বাংলাদেশ দলের ক্রিকেট যেমন এখন গর্বের বিষয়, এ দেশের বোলারদের পারফরম্যান্সও গর্বের বিষয়। বল হাতে একের পর এক বোলার আলো ছড়াচ্ছেন। দেশের জয়ে রাখছেন ব্ড় অবদান। কিন্তু আমাদের অনেকেরই অজানা তাদের আজকের ক্রিকেটার হওয়ার গল্প। জেনে নেয়া যাক, কয়েকজন বোলারের উঠে আসার গল্প।
মুস্তাফিজুর রহমান:
বাংলাদেশের বোলারের সর্বশেষ আশ্চর্য আবিষ্কার মুস্তাফিজুর রহমান। যার কাছে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটিং লাইনখ্যাত ভারতের ব্যাটসম্যানরা নাজেহাল। এই মুস্তাফিজ উঠে এসেছেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে। বাবা আবুল কাশেম গাজী, মা মাহমুদা খাতুন। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মুস্তাফিজ। ছোটবেলা থেকেই বাঁহাতি তিনি।
তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে সাতক্ষীরা শহরের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। প্রায় প্রতিদিনই এতটা পথ পাড়ি দিয়ে প্র্যাকটিসে যেতেন মুস্তাফিজ। বড় ভাই মোখলেসুর, স্থানীয় কোচ আলতাফ ও জেলা কোচ তপু ভাইয়ের নিয়মিত পরিচর্যায় মুস্তাফিজ শাণিয়ে নিতে থাকেন নিজের ধার।
বড় ভাই মোখলেসুরের হাত ধরেই প্রথম খেলার মাঠে আসা। পড়াশোনায় অতটা মন তার কখনোই ছিল না। বাসায় তো বলেই দিয়েছিলেন, আমার দ্বারা ওসব হবে না। তোমরা আর জোর কর না। এরপর থেকে ক্রিকেটই তার ধ্যানজ্ঞান। বড়েয়া মিলনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট প্র্যাকটিস করতেন মুস্তাফিজ। তার তত্ত্বাবধান করতেন স্থানীয় কোচ আলতাফ। আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ভেতরের ‘ধারটা’। হিরে চিনে নিয়ে ঘষামাজার কাজটি তিনি শুরু করে দেন। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরার জেলা কোচ মুফাস্সিনুল ইসলাম। এলাকায় অবশ্য ‘তপু ভাই’ বলে পরিচিত তিনি।
জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশি দিন তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার। বছর তিনেক আগে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। গত বছর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও আলো ছড়িয়েছিলেন এই পেসার। পেয়েছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নয় উইকেট।
গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। রীতিমতো চমক ছিলেন তিনি। মুস্তাফিজ প্রথম শ্রেণিতে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। এই তো ছয় মাস আগে অভিষেক হয়েছে ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খুলনার হয়ে মাত্র আট ম্যাচ খেলেই পেয়েছেন ২৩ উইকেট। গড় ১৮.৯১, ইকোনমিক রেট ২.৬৮। আর লিস্ট এ-তে আবাহনীর পক্ষে ৫ ম্যাচে উইকেট ১২টি। গড় মাত্র ১১.৭৫, ইকোনমিক রেট ৩.৪৫।
আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিষেকে তো রীতিমতো কাপন ধরিয়ে দিলেন পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের। প্রথম ২ ওভারে দিয়েছিলেন মাত্র ৪ রান। পুরো স্পেল শেষে ২০ রান খরচ করে নিয়েছেন দুটি উইকেট। আর ওয়ানডেতে ভারতকে একাই তুলোধুনো করে দিলেন।
তাইজুল ইসলাম:
নাটোরের ছেলে তাইজুল ইসলামের ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় এলাকার কোচ মতিন চৌধুরী পেয়ারের কাছে। শুরুতে তিনি ছিলেন পেসার। কিন্তু পরবর্তীতে নাটোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মরহুম মঞ্জুর তাকে স্পিনার হওয়ার পরামর্শ দেন। অনূর্ধ্ব ১৩ দলের হয়ে খেলার সময় তার পেস বোলিং দেখে মরহুম মঞ্জু তাকে স্পিন বোলিং করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই তাইজুল স্পিনার হয়ে যান।
জাতীয় দলে খেলতে এসেই তাইজুল সবার মন জয় করে নিলেও এ পর্যায়ে উঠে আসতে তাকে কিন্তু দিতে হয়েছে বন্ধুর পথ পাড়ি। শুরুটা জাতীয় লিগ দিয়ে। তাকে স্পিনার হওয়ার ক্ষেত্রে যদি মরহুম মঞ্জুর অবদান থাকে, তাহলে তাকে বিকশিত করার পিছনে অবদান জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলটের। তিনিই তাকে প্রথমে জাতীয় লিগ, পরে প্রিমিয়ার লিগ, তারও পরে বিপিএলে খেলার সুযোগ করে দেন।
রাজশাহী দলে খেলার জন্য তাকে নিয়ে আসেন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খালেদ মাসুদ পাইলট। কিন্তু দলে নিয়ে এলেও অনেক আগে থেকেই খেলতে থাকা দুই বাঁহাতি স্পিনার সাকলায়েন সাজিব ও সানজামুল ইসলামের কারণে মাঠের বাইরে বসেই দিন পার করতে হচ্ছিল। দলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে পাইলট তাকে খেলানোর উপলক্ষ খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত লিগের শেষ ম্যাচে তাকে সুযোগ দেয়া হলে তাইজুল পাইলটের আস্থার প্রতিদান দেন চার উইকেট নিয়ে।
সেই মৌসুমে পাইলট তাকে প্রিমিয়ার বিভাগ ক্রিকেট লিগে প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাবে খেলার ব্যবস্থা করে দেন। প্রথমে ক্লাবের কর্মকর্তারা তাইজুলকে নিতেই চাননি। শুধু পাইলটের অনুরোধেই তাকে রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। তাইজুল এখানেও পাইলটকে আস্থার প্রতিদান দেন। পরের মৌসুমেও তিনি কাটিয়ে দেন একই ক্লাবে।
জাতীয় লিগ ও প্রিমিয়ার লিগ খেলানোর পর পাইলট মিশন ঠিক করেন তাকে বিপিএলে খেলানোর। কিন্তু বিপিএলে খেলোয়াড় অকশনে তার নামই ছিল না। পরে পাইলট বিপিএলের গভর্নিং বডিকে অনুরোধ করে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করান। অকশনে তাকে নেয়ার সময়ও পাইলটকে এক দফা দুরন্ত রাজশাহীর কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। এখানেও তিনি তাইজুলের পক্ষে ব্যাট করে উতরে যান। তাইজুল বিপিএলেও হতাশ করেননি। এভাবেই তিনি উঠে আসেন। সময়ের পরিক্রমায় তাইজুল নিজেকে মেলে ধরতে থাকেন। নজরে আসে নির্বাচকদের। সুযোগ পান ‘এ’ দলেও। সাফল্য তাকে এখানেও বঞ্চিত করেনি।
আর জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে একদিনের আন্তর্জাতিকের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে অভিষেকেই হ্যাট্রিক করার কীর্তিগাঁথা রচনা করেন তিনি। ২০১৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে নেন পাঁচ উইকেট। এরপর ২০১৪-১৫ মৌসুমে সফরকারী জিম্বাবুয়ে দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে তার নিজস্ব সেরা ৮/৩৯ পান যা টেস্ট পর্যায়ে যে-কোন বাংলাদেশীদের তুলনায় সেরা। ২০১৫ তারিখে সফরকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১ম টেস্টের ১ম ইনিংসে তৃতীয়বারের মতো ৫ উইকেট লাভ করেন তিনি।
মোহাম্মদ রুবেল হোসাইন:
খুলনা বিভাগের বাগেরহাটে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম পেসার মোহাম্মদ রুবেল হোসাইন। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পরই একতালে বোলিং করছেন তিনি। অন্য ক্রিকেটাররা বয়সভিত্তিক কিংবা বিভিন্ন ক্লাব পর্যায় থেকে ওঠে আসলেও রুবেলের বিষয়টি ভিন্ন।
গ্রামীণফোন পেসার হান্ট ২০০৭ সালের আবিস্কার রুবেল। সেবার পেসার হান্টে সাতক্ষীরার হয়ে প্রথম হয়েছিলেন। পরে সাতক্ষীরা থেকে ইমরান স্যারের মাধ্যমে ক্যাম্পে চলে আসেন। তখন থেকেই জাতীয় দলের নেটে বল করেন তিনি। এরপর তাদেরকে নিয়ে বিকেএসপিতে একটি ক্যাম্প হয়েছিল। ওখানে ২০ জনের এক প্রতিযোগীতায় প্রথম হয়েছিলেন রুবেল। সেখান থেকে ১০ জনকে নিয়ে একটা ক্যাম্প করা হয়েছিল।
২০০৮ সালেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার সুযোগ মেলে তার। আর ২০০৯ সালে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। বাংলাদেশ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর আলো ছড়াচ্ছেন তিনি। আর বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হতে দারুণ অবদান রেখেছিলেন তিনি।
সোহাগ গাজী:
‘সাহারা কাপ ২০১২’-এর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় সোহাগ গাজীর। অভিষেকেই ৪ উইকেট পাওয়ায় ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিয়ে আলোচনায় চলে আসেন তিনি।
দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট সোহাগ গাজী। পরিবারের ছোট ছেলে হওয়ায় আদরটা যেন একটু বেশিই। ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটপাগল। আবার পড়াশোনাতেও সমান মনোযোগী। এমন ছেলেকে তাই বাড়ির কেউ খেলতে বাধা দেয়নি।
গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী হলেও তার বাবা মো. শাহজাহান গাজী পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় ছোটবেলা কেটেছে বিভিন্ন জেলায়। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন খুলনাতে। ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ দেখে সোহাগের বড় ভাই শাহিন গাজী খুলনার একটি ক্রিকেট ক্লাবে তাকে ভর্তি করে দেন।
তার বাবা বদলি হওয়ায় বরগুনা জিলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন সোহাগ। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বরগুনা আন্তঃজেলা স্কুল ক্রিকেটের চুড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ পান তিনি। সেই টুর্নামেন্টে ঢাকায় এসে দারুণ পারফর্ম করে নির্বাচিত হন ভারতে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের জন্য। এখান থেকেই শুরু হয় জীবনে ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার নতুন গল্প। ধীরে ধীরে জেলা, বয়সভিত্তিক দলে খেলতে থাকেন। বয়সভিত্তিক দলে ও একাডেমী দলে ছিলেন ঠিকই তবে স্ট্যান্ডবাইয়ের তালিকায়।
এরপর ধারাবাহিক পারফমেন্সে ২০০৯ সুযোগ পেলেন 'এ' দলে। সেবার 'এ' দলের হয়ে ভারত সফরে ২৪ উইকেট নিয়ে আস্থার প্রতিদান দিলেন। পরে অনন্য কীর্তি গড়লেন ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় লিগে বরিশালের হয়ে খুলনার বিপক্ষে সেঞ্চুরির করার পাশাপাশি হ্যাট্রিকসহ ৭ উইকেট নিয়ে। দুয়ার খুলে গেল জাতীয় দলের। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ড বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করলেন। আর দ্বিতীয় ইনিংসে হ্যাটট্রিক সহ ৬ উইকেট শিকার করেন।
জেডআই





