সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধির তোয়াক্কা করছেন না সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা। সরকারি সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা।
নির্বাচন কমিশনও সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের বিধিবহির্ভূত কাজের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এ ব্যাপারে ইসি নীরব। প্রতিকার না করে উপরন্তু সায় দিচ্ছে সরকার সমর্থিতদের।
অন্য দিকে সরকারবিরোধী প্রার্থীদের ওপর চলছে নির্যাতনের খড়গ। প্রথমে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হুমকি দিচ্ছে সরকারদলীয় ক্যাডাররা। এতে কাজ না হলে বিভিন্ন মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। আর এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করছে পুলিশ।
পাশাপাশি নীরব নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ গত মঙ্গলবার বলেছেন, নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে কারো বিরুদ্ধে মামলা কিংবা ওয়ারেন্ট থাকলে ওই ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতারে ইসির অনুমতি লাগবে না।
এর মাত্র এক দিন পরই নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকেও এক প্রার্থীকে আটকের ঘটনা ঘটে। যে মামলায় পুলিশ আটক করছে ওই মামলা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না বলে ওই প্রার্থী জানান। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন বিশ্লেষকেরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মতাসীন দল সমর্থিত মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরতি মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীরা আচরণবিধির তোয়াক্কা করছেন না। সর্বত্র বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।
নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মাঠে নেমেছেন মন্ত্রী-এমপিরা। সরকার সমর্থিত উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রার্থী আনিসুল হক প্রতিদিনই মন্ত্রী-এমপিদের সাথে নিয়ে সভা-সমাবেশ করছেন। গণমাধ্যমগুলোতে খবরগুলো প্রকাশিত হলেও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না ইসি।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রার্থী সাঈদ খোকনের সাথে সবসময় দু’জন এমপি থাকছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে প্রচার প্রচারণাও চালাচ্ছেন তারা। কিন্তু বিষয়টি নজরে এলেও না দেখার ভান করছে ইসি। একই অবস্থা চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনেও। মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী বৈঠক বা প্রচার-প্রচারণাসংক্রান্ত কাজে অংশ নেয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ থাকলেও তা উপেক্ষা করে নির্বাচনী বৈঠকে অংশ নিয়েছেন এক মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা।
গতকাল সন্ধ্যার পরে নির্বাচনী সমাবেশ করেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। যাত্রাবাড়ীর ৫১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হাবুকে সরকারদলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এ জন্য তা’মিরুল মিল্লাত মাদরাসার মধ্যে বিশাল প্যান্ডেল প্রস্তুত করা হয়।
অথচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে ‘সরকারের কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাদের সমপদমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোনো ব্যক্তি, নির্বাচনপূর্ব সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না’ এবং ‘নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কেহ নির্বাচনী কাজে সরকারি প্রচারযন্ত্র, সরকারি যানবাহন, অন্য কোনো সুযোগ সুবিধা ভোগ এবং সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ব্যবহার করিতে পারিবেন না।’
নির্বাচন কমিশনের এ আচরণবিধি এখন কাগজেই সীমাবদ্ধ। সর্বত্র আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব চললেও এসবের প্রতিকার না করে উল্টো নীরব ইসি। ইসির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকেরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সাথে মন্ত্রীর সভা-সমাবেশ আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর পরেও নির্বাচন কমিশনের নীরবতা গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন চলতে থাকলে ভোটের দিন ইসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না। তাই এখনই সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানকে নিরপে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কঠোর পদপে নিতে হবে।
ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ বলেন, তফসিল ঘোষণার পর সরকারি সুবিধাভোগীদের এমন প্রচারণা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশনের উচিত এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া। শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ইসিকে আরো শক্তিশালী হতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যেখানে-সেখানে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইন অনুযায়ী মন্ত্রীরা নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করতে পারেন না। করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে কমিশন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, নির্বাচনী এলাকায় সার্বণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে। কোথাও বিধি ভঙ্গ করে নির্বাচনী প্রচারে নামলে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবে। নয়াদিগন্ত।
ইআর





