দলে বিভক্তি দেখিয়ে সরকার থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন।

সম্প্রতি পার্টিতে কো-চেয়ারম্যান পদ প্রতিষ্ঠা ও মহাসচিব পরিবর্তনের মাধ্যমে জাপা চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বকে পরিকল্পিত পাতানো খেলা বলে মনে করছে দলটির একাধিক সূত্র। আর এ সুবাদে দুই নেতা দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে এমন তথ্যও দলটির এ সূত্রের।

এদিকে দলটির বিশেষ বিশেষ মহলের কাছ থেকেও সম্প্রতি এ ধরনের কথাবার্তা এসেছে। জাপার দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি মানবকণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, রাজনীতিতে শেষ বলতে কিছুই নেই, এখন কি হবে, কিছুক্ষণ পর কি হবে, কেউ কিছু বলতে পারবে না। তাই সরকার থেকে নানা কৌশলে কাজ আদায় বা স্বার্থ হাসিল করাটা জাপার দোষের কিছু নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ শীর্ষ নেতা বলেন, পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও সদ্য বাদপড়া মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুকে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মন্ত্রী করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সম্প্রতি প্রস্তাব দিয়েছেন।

একইভাবে বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম রওশনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার জন্য সরকারের নীতি নীর্ধারণী মহলের কাছে অনেক আগ থেকে তদবির করে আসছেন বেগম রওশন। এসব দাবি সরকার বাস্তবায়ন না করায় হঠাৎ এরশাদ ও রওশন পারিবারিকভাবে সমঝোতার মাধ্যমে দাবিগুলো পূরণে নতুন করে দলে বিভক্তি দেখিয়ে পাতানো খেলা শুরু করেছেন।
এসব দাবি পূরণ না হওয়ার কারণে পার্টিতে বিভক্তি দেখিয়ে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে এ দাবিগুলো আদায় করার জন্য এমন করছেন এরশাদ ও রওশন। পার্টির দায়িত্বশীল কয়েক নেতার কাছ থেকেও এ তথ্য জানা গেছে। তবে পার্টির শৃঙ্খলা যেন ভঙ্গ না হয় সে কারণে এসব নেতা তাদের নাম গোপন রাখতে অনুরোধ করেন এ প্রতিবেদকের কাছে।

সরকার এ খেলা না বুঝলেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জাপাকে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাবে। এজন্য এরশাদ ও রওশনের মধ্যে জাপার কমিটিকে নিয়ে পাল্টাপাল্টি চিঠি চালাচালিতে এক ধরনের বিব্রতবোধ করবে সরকার। এদিকে জাপার আরো কয়েক নেতা জানিয়েছেন, সংসদে ও পার্টির নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে এরশাদ ও রওশনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে এ কথা বোঝাতে হবে সরকারকে। যদি ক্ষমতাসীনরা অনুভব না করে তাহলে জাতীয় পার্টিকে কোনো সুবিধা দেবে না। আর সুবিধা আদায় করতে হলে এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে দেখাতে হবে। তাহলে ক্ষমতাসীনরা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য তৎপর হবে।

জাপা সূত্রে জানা গেছে, পাতানো খেলায় এরশাদ বলবেন, মন্ত্রিসভা থেকে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হবে। রওশন বলবেন না। এ ধরনের কথা চালাচালি করতে থাকলে সরকার এক সময় বুঝবে জাতীয় পার্টি যদি সংসদ থেকে পদত্যাগ করে তাহলে সরকার টিকবে না। আর সংসদকে টেকাতে হলে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও রওশনের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করে তাদের সমস্যাগুলো নিরসনের উদ্যোগী হবেন। যদি সরকার সমাধান করতে পারে তাহলে পদত্যাগের বিষয় আসবে না। জাপার দাবিগুলো পূরণে সরকার যদি আন্তরিক না হয় তাহলে পাতানো খেলার মাধ্যমে এসব দাবি আদায় করে নেবে জাপা। সত্যিকার অর্থে গত কয়েকদিন ধরে এমন কথাই শোনা যাচ্ছে দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কাছ থেকে।

অন্যদিকে দাবি আদায়ে রওশন ও এরশাদের কৌশলের ব্যাপারে পার্টির কয়েক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, এ মুহূতে সরকার জাতীয় পার্টিতে বিভক্তি চায় না। আর সরকার ঝুঁকি নেবে না। জাতীয় পার্টি ভাঙলে বর্তমান সংসদ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সে জন্য জাপাকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলে সরকারের বেশি লাভ হবে। আর লাভের হিসাব দেখতে গেলে অবশ্যই সরকার এরশাদ ও রওশনের পারিবারিক সমঝোতার পাতানো খেলা মেনে নেবে।

অন্যদিকে দলটির দীর্ঘদিনের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলদার আগামী এপ্রিলে কাউন্সিলে ফিরে পাচ্ছেন পুনরায় মহাসচিবের পদটি। একইভাবে দলও ঘুরে দাঁড়াবে এ আশায় সব পরিকল্পনাই করে যাচ্ছেন জাপার এ দুই কর্ণধার। পার্টিতে বিরজমান পরিস্থিতি লেগে থাকলে এরশাদ ও রওশনের মধ্যে সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন। এ আশায় দলে বিভক্তি দেখিয়েছেন এরশাদ ও রওশন। আর সুযোগও বৃহস্পতিবার কাজে লাগিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন। সংসদ অধিবেশন চলাকালে শেষ বিকেলে সংসদে জাপার দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। অন্যদিকে সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

এদিকে পার্টির পাতানো খেলা সরকার যেন কোনোভাবে বুঝতে না পারে সেজন্য দলের শীর্ষ নেতা ও গোয়েন্দা সংস্থার ব্যক্তিদের কাছে কোনো ধরনের আলোচনা না করতে নির্দেশ দিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন। এ ব্যাপারে সদ্য নিয়োগ পাওয়া পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল হাওলাদার ও জিয়া উদ্দিন বাবলুর প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্ট করা হলে তারা কিছু বলতে চাননি।সূত্র: মানবকণ্ঠ

এমএইচ