এত বেশি বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভর বাজেট বিগত ৫০ বছরে এদেশে হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো: হারুনুর রশীদ এমপি।

আজ রোববার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ সালের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে হারুনুর রশিদ এ কথা বলেন।

হারুনুর রশিদ বলেন, উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রীর বাজেট শিরোনাম ছিল ‘জীবন-জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে আগামীর পথে বাংলাদেশ’। কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগে। বাইরের প্রতিক্রিয়া খুব ভালো হয়। ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বাজনা বাজানোর জন্য খুব সুন্দর হয়। কিন্তু কথায় আছে ‘উপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। আজকে ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এত বেশি বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভর যেটি দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এত ঋণনির্ভর বাজেট অতীতে কোনো সরকারের আমলে হয়নি।

বিএনপি দলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, গত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট এখানে সম্পূরক আলোচনা করা হয়েছে। সেই বাজেটও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আমরা বলেছিলাম করোনাকালীন যে বাজেট দেয়া প্রয়োজন সেটা সরকার দিতে পারেনি। বাস্তবিক অর্থে সরকারের নীতি ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জনদুর্ভোগ-ভোগান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমি সাম্প্রতিক সময়ে যদি উদাহরণ দেই তাহলে গত রমজান মাসে লকডাউনের মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ, ট্রেন বন্ধ, বিমান বন্ধ। আমরা ঈদের সময় দেখলাম মানুষের কী দুর্ভোগ। আজকে যে লোকটি গাড়িতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ৩০০-৫০০ টাকায় ঢাকা থেকে রাজশাহী যেতে পারত সেই লোকটিকে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। মাওয়াঘাটে লঞ্চ বন্ধ থাকার কারণে ঢালাওভাবে মানুষ ফেরিতে পার করলেন। তাতে সংক্রমণ হার বাড়লো এবং সেখান থেকে বেআইনিভাবে স্পিডবোটে পার হতে গিয়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এগুলো কী সরকারের ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা নয়? এগুলোর দায় সরকারকে নিতে হবে না?

হারুনুর রশীদ বলেন, আজকে সম্পূরক বাজেটের উপর আলোচনা করতে যাচ্ছেন। আমি আপনাকে (স্পিকার) অনুরোধ করবো সাধারণ বাজেটের উপর বিরোধী দলীয় সদস্যদের বেশি কথা বলার সময় দেবেন। কারণ সরকার তো বাজেট করেছে, সরকারের এই বাজেটের ভালো মন্দ দিকগুলো নিয়ে আমরাই কথা বলবো। সরকার তো সরকারের পক্ষে আলোচনা গুণগান গাইবেই, কিন্তু সরকারের যে বিষয়গুলো রয়েছে তা আপনার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে জানতে চাই।

তিনি বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সারাদেশকে অস্থির করে তুলেছে। আমার নিজের বিভাগ, রাজশাহী সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। এখন আমের মৌসুম, আম চাষীরা ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিরোধী দলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট যখন ছড়িয়ে পড়লো আমি তখন আমার নিজ জেলা প্রাশাসনকে বললাম, আমাদের দেশে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তারপরে যশোরের বেনাপোল প্রতিদিন হাজার হাজার ভারতীয় পণ্যবাহী গাড়ি আসছে। এর ড্রাইভার-হেল্পাররা যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে যে সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার সেটি সরকার করতে পারেনি বলেই আজকে বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। এটা একেবারে সত্য।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহর কাছে রাত-দিন সর্বদা প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তুমি আমাদের দেশের মানুষকে এই দুর্বিসহ অবস্থা থেকে রক্ষা করো। ভারতে যেভাবে মানুষের লাশ কবর দিতে না পেরে ও শ্মশানে সৎকার করতে না পেরে মানুষের লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে, এরকম পরিস্থিতি বাংলাদেশে যেন না হয়। এজন্য আমি সরকারকে বলবো সারাবিশ্বে যেটা প্রতিষ্ঠিত সেই ভ্যাকসিন আমাদের দিতে হবে। বাজেটে ভ্যাকসিনের কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন উল্লেখ করা হয়নি। করোনায় আক্রান্তের দেড় বছর হয়ে গেল। দুই শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে পারেনি। মানুষ ভ্যাকসিন কবে পাবে?

তিনি বলেন, চায়না ও রাশিয়া এসেছিলো। আমরা কেন গ্রহণ করিনি? তখন আমরা তাদের গ্রহণ করলে আজ তাদের কাছ থেকে আমরা ভ্যাকসিন পেতাম। আজকে ভ্যাকসিন নিয়ে চীনের সাথে কথা হচ্ছে, কিন্তু আমরা ভ্যাকসিন পাবো কি-না তা অনিশ্চিত। ভ্যাকসিন নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার বাংলাদেশ। তাই আমি আশা করবো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির ডিপো মন্তব্য করে এমপি হারুন বলেন, গত এক বছরে সরকার বলতে পারবে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিলো, সেটাতে জনগণের কোনো কল্যাণ হয়েছে বা সঠিক অর্থে করোনা নিয়ন্ত্রণে কাজে এসেছে কি-না। সঠিকভাবে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে হবে করোনাকালীন কত টাকা আপনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিচ্ছেন। আমি দাবি করবো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ এসব এলাকাগুলোতে প্রতিটি হাসপাতালে অন্তত পক্ষে প্রতিদিন এক শ’ বেডের করোনা ইউনিট দ্রুত স্থাপন করতে হবে সরকারকে। না হলে মানুষ রাস্তায় মারা যাবে।

এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি আপনাকে অনুরোধ করবো দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন। বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ করলেই শুধু হবে না। ডাক্তাররা এক দিকে সরকারি চাকরি করছেন অন্য দিকে বেসরকারি ক্লিনিকেও দায়িত্বপালন করছেন। তারা সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারিতে সময় বেশি দেন। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, স্বাস্থ্যবিভাগকে সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। আমরা দেড় বছর ধরে বলছি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু সরকার আমলে নিচ্ছে না। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে সরকার অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এবিএস