দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার্তদের মধ্যে বিএনপির ত্রাণ বিরতরণ কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় লোকেজন বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি।

আজ রোববার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং জাতীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল নোমান।

বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘দেশের উত্তরাঞ্চলসহ ২৭টি জেলা বন্যায় ভাসছে, সীমাহীন কষ্টে নিপতিত বানভাসীরা। এর আগে বাংলাদেশে বন্যার মতো এতবড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেনি। একদিকে খাদ্য সংকট অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্র্রগুলোতে বানভাসী মানুষের উপচে পড়া ভিড়ের দৃশ্য সত্যি হৃদয়বিদারক।

আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে কোনো রকমে স্থান করে নিয়েছে অসহায় নিরন্ন বন্যার্ত মানুষ। বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এখনো প্রকৃত বানভাসীরা ত্রাণ পাচ্ছে না, চারদিকে ক্ষধার্ত মানুষের হাহাকার। দুমুঠো ভাতের জন্য কাঁদছে মানুষ।’

বন্যাদুর্গত জামালপুর, শেরপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে সেখানকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন বলেও জানান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, ‘বন্যা দুর্গতরা পানি সাঁতরিয়ে কীভাবে খাবারের জন্য আসে, সেই দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসছে। অথচ বিএনপির ত্রাণ কার্যক্রমেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় লোকেরা বাধার সৃষ্টি করছে।’

চলমান বন্যা পরিস্থিতিকে মহাদুর্যোগ আখ্যা দিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেন, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই।

তিনি বলেন, ‘তাঁদের একটিই মাথাব্যথা-সেটি হলো কীভাবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান তথা জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে, কুৎসা রটিয়ে, সর্বোপরি বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বানোয়াট, ভুয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করার মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও কারান্তরীণ করে বিএনপিকে ধ্বংস করা যায়।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা ব্যস্ত। তিনি বলেন, ‘এসব কারণেই জনগণের দুঃখ দুর্দশা নিয়ে ভাববার সময় তাঁদের নেই। বর্তমান সরকার যেহেতু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নয় বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাই জনগণের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক।’

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘জাতিসংঘ বন্যাদুর্গতদের দুঃখ-দুর্দশা ও দেশের খাদ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা লাগামহীনভাবে মিথ্যাচার করে বলছেন দেশে কোনো খাদ্য ঘাটতি নেই। আগামী বোরো মৌসুমে ধানবীজ ক্রয়ে অপারগতার দুঃশ্চিন্তায় প্রহর গুনছে বানভাসীরা।’

বানভাসী মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য বোরো মওসুমের আগেই সুদবিহীন কৃষিঋণ প্রদানের যথাযথ উদ্যোগ না নিলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বিএনপির জাতীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্যরা লক্ষ করেছে যে, দুর্গত এলাকাগুলোতে সরকারি কোনো ত্রাণ তৎপরতা নেই। বানভাসী মানুষরা বিএনপির টিমকে অভিযোগ করেছে যে, সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সামান্য ত্রাণটুকুও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ভাগবাটোয়ারা করছে।’

নোমান বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেরীতে হলেও ত্রাণ দিতে গিয়ে নৌকায় ভোট চাচ্ছেন, মানুষ বন্যায় ভাসছে ত্রাণ পাচ্ছে না, অথচ প্রধানমন্ত্রী নৌকায় ভোট চাইতে ব্যস্ত।’

এ সময় সরকারের উদ্দেশে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-নিরপেক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি পুনর্বাসন, কৃষকদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়া, গৃহহারা মানুষদের জন্য দ্রুত গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা, মানুষ ও পশুর খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষকদের ধানের চারা বিনামূল্যে বিতরণ, গবাদীপশু কেনার জন্য আর্থিক অনুদান, ভিজিএফ কার্ড চালু করে প্রকৃত বানভাসীদের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট সংস্কার, ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মেরামত করে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, বিশুদ্ধ পানির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক নলকূপ স্থাপনসহ জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিএনপি এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার নির্দেশে বন্যাকবলিত এলাকার প্রকৃত বানভাসীদের বিধ্বস্ত কাঁচা ঘরবাড়ি নির্মাণ ও ধানবীজ কেনার জন্য সীমিত সাধ্য দিয়ে আর্থিক অনুদান দেওয়ার প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। আগামীকাল সোমবার থেকেই এই কাজ শুরু হবে।

আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘জনগণের দল হিসেবে বিএনপি সবসময় সুখে দুঃখে জনগণের পাশে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বর্তমানে বন্যাদুর্গত এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় যথাসাধ্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’

এ সময় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আরো বেশি করে নিজ নিজ সাধ্য মতো ত্রাণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।

আদর