প্রস্তাবিত বাজেটকে 'গতানুগতিক' আখ্যা দিয়ে বিএনপি বলেছে, বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হলেও এতে শুভঙ্করের ফাঁকি থাকতে পারে।

বিএনপি মোবাইলে ফোনে কথা বলার ওপর বাড়তি করারোপের বিরোধিতা করে এটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেগার্মেন্ট শিল্পর ওপর উৎসে করারোপেরও সমালোচনা করেছে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে চলতি অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রয়ায় এসব কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আগামী অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে প্রায় ৩০০০ শব্দ খরচ করেছে বিএনপি। বিএনপি বলছে, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে সর্বোচ্চ (১৪.৭%) বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরে শিক্ষা খাত পিছিয়ে ছিল।

আগামী অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে একত্র করে বরাদ্দ দেবার ফলে বোঝা যাচ্ছে না শিক্ষা খাতে নিট বরাদ্দ কত এবং প্রযুক্তি খাতে নিট বরাদ্দ কত। এর মধ্যে শুভঙ্করের কোনো ফাঁক রয়েছে কি না সেটাই প্রশ্ন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ এর উদ্ধৃতি দিয়ে বিএনপি বলেছে, গেল দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে।

অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছেন। প্রতি বছর বেকার হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ।

বিএনপির বিশ্লেষণে বলা হয়, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কথা বলার ওপর বর্তমান ১৫% ভ্যাট এর অতিরিক্ত ১% সারচার্জ ও ৫% সম্পুরক কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন।

এতে ১০০ টাকার কথা বললে গ্রাহককে ২১ টাকা কর দিতে হবে। হাসপাতালে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্র এবং ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রামে ব্যবহ্রত কাগজ এর ওপর কর প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবাকে আরও ব্যয়বহুল করবে। আমরা মনে করি এসব ক্ষেত্রে কর প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প মালিকরা ০.৬ শতাংশ উৎস করের স্থলে ১.৫ শতাংশ হারে উৎস কর আরোপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এর ফলে ৩ শতাংশ হারে তারা যে মুনাফা করেন তার অর্ধেকটাই সরকার উৎস কর হিসেবে গ্রাস করবে।

তারা আরো মনে করেন উৎস কর বাড়ানোর ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সামগ্রিকভাবে রপ্তানিমুখী পোশাক খাত প্রতিযোগিতার শক্তি হারাবে। বিএনপি পোশাক শিল্প মালিকদের উদ্বেগের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আব্দুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনাম আহমেদ চৌধুরী,আব্দুল আউয়াল মিন্টু,সহ দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম প্রমুখ।

বিএনপির পূর্ণাঙ্গ বাজেট বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হলো:- গত ২ জুন ২০১৬ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০১৬ -২০১৭ অর্থ বছরের জন্য ৩ লক্ষ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা মোট ব্যয়ের বাজেট পেশ করেছেন।

বাজেটের এই আকার বাংলাদেশের অতীত বাজেটগুলোর ধারাবাহিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই বাজেটের মোট ব্যয় জিডিপির ১৭ শতাংশের মত।

এর আগের বাজেটগুলো জিডিপির ১৫ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে ছিল। এইদিক থেকে বলা যায় বাজেটটি এক অর্থে গতানুগতিক। বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা।

দূরবর্তী অতীতের বাজেটের আকারের সঙ্গে তুলনা করলে প্রস্তাবিত বাজেটটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। অর্থমন্ত্রী নিজেও বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন বাজেট ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হতে থাকার ফলে এই অঙ্কের বাজেট অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে।
২০১৫ - ২০১৬ অর্থবছরের জন্য ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আহরণ সম্ভব না হওয়ায় ২০১৫ – ২০১৬ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ২ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

অর্থাৎ ৩০ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা কমানো হয়। চূড়ান্ত হিসাব হলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেট ২ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

প্রস্তাবিত বাজেট (২০১৬-১৭) ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২৮.৭৪ শতাংশ বেশি, এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১৫.৪২ শতাংশ বেশি। বাজেটের আকার কতটা বাড়ানো যাবে সেটি প্রধানত নির্ভর করে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের জন্য আদায় করতে হবে ২ লক্ষ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই হার হবে ৩৫.৪ শতাংশ বেশি।

অর্থমন্ত্রী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ৬৫ পৃষ্ঠায় ১৯১ অধ্যায়ে বলেছিলেন, এনবিআরকে আদায় করতে হবে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

বর্তমান অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০১৬-১৭ এর লক্ষ্যমাত্রা হবে ১৫.১৮ শতাংশ বেশি। পর পর দুবার অর্থমন্ত্রী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সফল হবে বলে আশা পোষণ করেছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো তাকে আশাভঙ্গের কষ্ট পোহাতে হয়েছে। তাই আমাদের শঙ্কা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বললেই চলে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে সেক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী কি করবেন। পূর্ববর্তী অর্থবছরগুলোর মতন তাকে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রায় নিম্নমুখী সংশোধন করতে হবে।

নিম্নমুখী সংশোধনের মানে হল ব্যয় কাটছাঁট করা। কোথায় তিনি কাটছাঁট করবেন? শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মত কল্যাণমুখী খাত থেকে অথবা মানবকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, এমন কোন খাত থেকে।

অর্থমন্ত্রী রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু সেই অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কৌশল নির্ধারণে তাকে যত্নশীল হতে দেখি না।

বাংলাদেশে যথাযথ নীতি ও কৌশল গ্রহণ করলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বর্তমানের চাইতে দ্বিগুণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১১ শতাংশের অঙ্কে স্থিত হয়ে আছে।

এই অনুপাত বাড়াতে পারলে জনকল্যাণমুখী অনেক প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব। দুর্বলতা স্বীকার না করলে সমস্যা সমাধানের পথও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থমন্ত্রী যেভাবে ধমকের সুরে দুর্বলতা ঢাকতে চান তা কোনো ক্রমেই কাম্য নয়।

৩ লক্ষ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেটে অনুন্নয়ন বাজেট ২ লক্ষ ১৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ১ লক্ষ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

দীর্ঘকাল ধরে বাজেটের অনুন্নয়ন ব্যয় প্রাধান্য দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। বিএনপি মনে করে, বাজেটে অনুন্নয়ন ব্যয়ের বৃত্ত সঙ্কুচিত করতে হবে। এটি করা সম্ভব হলে অধিক হারে জনকল্যাণও নিশ্চিত হবে। একটি জাতীয় দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেটের মোট ব্যয় অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ব্যয় হবে ২১ হাজার ২৮৮ টাকা।

মাথাপিছু হিসেবে উন্নয়নের জন্য ব্যয় হবে মাত্র ৬ হাজার ৯১৮ টাকা। অন্যদিকে মাথাপিছু অনুন্নয়ন ব্যয় ১৩ হাজার ৪৮৪ টাকা। প্রতিটি নাগরিক পর্যায়ে মাথাপিছু উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের এই তুলনা নাগরিকদের জন্য হতাশা বয়ে আনে।

এবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২ লক্ষ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর অর্থ দাঁড়ায় মাথাপিছু কর দিতে হবে ১৫ হাজার ১৭২ টাকা।

বিদায়ী অর্থবছরে মাথাপিছু কর দিতে হয়েছে ১১ হাজার ২৭ টাকা। মাথাপিছু করের বোঝা বাড়ছে ৪ হাজার ৮৫ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে যেভাবেই কর আরোপের চিত্র দেখানো হোক না কেন বাস্তবে মানুষকে অতিরিক্ত করের বোঝা বহন করতে হবে। এর বিনিময়ে জনগণ কি পাবে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।
বাজেটে অর্থ সংস্থানের উৎস হিসবে রাজস্ব থেকে আয় ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ১০ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর থেকে আসবে ২ লক্ষ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ডবহির্ভূত কর থেকে ৭ হাজার ২৫০ কোটি, কর ছাড়া ৩২ হাজার ৩৫০ কোটি এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে ৫ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

 

এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ৭১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রাস্তাবিত বাজেটে। আগের বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৬৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, সম্পুরক শুল্ক থেকে ৩০ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত বাজেটের কর কাঠামোর দিকে লক্ষ্য করলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় আমাদের কর কাঠামো পরোক্ষ কর নির্ভর অর্থাৎ ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক নির্ভর।

 

অর্থমন্ত্রী ‘প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, ও সমতাভিত্তিক সমাজ’ প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রার অঙ্গীকার নিয়ে যে বাজেট ঘোষণা করেছেন সেটি পরোক্ষ কর নির্ভর হবার ফলে সমতা অর্জনে প্রণিধানযোগ্য কোন ভূমিকা রাখবে না।

বাণিজ্য উদারীকরণ ও বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থার সঙ্গে চুক্তির ফলে আমদানি শুল্কের উপর ক্রমান্বয়ে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। ফলে ভ্যাট ও আয়করের উপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। এর মধ্যে ভ্যাট, গরিব-ধনীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। কিন্তু আয়কর একটি প্রগতিশীল কর এবং ধনাট্য ব্যাক্তিদের উপর এর বোঝা আরোপিত হয় এবং সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়।

 

বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রপের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ ১.২০ কোটি ব্যাক্তি বার্ষিক ৬০০০ ডলার (৪ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা) এর বেশি আয় করে; অথচ বাংলাদেশে নিবন্ধিত আয়কর দাতার সংখ্যা মাত্র ১৮ লাখ, এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ১১ লক্ষ করদাতা বার্ষিক আয়কর বিবরণী দাখিল করেন।

স্পষ্টতই উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে বিশাল অঙ্কের আয়কর আহরণ সম্ভব হবে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যটিও সহজসাধ্য হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই লক্ষ্যে সৃজনশীল উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

 

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘অবশেষে আমরা ছয় হতে সাড়ে ছয় শতাংশের বলয় অতিক্রম করে চলতি অর্থবছরে ৭.০৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করব বলে আশা করছি। এর ফলে মাথাপিছু আয় উন্নীত হবে ১৪৬৬ মার্কিন ডলারে’।

আমরা ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে প্রবৃদ্ধির হিসেব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছি। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ মন্থরতা, রাজস্ব সংগ্রহে বিশাল অঙ্কের ঘাটতি, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতার অভাব প্রভৃতি কারনে চলতি অর্থবছরে ৭.০৫ এই মাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছি।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার ১২ পৃষ্ঠার সারণি ১ থেকে দেখা যায় ২০০৬-০৭ সালে ৭.০৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির এই হিসাব আমাদের জানামতে ২০০৫-০৬ কে ভিত্তি বছর গন্য করে নির্ণয় করা হয়েছে।

কাজেই চলতি অর্থবছরে ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার অতিক্রম করে ৭ শতাংশের কোঠায় প্রথমবারের মত পৌঁছেছে বলে দাবি করা তথ্যসম্মত নয়।

অর্থমন্ত্রী আশা করছেন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ২২.০৭ শতাংশ থেকে ২১.৭৮ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের এই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসার যুক্তিসঙ্গত কোনো কৌশল বলা হয়নি।

ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ- গ্যাসের মত প্রাইমারি এনার্জির অভাব, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা, সরকারের ক্রনি ক্যাপিটালিজমমুখী নীতির ফলে সরকারের অনুগ্রহের বাইরে অবস্থানকারী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, গণতান্ত্রিক অধিকার দলন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাহীনতার ফলে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে।

কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়নি। সব মিলিয়ে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ মন্দা চলছে। অনেকে ভবিষ্যৎ আশাব্যাঞ্জক মনে না করার ফলে বিদেশে পুঁজি পাচার করছে।

বাংলাদেশ থেকে কেবল ২০১৩ সনে ৭৬ হাজার ৩ শত ৬১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা পাচার হয়ে গেছে। ২০০৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজি বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। এসব তথ্য ‘গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই চিত্র খুবই ভয়াবহ। প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজি পাচার রোধে নীতি কৌশলগুলো সুচিহ্নিত করা হয়নি।

সরকার ব্যক্তিখাতে পুঁজি বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারি বিনিয়োগের উপর নির্ভর করছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগ পূর্ববর্তি বছরের সরকারি বিনিয়োগের জিডিপি হার ৬.৮২ শতাংশ থেকে ৭.৬০ শতাংশ হারে উন্নীত করা হয়েছে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ এর বিকল্প না থাকলেও সামগ্রিক ভাবে সরকারি বিনিয়োগ ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের বিকল্প হতে পারে না।

বস্তুত বেসরকারি খাত সরকারি খাতের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে সক্ষম। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি বলেছে, এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে ৮০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বিনিয়োগ লাগবে।

বাড়তি তো দুরের কথা, সরকারের পক্ষে ঘোষিত লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব নয়। সুতরাং আমরা মনে করি বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে ব্যক্তিখাতকেই বিনিয়োগে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে সরকারি বিনিয়োগ প্রায়শই অদক্ষতাদোষে দুষ্ট হয়। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে যারা বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা করেন তাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থাকে না।

বাংলাদেশে সরকারি বিনিয়োগের গুনগত মান সম্পর্কে বড় রকমের প্রশ্ন রয়েছে। সময়মত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি প্রকল্পের গুনগত মানকে ভয়াবহ ভাবে অবনত করে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, ২০০৬ সালে সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকায় নির্ধারিত পদ্মা সেতুর ব্যয় এখন ২৮ হাজার কোটি টাকার উপরে বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা মহানগরীতে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার এর প্রারম্ভিক প্রকল্প ব্যয় ৩৪৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বশেষ ১২১৮ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। কয়েকটি চার লেন উন্নীতকরণ প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

তাছাড়া বাংলাদেশে ফ্লাইওভার ও মহাসড়কের কি.মি. প্রতি নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

৩১ মে ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতের কলকাতায় নির্মিত পরমা ফ্লাইওভার নির্মাণে কি.মি. প্রতি খরচ ৪৮ কোটি টাকা, মালায়েশিয়া ও চীনে কি.মি. প্রতি খরচ ৮০-৯০ কোটি টাকা, অথচ বাংলাদেশে ঢাকা ফ্লাইওভারে কি.মি. প্রতি খরচ ৩১৬ কোটি টাকা, মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভারে কি.মি. প্রতি খরচ ১৩৫ কোটি টাকা, ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে কি.মি. প্রতি খরচ ১৮০ কোটি টাকা।

দৈনিক বনিক বার্তার ৬ অক্টোবর ২০১৫ সনের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ৩৫ লক্ষ ডলার বা ২৮ কোটি টাকা। আর দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে কি.মি. প্রতি ব্যয় হয় ২০ লক্ষ ডলার বা ২০ কোটি টাকা।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কি.মি. প্রতি ব্যয় হবে ২২ লক্ষ ডলার বা ১৭ কোটি টাকা।

আর দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেন করতে এই ব্যয়ের পরিমাণ ১৪.৫ লক্ষ ডলার বা বাংলাদেশের মুদ্রায় ১১ কোটি টাকা। ৪০টি দেশের নির্মাণ ব্যয় এর ভিত্তিতে ইকোনোমেট্রিক মডেল প্রয়োগ করে গড় ব্যয় নির্ণয় করা হয়।

‘দ্য কস্ট অব রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন লো অ্যান্ড মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেন অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক।

প্রতিবেশি দেশ ভারতে প্রকাশিত এক সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কি.মি. প্রতি ব্যয় বাংলাদেশের মুদ্রায় ৯.৫ থেকে ১০.৫ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

চীনে এই খরচ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা। অপরদিকে বাংলাদেশে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের জন্য রংপুর-হাটিকুমরুল অংশে কি.মি. প্রতি ব্যয় পড়ছে ৫২ কোটি ৭ লক্ষ টাকা, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরনে কি.মি. প্রতি ব্যয় পড়ছে ৫৬ কোটি ৪ লক্ষ টাকা, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরনে কি.মি. প্রতি খরচ পড়ছে ৯৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণে বিশ্বে সবচেয়ে ব্যায়বহুল দেশ এখন বাংলাদেশ।

অথচ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয় ৫-৬ কোটি টাকা।

ফলে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ১০-১২ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। জনগণের দেওয়া করের অর্থের সদ্ব্যবহার হচ্ছে কি না এই প্রশ্ন আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে উত্থাপন করতে পারি। এই প্রসঙ্গে বাজেটে ব্যয়ের গুন-মানের প্রশ্নটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজার উন্নয়নের জন্য ১৩১২১ কোটি টাকা এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক এর মূলধন ঘাটতি পূরণে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দের সমালোচনা করেছে সিপিডি।

সংস্থাটি বলছে, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ১৩১২১ কোটি টাকা এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ আর্থিক খাতের এ দুটি ক্ষেত্রই খুবই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সেখানে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া সৎ করদাতাদের অর্থ দেওয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না।

বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের দুর্বলতা সুবিদিত। পুঁজিবাজার থেকে এই সরকারের আমলে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে। এর জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি। পুঁজিবাজারে সর্বস্ব হারিয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার জন্যই এই লুণ্ঠন সম্ভব হয়েছে। একইভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ফোকলা হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকগুলো পুঁজিঘাটতিতে পড়ে নিদারুণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এই ব্যাংকগুলোর পুঁজিঘাটতি পূরণের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং অতীতেও একই কারণে বড় অঙ্কের বরাদ্দ করদাতাদেরই অর্থে বহন করা হবে। কার্যত এই বরাদ্দ সৎ করদাতাদের ওপর জরিমানা আরোপ করে লুটেরাদের প্রশ্রয় দেবার শামিল।

বাজেটে কোন খাত কি রকম প্রাধান্য পায় সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাজেট প্রণীত হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। অনেক সময় মন্ত্রণালয়ে চিহ্নিত অগ্রাধিকারে জনগণেরর অগ্রাধিকারের সঠিক প্রতিফলন ঘটে না। এটা সামাজিক চয়নের সমস্যা।

সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ না থাকলে, সংসদে সুষ্ঠু বিতর্ক না হলে, জনসমাজের মতামত বিবেচনায় না নিলে, গণমাধ্যমে প্রতিফলিত মতামত বিবেচনায় না নিলে, সমাজের বিভিন্ন স্বার্থ গোষ্ঠীর চাওয়া পাওয়া কে গুরুত্ব না দিলে এবং জনমত জরিপের ব্যবস্থা না থাকলে সঠিক সামাজিক চয়ন সম্ভব হয় না।

অর্থমন্ত্রী বাজেট রচনার স্তরে কিছু কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। কিন্তু সেসব গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বাজেট পেশের পর বলা হয়েছে তাদের পরামর্শ বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে সর্বোচ্চ (১৪.৭%) বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরে শিক্ষা খাত পিছিয়ে ছিল।

আগামী অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে একত্র করে বরাদ্দ দেবার ফলে বোঝা যাচ্ছে না শিক্ষা খাতে নিট বরাদ্দ কত এবং প্রযুক্তি খাতে নিট বরাদ্দ কত। এর মধ্যে শুভঙ্করের কোনো ফাঁক রয়েছে কি না সেটাই প্রশ্ন। সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান নিয়ে বড় রকমের উদ্বেগ রয়েছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে দলীয়করণ ও দুর্নীতির ফলে এবং দেশের উপযোগী পাঠ্যক্রম না থাকার ফলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কার ব্যতীত শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। কিন্তু সংস্কারের জন্যও অর্থ সম্পদের প্রয়োজন।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির আড়াই শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়েছে। এটি গত বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু এরপরও এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম।

স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বাজেটের ৪.৭% যা অগ্রাধিকার তালিকায় ১১তম এবং জিডিপির ১ শতাংশের কম। এমনিতেই স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যয় দুনিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অতি নিচু স্তরে। স্বাস্থ্য খাত অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে সুবিচার পায়নি।

কৃষি খাত জাতীয় অর্থনীতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এই খাতে জড়িত। বরাদ্দের বিচারে কৃষি খাত অবস্থান করছে ১৩তম স্থানে।

কৃষকের বড় অবদান দেশকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। শস্য খাত ছাড়াও কৃষির অন্যান্য সহখাতেরও যথেষ্ট বিকাশ হয়েছে। কিন্তু কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। কৃষককে এক কেজি গরুর গোস্তের দামে এক মন ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য পণ্য বাজারজাতকরণে কৃষকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ সম্বলিত প্রতিষ্ঠান দরকার। এরকম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কৃষি খাতে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

বাজেট বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজেট ঘাটতিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতির অর্থ যোগানের জন্য ঋণের আশ্রয় নিতে হয়। ঋণের জন্য সুদও দিতে হয়। সুদ পরিশোধের জন্য প্রাস্তাবিত বাজেটে ১১.৭% অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর ফলে অন্যান্য খাতের উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া ঘাটতি অর্থায়ন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এর সার্বিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বারদ্দকৃত ৯৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রথম দশ মাসে ৫০.১৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। এরকম অদক্ষ বাস্তবায়নের ধারায় অর্থবছরের শেষ ২ মাসে অবশিষ্ট অর্থ ব্যবহার হবে অপচয় ও অপব্যবহারের শামিল। এডিপির গুনগত মান হবে দারুন প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী গেল দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে।

অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছেন। প্রতি বছর বেকার হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ। সেই হিসাবে দুই বছরে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ লাখ। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় ব্যাপক কর্মহীন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট কোন কৌশল উল্লেখ করা হয়নি।

তবে তিনি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলতে চেয়েছেন শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সুযোগ ব্যবহার করা সম্ভব।

তিনি কারিগরি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেছেন। এটা সাপ্লাই সাইড বিষয়ক পদক্ষেপ। এর পাশাপাশি প্রয়োজন ডিমান্ড সাইডগত পদক্ষেপ যা সম্ভব হবে গুনগত মানসম্পন্ন এবং শ্রম-চাহিদা সৃষ্টিকারী বিনিয়োগের মাধ্যমে।

এক্ষেত্রে বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুর্বলতা কারো অজানা নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও এর প্রকাশিত জানুয়ারি-২০১৬র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বিদায়ী বছরেও (২০১৫) আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের হার কমেছে। চলতি বছরেও কমবে। এতে বলা হয়েছে চলতি বছর বাংলাদেশে কর্মসংস্থান কমবে ৪ দশমিক ২ শতাংশ হারে।

এ ছাড়া ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কমবে ৪ শতাংশ হারে। এতে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। আইএলও এর এই প্রক্ষেপণের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর দাবিকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির অঙ্ক মেলানো যাচ্ছে না।

রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প মালিকরা ০.৬ শতাংশ উৎস করের স্থলে ১.৫ শতাংশ হারে উৎস কর আরোপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তারা মনে করেন, এর ফলে ৩ শতাংশ হারে তারা যে মুনাফা করেন তার অর্ধেকটাই সরকার উৎস কর হিসেবে গ্রাস করবে। তারা আরো মনে করেন উৎস কর বাড়ানোর ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সামগ্রিকভাবে রপ্তানিমুখী পোশাক খাত প্রতিযোগিতার শক্তি হারাবে। বিএনপি পোশাক শিল্প মালিকদের উদ্বেগের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করে।

আমরা আশা করি অর্থমন্ত্রী পুরো বিষয়টিকে স্বচ্ছ করে তোলার জন্য উৎস করের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেবেন। পোশাক শিল্প দেশের প্রধান কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। এই খাতের কোনোরূপ ক্ষতি হলে কর্মসংস্থানের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং দারিদ্র্য প্রকট করে তুলবে।

উল্লেখ্য যে অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের উপরও উৎস কর প্রযোজ্য হবে। তাই পুরো বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনার দাবি রাখে।

অর্থমন্ত্রী মোবাইল ফোন সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সন্তোষজনক মাত্রায় রাজস্ব আদায় করতে না পারার অজুহাতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কথা বলার ওপর বর্তমান ১৫% ভ্যাট এর অতিরিক্ত ১% সারচার্জ ও ৫% সম্পুরক কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন।

এতে ১০০ টাকার কথা বললে গ্রাহককে ২১ টাকা কর দিতে হবে। হাসপাতালে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্র এবং ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রামে ব্যবহ্রত কাগজ এর ওপর কর প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবাকে আরও ব্যয়বহুল করবে। আমরা মনে করি এসব ক্ষেত্রে কর প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেটে কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ ও কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট পণ্যে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

কম্পিউটার, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, প্রিন্টার, স্ক্যানার, টোনার, কার্ট্রিজ, হার্ডডিস্ক, মডেম, ইউপিএস, আইপিএস, মোবাইল সিমসহ তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তির প্রতি যুবসমাজের যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে এই কর আরোপের ফলে তাতে ভাটা পড়বে। প্রযুক্তি অঙ্গনে দেশের এগিয়ে যাওয়া কে ব্যাহত করবে। এই কর প্রত্যাহার করতে হবে।

আমরা মনে করি, একটি সুষ্ঠু এবং সকল দলের অংশগ্রহণমুলক নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয় তেমন একটি সংসদের পক্ষেই সত্যিকারের দেশপ্রেম ও জনকল্যাণমুখী বাজেট অনুমোদন করা সম্ভব। বর্তমান সংসদের সেরকম চরিত্র নেই।

আমরা আশা করব দেশে সত্যিকার জনপ্রতিনিধিত্ব মুলক সংসদ গঠিত হবে। এর জন্য একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন।

এছাড়া সরকার গুপ্ত হত্যা নিয়ন্ত্রন ও ঘটনার রহস্য উন্মোচনে ব্যর্থ হয়ে বিরোধি দলকে দায়ী করছে। সরকার বিরোধী দলকে দায়ী করে দেশের মাটিতে জঙ্গিবাদের আশ্রয়-পশ্রয় দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি আরো বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে মানুষকে অতিরিক্ত