড় ভাইদের প্রভাব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হয়ে যায়, নেতৃত্ব পাওয়ার বিষয়টি যোগ্যতার চেয়ে কে কোন বড় ভাইয়ের অনুসারী সেটিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। যার কারণে নব্বই দশকের পরবর্তীতে ছাত্রদলে যোগ্য নেতা নির্বাচনের বদলে ভাইতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
এমনকি দলের চেয়ারপারসনের কথায়ও এই ভাইতন্ত্রের সত্যতা পাওয়া যায়। ২০১২ সালে বর্তমান কমিটি গঠন করার সময় বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘এবার ছাত্রদলে 'ভাইতন্ত্র' কাজ করবে না, যারা যোগ্য তারাই আসবে ছাত্রদলের নেতৃত্বে। তিনি আরও বলেছিলেন, ঐতিহ্য ফিরিয়ে ছাত্রদলকে দেওয়া হবে নতুন জীবন। যুক্ত করা হবে অভিজ্ঞ আর কর্মঠ যোগ্যদের। কিন্তু কমিটি গঠন করার সময় সেই হুঁশিয়ারি খুব একটা বাস্তবায়িত হয়নি ।
কারণ সাবেক বড় ভাইদের আধিপত্য অনেকটা খর্ব হলেও দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য, ঢাকা মহানগর বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা, বেগম জিয়ার এক উপদেষ্টা, গুলশান কার্যালয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা নতুন কমিটি গঠনে কলকাঠি নেড়েছেন। কমিটি গঠনের পর থেকেই এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়।
এমনকি দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড বলে পরিচিত নেতার মতামতকেও খুব একটা পাত্তা না দিয়েই তখন কমিটি দেয়া হয়।
অন্যদিকে খসড়া গঠণতন্ত্র লঙ্ঘণ করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার সময় ২৯১ সদস্যের যে বিশাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল তাতেও যোগ্য নেতৃত্ব ও নিয়মিত ছাত্রদের প্রাধান্য দেয়া হয়নি।
তখন এর যৌক্তিতার জন্য বলা হয়েছিল যে, আন্দোলন সংগ্রামের প্রয়োজনেই কমিটির কলেবর বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে ৬-৭টি উপদলে বিভক্ত গ্রুপগুলোকে শান্ত রাখতে এবং সাবেক ছাত্র নেতাদের আবদার পুরণ করার জন্যই সেটি করা হয়েছিল।
কিন্তু বিশাল কলেবরের কমিটি দিয়ে রাজপথের আন্দোলন তো দূরের কথা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক ছাত্রদের অধিকার আদায়ের কোনো আন্দোলনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেনি ছাত্রদল।
অথচ বিগত ৫ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সরকারী দলের ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীদের দ্বারা বারবার নির্যাতিত হয়েছেন। যৌক্তিক দাবী আদায়ের আন্দোলনে বারবার শিক্ষাঙ্গন উত্তপ্ত হয়েছে। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বও দিতে ব্যর্থ হয়েছে ছাত্রদল।
সব কিছু মিলিয়ে চরম নিয়ন্ত্রনহীন এই ছাত্রদলকে বিএনপির হাইকমান্ড ব্যর্থ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকবার। দলের নেতাকর্মীদেরও একই প্রশ্ন কেন বার বার ব্যর্থ হচ্ছে এক সময়ের ভ্যানগার্ড খ্যাত এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যোগ্যতার দিক বিবেচনা না করে কেবল কাছের লোক ও আঞ্চলিকতার কারণে অনেক অযোগ্যদের পদায়ন করা হয়েছে ছাত্রদলে। এমনকি অতীতে সরকারী চাকুরি থেকে বরখাস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও কেবল বিশেষ বিবেচনায় পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। এরপর তারা অনেকেই রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট কমিটি একইসঙ্গে ঘোষণা করায় রাজধানীতে ছাত্রদলের কোনো চেইন অব কমান্ড নেই। যার কারণে ৯ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি ছাড়াই চলছে ছাত্রদল।
কেন্দ্রের এই লেজেগোঁবড়ে অবস্থার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য শাখাগুলোতেও। কেন্দ্রের সমন্বয়হীনতা আর আগ্রহের অভাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই ৬-৭ বছর আগের কমিটি দিয়েই চলছে সংগঠন। কিন্তু পরিস্থিতি এমন নাজুক হলেও থেমে নেই আভ্যন্তরীন কোন্দল। নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি ছাত্রদলের রীতিমতো নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401003322.jpg[/img]
বিভিন্ন কলেজগুলোর কমিটির অবস্থা আরও শোচনীয়। এসব কলেজগুলোতে ১০ বছর আগের কমিটি এখনও বহাল। জেলা-উপজেলা কমিটিগুলোর অবস্থাও একইরকম। এমন জেলা শাখা রয়েছে যেখানে ১৫ বছর আগের কমিটি দিয়েই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এসব কারণে রাজপথের আন্দোলনে যেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে নি, তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক কোনো আন্দোলনেও সফলভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেনি ছাত্রদল।
অন্যদিকে নির্বাচনের পর বিএনপি চেয়ারপারসনের কথায় ব্যর্থদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের দিয়ে কমিটি ঘোষণা করা হবে। এমন কথায় নিয়মিত ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্বের প্রত্যাশীরা উদ্যোমী হয়ে দলের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ শুরু করে। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এবারো আগের মতই হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একজন সক্রিয় নেতা বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) বলেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি আর নেই। শিগগিরই এই শাখার নতুন কমিটি হবে। আর কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জেল থেকে বেরুলে নতুন কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তিনি বলেন, কিন্তু আড়াই মাসেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় আমার মত অনেকেই হতাশ। তারপরেও ম্যাডাম ছাত্রদলের অভিভাবক তার কথায় আস্থা রেখেই রাজনীতি করতে হবে।
ছাত্রদলের সবশেষ পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে সদ্য কারামুক্ত সংগঠনের সভাপতি আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ভবিষ্যতে ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় এবং শিক্ষাঙ্গণে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে যে কোনো ধরণের কঠোর কর্মসূচির পথে হাঁটবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে খুব দ্রুত ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করব। তারপর উনার পরামর্শে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করব।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কমিটি না হওয়ার বিষয় জানতে চাইলে, ছাত্রদল সভাপতি বলেন, সারাদেশের কমিটিগুলো করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে ২০ টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমগুলো কাজও শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের কারণে মাঝে অনেকদিন কমিটি গঠনের কাজ করা যায় নি।
এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক ছাত্র নেতা আমান উল্লাহ আমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ছাত্রদল সম্পর্কে ফোনে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।
[b]ঢাকা, এমএইচ, ১০ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]





