চট্টগ্রামে চলমান টেস্টের তৃতীয় দিনের প্রথম বলেই সাফল্য পেয়েছেন বাংলাদেশ দলের স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এনক্রুমা বোনারকে (১৭) স্পিনঘূর্ণিতে স্লিপে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেন তাইজুল। সফরকারী ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংসে এখন পর্যন্ত সংগ্রহ তিন উইকেটে ৭৭ রান।

এর আগে মেহেদী হাসান মিরাজের ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৪৩০ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশ। ম্যাচের তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হয়েছে আজ শুক্রবার। সফরকারী ক্যারিবীয়রা ৩৫৫ রানে পিছিয়ে থেকে খেলা শুরু করেছে।

বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের জবাবে নিজেদের ইনিংস শুরু করে গতকাল দিন শেষে ২৯ ওভারে ২ উইকেটে ৭৫ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবীয়দের পতন হওয়া দুটি উইকেট নেন বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমান।

এর আগে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংসে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে ১০৩ রানে আউট হন মিরাজ। এ ছাড়া সাকিব আল হাসান ৬৮, ওপেনার সাদমান ইসলাম ৫৯ এবং মুশফিকুর রহিম-লিটন দাস ৩৮ রান করে করেন।

প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ২৪২ রান। সাকিব ৩৯ এবং লিটন দাস ৩৪ রানে অপরাজিত ছিলেন।

গতকাল দিনের ১৪তম বলে বিদায় নেন লিটন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সফল বাঁ-হাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানের ঘুর্ণি সামলাতে না পেরে বোল্ড হন লিটন। ৬৭ বলে ছয়টি চারে ৩৮ রান করে ওয়ারিকানের চতুর্থ শিকার হন লিটন।

এর আগে ম্যাচ শুরুর দিন গত বুধবার ১৯৩ রানে পঞ্চম উইকেট পতনের পর সাকিবের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে স্বস্তিতে দিন শেষ করতে বড় ভূমিকা রাখেন লিটন। কিন্তু, গতকাল দ্বিতীয় দিন সাকিবের সঙ্গে জুটি বড় করতে পারেননি তিনি। ১০৯ বলে ৫৫ রানের জুটি গড়েন তাঁরা। বাংলাদেশের ইনিংসে এটি ছিল তৃতীয় হাফ-সেঞ্চুরির জুটি।

পঞ্চম উইকেটে সাকিব-মুশফিকুর রহিমের ১০৮ বলে ৫৯ রান ছিল ইনিংসের সেরা জুটি। এই জুটিকে ছাপিয়ে যান সাকিব ও মিরাজ। সপ্তম উইকেটে ১৩০ বলে ৬৭ রান যোগ করেন তাঁরা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে ১১০তম ওভারে বাংলাদেশের স্কোর ৩০০ স্পর্শ করেন সাকিব-মিরাজ। তার আগে ওয়ারিকানের করা ৯৭তম ওভারের পঞ্চম বলে এক রান নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের ২৫তম হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সাকিব। নিষেধাজ্ঞার পর টেস্টে ফিরেই হাফ-সেঞ্চুরির দেখা পেলেন তিনি।

তবে হাফ-সেঞ্চুরির পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের দীর্ঘদেহী স্পিনার রাকিম কর্নওয়ালের বলে বিদায় নেন সাকিব। হাল্কা লাফিয়ে ওঠা বলে নিয়ন্ত্রণহীন কাট করতে গিয়ে পয়েন্টে প্রতিপক্ষের অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটের হাতে ক্যাচ দেন সাকিব। ২৩১ মিনিট ক্রিজে থেকে পাঁচটি চারে ১৫০ বলে নিজের নান্দনিক ইনিংসটি সাজান সাকিব। নিজের ২৫তম ওভারে এসে প্রথম উইকেট পান কর্নওয়াল।

এরপর মিরাজের সাথে জুটি বেঁধে মধ্যাহ্ন-বিরতি পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন থাকেন তাইজুল ইসলাম। ৯৩ বলে সাতটি চারে ৪৬ রানে অপরাজিত থেকে বিরতিতে যান মিরাজ। ২১ বলে পাঁচ রানে অপরাজিত ছিলেন তাইজুল।

বিরতি থেকে ফিরেই টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মিরাজ। তাঁর হাফ-সেঞ্চুরি পর ব্যক্তিগত ১৮ রানে বিদায় নেন তাইজুল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার শ্যানন গাব্রিয়েলের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তিনি। তাইজুল-মিরাজ জুটি ১১৭ বলে ৪৪ রান স্কোর বোর্ডে জমা করেন।

তাইজুলের আউটের পর দশ নম্বর ব্যাটসম্যান নাইম হাসানকে নিয়ে দলের স্কোর বাড়াতে থাকেন মিরাজ। ব্যক্তিগত ৭১ রানে জীবনও পান মিরাজ। স্টাম্পিংয়ের হাত থেকে বাঁচেন তিনি। অন্যপ্রান্তে বেশ সাবলীল ব্যাট করতে থাকেন নাইম। ১৪০তম ওভারে ওয়ানিকানকে পরপর তিনটি চার মারেন নাইম। ১৪৩ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর ৪০০-তে পৌঁছায়। ২২তম বারের মতো নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে ইনিংসে চারশ রান করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

মিরাজ নার্ভাস-নাইন্টিতে পা দেওয়ার পর আউট হন নাইম। ৪৬ বলে চারটি চারে ২৪ রান করে এনক্রুমার বোনারের শিকার হন তিনি। তখন ৯২ রানে দাঁড়িয়ে মিরাজ। দলের স্কোর ৯ উইকেটে ৪১৬। এতে মিরাজের সেঞ্চুরি নিয়ে শঙ্কা জাগে। কারণ বাংলাদেশের হাতে শেষ উইকেট। আর, মিরাজের প্রয়োজন ছিল ৮ রান।

শেষ পর্যন্ত ১৪৭তম ওভারের চতুর্থ বলে ওয়ারিকানের ডেলিভারিতে প্যাডেল সুইপে দুই রান তুলে ১৬০তম বলে টেস্ট ক্যারিয়ারের ২৩তম ম্যাচে প্রথম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মিরাজ।

আট নম্বরে নেমে সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে রেকর্ড বইয়ে নাম তোলেন মিরাজ। এর আগে ২০০৪ সালে খালেদ মাসুদ, ২০১০ সালে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ এবং ২০১৩ সালে সোহাগ গাজী আট নম্বরে ব্যাট হাতে নেমে সেঞ্চুরি করেছিলেন।

সেঞ্চুরির পর বেশি দূর নিজের ইনিংসকে টানতে পারেননি মিরাজ। দলীয় ৪৩০ রান শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে লং-অনে ক্যাচ দিয়ে কর্নওয়ালের দ্বিতীয় শিকার হন তিনি। ২২৪ মিনিট ক্রিজে থেকে ১৬৮ বল খেলে ১৩টি চার মারেন মিরাজ। ১১ বলে তিন রানে অপরাজিত থাকেন মুস্তাফিজুর রহমান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ারিকান ১৩৩ রানে চারটি উইকেট নেন। এ ছাড়া কর্নওয়াল দুটি, রোচ-গ্যাব্রিয়েল-বোনার একটি করে উইকেট শিকার করেন।

মিরাজের আউটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইনিংস শেষ হবার পরই চা-বিরতির ডাক দেন আম্পায়ারেরা। চা-বিরতি পর নিজেদের ইনিংস শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

প্রথম চার ওভার ভালোভাবেই কাটিয়ে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট ও জন ক্যাম্পবেল। পঞ্চম ওভারে বাংলাদেশকে প্রথম উইকেট শিকারের স্বাদ দেন একাদশের একমাত্র পেসার মুস্তাফিজ।

ক্যাম্পবেলকে (৩) লেগ বিফোর ফাঁদে ফেলেন মুস্তাফিজ। প্রথম উইকেট পতনের পর সর্তক হয়ে পড়েন ব্র্যাথওয়েট এবং তিন নম্বরে নামা শায়নে মোসলে। তবে এই জুটিকে উইকেটে থিতু হতে দেননি মুস্তাফিজ। মোসলেকে লেগ বিফোর আউট করেন ফিজ। ফলে দলীয় ২৪ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এরপর অবশ্য বাংলাদেশ বোলারদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ব্র্যাথওয়েট ও বোনার। তৃতীয় উইকেটে ৫১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দিন শেষ করেন তাঁরা। ব্র্যাথওয়েট ৪৯ ও বোনার ১৭ রানে অপরাজিত থাকেন। বাংলাদেশ একাদশের একমাত্র পেসার মুস্তাফিজ ১৮ রানে দুই উইকেট নেন। অন্যদিকে বল হাতে উইকেট শূন্য ছিলেন দলের চার স্পিনার সাকিব-মিরাজ-তাইজুল ও নাইম।

আজ ম্যাচের তৃতীয় দিনে যত দ্রুত সম্ভব উইন্ডিজের ইনিংস থামিয়ে দিতে চাইবে বাংলাদেশ।

এমআর