বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল এখন ‘মৃত’ । বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল এখন ‘মৃত’ । দেশের ফুটবলে শক্তিশালী একটা ভূমিকম্প নীরবে আঘাত হেনেছে গতরাতে। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের সব ফুটবল মাঠ, ছোট বড় সব ক্লাব, ঢাকায় ফেডারেশন ভবন—সবই যেন এখন বিধ্বস্ত এক জনপদ।
ভুটান ম্যাচ সবই লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। আগের ১১ সাক্ষাতে ভুটান কখনো মাথাই তুলতে পারেনি। জানবাজি লড়ে তিনটি ম্যাচ করেছিল ড্র। বাকি আটটিতেই হার। ২৭ গোল খেয়ে নিজেরা করেছে মাত্র ৪টি। সেই ভুটানই নিজেদের মাঠে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ফিরতি প্লে-অফে গতরাতে বাংলাদেশের জালে তিনবার বল পাঠিয়েছে। একেকটি গোল শেল হয়ে বিঁধেছে বাংলাদেশের বুকে। ৩-১ গোলে জয় তুলে ভুটানি ফুটবলাররা বাংলাদেশের ফুটবলের শরীর থেকে খুলে নিয়েছে শেষ কাপড়টাও।
নগদ ক্ষতি, ২০১৯ এশিয়ান কাপের মূল বাছাইপর্ব খেলা হবে না বাংলাদেশের। ড্র করতে পারলেও সেই সুযোগ ছিল। ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাই শেষ আগেই। তাই আগামী বছর তিনেক আর ফিফা-এএফসির ম্যাচ মিলবে না। এ কারণেই এই হারের কষ্টটা এত বেশি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের খেরোখাতা দেখলে এটিকে হঠাৎ কোনো দুর্বিপাক বলে মনে হবে না। এটিই যেন হওয়ার কথা ছিল। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আট ম্যাচে ৩২ গোল হজম, জর্ডান গিয়ে আট গোল খাওয়া, আফগানিস্তানের কাছে সাফে চার গোল, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তাজিকদের মাঠে পাঁচ গোল, কদিন আগে মালদ্বীপের কাছেও মালেতে একই ব্যবধানে লজ্জার হার, সর্বশেষ তিনটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপ থেকেই বিদায়; ব্যর্থতার ধারাবাহিকতাই ভুটান বিপর্যয়ের পথে টেনে নিয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলকে।
মামুনুলরা হারের সঙ্গে এমনই মিতালি পাতিয়েছেন যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ১৮৫তম স্থানে নামতে হয়েছে! ফুটবলারদের মেধাশূন্যতাই এমন অধঃপতন ডেকে এনেছে। অনেক ফুটবলারই নানা ধরনের বদাভ্যাসে আসক্ত। বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপে ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটিই এটি বলেছে। ভুটান সফরে শৃঙ্খলা ছিল দলে, তর্কের খাতিরে ধরে নিলেও তিন গোল খাওয়ার ব্যাখ্যাটা কী?
কোচ টম সেন্টফিট বলেছেন, তাঁর কথা নাকি শোনেনি ফুটবলাররা। লোডভিক ডি ক্রুইফ তোতাপাখির মতো বলতেন, তাঁর শেখানো মন্ত্র খেলোয়াড়েরা ভুলে যায় মাঠে। ওঁদের ফিটনেস ঘাটতি চরমে। কোচের অনুশীলনের বাইরে ব্যক্তিগত অনুশীলন, নিজেকে উন্নত করার কোনো চেষ্টা নেই। শেখ আসলামরা একা একা কত অনুশীলন করতেন! আর এই প্রজন্ম ফেসবুকে পড়ে থাকে সারাক্ষণ। এসএ গেমসে ব্রোঞ্জ জিতে, মেডেলে কামড় দিয়ে এঁরা সেলফি তুলে ফেসবুকে দিয়ে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এটার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি!’ অথচ এই অঞ্চলে চ্যাম্পিয়ন হওয়াই বাংলাদেশের কাছে শেষ কথা। এই ফুটবলাররা ক্লাব থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পান বাজে খেলেও। কোনো জবাবদিহি করতে হয় না তাঁদের। অনেকের মতে, এ কারণেই ভালো খেলার আগ্রহটাই মরে গেছে বাংলাদেশের ফুটবলারদের।
কাজী সালাউদ্দিন এসব দেখে অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘আমি তো নিজে খেলে দিতে পারব না। আমি যা করার সব করেছি এই দলের জন্য।’ হ্যাঁ, করেছেন। পোশাক পাল্টানোর মতো ফুটবলারদের জন্য কোচ পাল্টেছেন। দুই লাখ টাকার কোচকে মাসে দিয়েছেন দশ লাখ টাকা। ট্রেনার, ফিজিও, গোলরক্ষক কোচ—কোনোটাই আনতে বাদ রাখেননি। অন্তত জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের ব্যাপারে কার্পণ্য দেখাননি সালাউদ্দিন। কিন্তু জাতীয় দল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা কি তিনি করেছেন? করেননি।
ভুটানের কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা আছে। নতুন খেলোয়াড় তৈরির আশায় ভুটান গোটা দু-এক একাডেমি করেছে বেশ আগেই। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসে একটা একাডেমি চালু করেও এক বছরের মধ্যে রণে ভঙ্গ দিয়েছে! এখানেই দুই দেশে বড় পার্থক্য। ভুটানের একাডেমির ফসল একজন চেনচো। ৭ নম্বর জার্সিধারী এই ফরোয়ার্ড থাইল্যান্ড লিগে খেলেছেন। সোমবারের ‘কালরাতে’ দুই গোল করে একাই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের হন্তারক। দুর্ভাগ্য, একজন চেনচো নেই বাংলাদেশের। ভুটানের অধিনায়ক বিমান চালনা শেষে বাকি সময়ে ফুটবল খেলেন। আর আমাদের মামুনুলরা ৬০ লাখ টাকা ক্লাব থেকে পেয়েও জিততে পারেন না। তাঁরা জাতীয় দলের অনুশীলন বাদ দিয়ে একটি সার্ভিসেস দলের ম্যাচ খেলতে যান। নতুন খেলোয়াড় নেই বলে তাঁদের ওপর ভরসা করতে হয় বারবার।
নতুন খেলোয়াড় তৈরির কর্মসূচি না নেওয়ার ব্যাপারে সালাউদ্দিনের যুক্তি, ‘খেলোয়াড় তৈরি আমার কাজ নয়। ওটা ক্লাব করবে। সারা বিশ্বেই ক্লাব করে।’ খুবই সত্যি কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্লাব হাত–পা গুটিয়ে থাকে। সালাউদ্দিন ক্লাবকে বাধ্য করতে পারেনি, এটা তাঁর বড় ব্যর্থতা। উল্টো ক্লাবের কাছে ফেডারেশন মাথা নত করে আছে আজও।
ক্লাবগুলোর জন্য যুব টুর্নামেন্ট বাধ্যতামূলক করেও শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়েছে ফেডারেশন! দুটি টুর্নামেন্ট করা হলেও খেলেনি লিগ চ্যাম্পিয়ন শেখ জামাল ধানমন্ডি। বাইলজে ক্লাবকে শাস্তি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ফেডারেশন তা দেওয়ার সাহস পর্যন্ত দেখাতে পারেনি। বছর দু-এক ধরে তো টুর্নামেন্টটাই বন্ধ। বাফুফের বর্ষপঞ্জিতে এখন আর ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের ঠাঁই মেলে না, এমনকি এটি নিয়ে নেই কোনো আলোচনাও।
অনূর্ধ্ব-১৪ বিমান কাপ, অনূর্ধ্ব-১৪ জেএফএ কাপ, এসব কোথায় হারাল! জেএফএ কাপের জন্য জাপান ফুটবল ফেডারেশনের দেওয়া আর্থিক অনুদান খরচ হয়েছে অন্য খাতে। তাই ওই টুর্নামেন্ট এখন বাতিলের খাতায়। স্কুল ফুটবল নিয়ে আক্ষেপ শুধুই বাড়ছে। সালাউদ্দিন যুগে পাঁচ বছর আগে স্কুল ফুটবল একবার হয়েই শেষ। গত এপ্রিলে ফেডারেশনের নির্বাচনের আগে শেরেবাংলা কাপ ও অনূর্ধ্ব-১৯ সোহরাওয়ার্দী কাপ আয়োজনের তোড়জোড় দেখা যাচ্ছিল। নির্বাচনের ছয় মাস পেরিয়েও সেটার আর খবর নেই।
সুপার কাপ তিনবার করেই শেষ। দুবার অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপও সম্ভবত আর হবে না। শেখ কামাল টুর্নামেন্টও একবার হয়ে হিমাগারে ঢোকার সব আয়োজন সারা! বাফুফের হাতে এখন শুধু প্রিমিয়ার লিগ আর মেয়েদের ফুটবল।
ভুটান বিপর্যয় তাই একদিক থেকে বড় উপকারই করেছে দেশের ফুটবলের। এই ‘মৃত’ জাতীয় দল নিয়ে টানাটানি এবার বন্ধ হবে। এই দলের জন্য ঘরোয়া লিগ বন্ধ থাকে দিনের পর দিন। সব টাকা চলে যায় বিদেশি কোচদের বেতনে। যে কারণে দুই মাস ধরে বন্ধ স্থানীয়দের বেতন। ভুটান শিক্ষা মাথা পেতে এবার যদি কর্তারা টাকার সঠিক ব্যবহার করে তৃণমূলে নজর দেন। নতুন খেলোয়াড় তুলে এনে যদি নতুনভাবে শুরু করেন ফুটবলের পথচলা, সেই বরং ভালো!
এসএ





