কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী একের পর এক গুম হওয়ার পর এবার নিজেই গুম হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করলেন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী, ২০ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিশ্ব গুম দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে গুমের শিকার পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গুম হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাও জানি না কতদিন এভাবে বেঁচে থাকতে পারবো। আমাদেরও মেরে ফেলা হবে না তা আমরা বলতে পারি না।
তিনি বলেন, আজকে এই সরকারের কাছে গুমের শিকার পরিবারের স্বজনরা সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। কিন্তু আমি জানি এই অবৈধ সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করবে না। সেজন্য আমরা জাতিসংঘের অধীনে সকল গুম খুনের আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করছি।
রোববার সন্ধ্যায় চেয়ারপারসনে গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া বলেন, দেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস পালন হয়। কিন্তু আমি জানতে চাই, কেন এই অবৈধ সরকার আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবস পালন করলো না? কারণ তারা এসব গুমের সঙ্গে জড়িত। সরকারে আদেশ নির্দেশ ছাড়া কেউ এটা করতে পারে না।
তিনি বলেন, দেশে আজ গণতন্ত্র নেই, কারো কোন মৌলিক অধিকার নেই। কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার নেই। শুধুমাত্র অধিকার যারা ক্ষমতায় আছে তাদের রয়েছে। তারা বড় গলায় মিথ্যা কথা বলতে পারে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এই অবৈধ সরকারকেও আমরা সজাগ করতে চাই। যারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তি চাই। বাংলাদেশে আগে কখনও গুমের ঘটনা ঘটেনি। এটা আওয়ামী লীগের সময় শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে মেধাবী ছেলেরা নেতৃত্ব দিতে না পারে এজন্যই তাদেরকে ধরে ধরে গুম করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আজকে খবরের কাগজ খুললেই খুন, গুম ও নারী নির্যাতন। এর সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ জড়িত। লীগ ওয়ালারা এসব কাজে ব্যস্ত। আমরা কোন দেশে বাস করছি?
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা বানোয়াট মামলা দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করা হচ্ছে। তারা বলছে, বিএনপির লোকেরা পেট্রলবোমা মেরেছে, বাসে আগুন দিয়েছে, মানুষ হত্যা করেছে। কিন্তু কারা এসব করেছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এসব করেছে সরকারের লোকেরা। আমাদের আন্দোলন বন্ধ করার জন্য, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা পেট্রলবোমা মেরেছে, গাড়িতে আগুন দিয়েছে, মানুষকে হত্যা করেছে। পুলিশতো নিজেরাই এসব স্বীকার করেছে, বলেছে।
পুলিশ বলেছে, সরকারের নির্দেশে তারা বিরোধীদলের আন্দোলনকে বানচাল করতে গাড়িতে আগুন দিয়েছে, পেট্রলবোমা মেরেছে।পেট্রলবোমাসহ আলীগের লোক ধরা খেয়েছে তাদের বিচার হয়নি। তারা ভালো আছে। বিএনপির লোকজন অপরাধ না করলেও কোন জিনিস তারা করতে পারবেন না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশকে আজকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে এই অবৈধ আ. লীগ সরকার। তারা দেশের ইমেজ নষ্ট করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, জোর করে হলেও এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় বসে আছে। আজকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা সরকারে কাছে তদন্ত দাবি করেছেন। কিন্তু আমি জানি, এই অবৈধ সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করবে না। সেজন্য আমরা জাতিসংঘের অধীনে বাংলাদেশের সকল গুমের তদন্ত দাবি করছি।
তিনি স্বজনহারাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আজকে আপনাদেরকে শান্তনা দেয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। যদি সুযোগ আসে অবশ্যই এর বিচার একদিন না একদিন হবে।
উল্লেখ্য, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৩৬ জনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জনের লাশ পাওয়া গেছে। জীবিত ফিরে এসেছে দুজন। বাকি ২৮ জন নিখোঁজ আছে। এ সংস্থার তথ্যমতে, গত বছর নিখোঁজ হয়েছিল ১০২ জন, যাদের ৮৮ জন এখনো নিখোঁজ।
২০১৩ সালে ৫৮ জনের মধ্যে ৫৩ জন নিখোঁজ ছিল। ২০১২ সালে ৫৬ জনের মধ্যে ৩৪ জন; ২০১১ সালে ৫৯ জনের মধ্যে ৩৯ জন এবং ২০১০ সালে ৪৬ জন অপহৃতের মধ্যে ৩৩ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ২১ জন নিখোঁজ হয়, যাদের ১৮ জনের খোঁজ মেলেনি। এই হিসাবে, গত আট বছর সাত মাসে ৩৭৮ জন ব্যক্তিকে গুমের অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে ২৯৩ জনই নিখোঁজ রয়েছে।
এমএইচ/ এআর





