সব ধরনের ক্রিকেট থেকে সাকিব আল হাসানের ওপর ৬ মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বিসিবি। শাস্তির মেয়াদ এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাইরের কোনো লিগে খেলার জন্য এনওসি (অনাপত্তিডপত্র) পাবেন না। এমন সংবাদের পর ফেসবুকে উঠেছে ঝড়। এমনি কিছু মন্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

মাহবুবুল হক ওসমানী:

সাকিব আল হাসানের জন্য আগামী দেড় সিমেস্টারের (৬ মাস) অ্যাসাইনমেন্ট: ১. ডালিম পাকিলে তা নিজেই ফেটে যায়; ছোটলোক বড় হলে বন্ধুকে কাঁদায়; এবং ২. যে গাছের যত বেশি ফল সে গাছ ফলের ভারে ততই নুয়ে পড়ে; এই দুটি প্রবাদ বাক্যের ভাবসম্প্রসারণ দৈনিক একবার করে লেখা এবং নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করা!

দিদারুল ইসলাম মানিক:

কেউ শৃঙ্খলাভঙ্গ বা অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই পারে। শাস্তির উদ্দেশ্য যদি হয় অপরাধীকে ঘৃণিত হিসেবে উপস্থাপন করা তাহলে পক্ষান্তরে তা বিপরীত ফলই বয়ে আনে। পৃথিবীর সেলিব্রেটিদের বিশাল একটি অংশ শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হন। তবে এ জন্য কেউ তাদের ঘৃণা করা শুরু করেনা। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম কেবল তাদের অপরাধটাকেই সামনে আনে, তাকে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করেনা। কিন্তু সাকিব আল হাসানের ক্ষেত্রে হয়েছে বিপরীতটি, তাকে ভিলেন বানানো হয়েছে।

কিছু নীতিবর্হিভূত সংবাদমাধ্যম কোন ধরণের তথ্য-সূত্র ছাড়াই একপেশে সংবাদ লিখে সাকিবকে নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে আমাদের মতো 'চিন্তাহীন' কিছু নালায়েক তাকে মাথা থেকে পায়ে নামিয়ে এনেছে। সাকিবের প্রতি কিছু দেশপ্রেমিকের ঘৃণার বর্হিংপ্রকাশ দেখে মনে হয়েছে, দেশে সাকিবের চেয়ে বড় অপরাধী কেউ নাই। অনেকে তার বংশ পরিচয় নিয়েও কথা বলেছেন। কেউ কেউ আবার তাকে পাকিস্তানী বানিয়েও গোষ্ঠী উদ্ধার করছে।

আমার মতে সাকিব যা করছে তার পুরোটাই স্বাভাবিক ঘটনা। যে দেশে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা অবললীয় স্থুলভাষায় কথা বলতে পারে, হাজারো আচরণগত সমস্যা নিয়ে নিয়ে বছরের পর বছর মসনদ টিকিয়ে রাখতে পারে সেখানে সাকিবের আচরণগত সমস্যা থাকা মামুলি ব্যাপার। তাছাড়া, পাপনদের মতো ক্ষমতালোভীরা, যাদের কোন ক্রিকেটীয় জ্ঞান নাই, যারা চায় সব ক্রিকেটার তাদের দেখে বিড়ালের মতো মাথা নত করে মিউ মিউ করবে তাদের থেকে এর চেয়ে বেশি কী বা আশা করা যেতে পারে। কেউ তাদরে পূজা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই সে 'বেয়ারা' ও সৃঙ্খলাভঙ্গকারী।

সবশেষে বলবো, আইপিএলসহ অন্য দেশের লীগ খেলে আকরাম খানদের মতো লিজেন্ডদের কাছ থেকে সাকিব যা শিখছেন তা বাংলাদেশে ওই কোমরভাঙ্গা কোচদের থেকে ১০ বছরেও শেখা সম্ভব না। সাকিব যেখানেই খেলতে যাক, আর্ন্তজাতিক মানেরই কোচেরই ছায়ায় থাকতো। সুনীল নারায়ণ আইপিএল শেষ করে বোর্ড ঘোষিত সময়ের অনেক পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলে যোগ দেয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ধারাবহিক ভালো পারফর্ম করে যাচ্ছে সে। সাকিবও পারতো সেটা, ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে গিয়েও।

রকিবুল ইসলাম মুকুল:

আমাদের প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলো। আসলে কোথাও একটা গণ্ডগোল হচ্ছে মনে হচ্ছে। এক সময়ের জনপ্রিয় ফুটবলের মতো হালের ক্রেজ ক্রিকেটকে ধ্বংস করার জন্য কোনো একটি মহল উঠে পড়ে লেগেছে। সাকিব দেশে ফিরে তো বললো যে সে দেশের হয়ে খেলবে না এমন কথা বলেনি। তাহলে সেই কথা ছড়ালো কারা। কারা ফাঁসানোর চেষ্টা করলো সাকিবকে। আবার ম্যাচের পর ম্যাচ গোল্লা খেয়েও চাচার কোমর ধরে বাংলাদেশের তরুণদের জ্ঞান দিয়ে বেড়াচ্ছে তামিম ---বাল। হচ্ছে কি এসব? আমরা চাই কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে শাস্তি পাক। কিন্তু তার বিনিময়ে দেশ যেন ভালো কিছু পায়। সাকিব বিহীন ক্রিকেটের ভালো কিছু দেখার অপেক্ষায়............ শুভ কামনা সাকিব।

হাসান তায়েফ:

আশরাফুলের শাস্তির খবরে খুশি হতে পারি নাই। কিন্তু সাকিবের এই রকম শাস্তিতে খুব বেশি খারাপ লাগছে না! বিসিবি ভালোই পারে! টাকা বেশি খাইতে গিয়ে একবারে বড় শিক্ষা হইছে! ভালো খেললেই যে ভালো খেলোয়াড় হওয়া যায় না এইটা যদি সাকিব বুঝত!

মুহাইমিনুল হাসান:

যতদিন সাকিব দলে না ফিরছে ততদিন ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ নামক যে একটা দেশ আছে সেটা ভুলে গেলাম।

সাকিবের প্রতি ভালবাসাটা তার খেলা থেকেই হোক বা নিজ জেলার মানুষই হোক প্রথম থেকেই ছিল। শেষ অবধিও থাকবে।

ইভান:

৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হলেন সাকিব (বাচ্চা লোক তালিয়া বাজাও)!!!

আমাদের কাছে নায়ক হলেও কেন জানি তার খুব ভিলেন হবার শখ। বিতর্ক তার পিছু ছাড়ছে না; নাকি তিনি বিতর্কের পিছু ছাড়ছেন না বোঝা মুশকিল! ক'দিন আগে শিশির'কে নিয়ে আল হাসান থেকে খান হয়ে গিয়ে বিতর্কে জড়ালেন! ভাল কথা; একবার ভাবুন'তো শচীন, পন্টিং বা লারা'র বৌকে কেউ গ্যালারিতে টিজ করছে (আঁতকে উঠলেন?)!

অভিযোগ গুরুতর!!! অথচ মনে পড়ে; ২০১৩-তে দেশের হয়ে খেলার জন্য IPLখেলেন নি। চাচার অনুমুতি নিয়ে খেলতে গেলেন; চাচাতো একটু বললেও পারতেন একটা কাগজে একটু লিখে দাও বাপধন।

মি. বোর্ড সভাপতি; পাপন সাহেব আসার পর থেকে সাফল্যের হার নিচের দিকে নামতে নামতে এখন দর্শক হিসেবেও নিজেকে নিষিদ্ধ লাগে! মুদির দোকানদারও সভাপতি হতে পারেন সেখানে কোন সমস্যা নাই; কিন্তু ক্রিকেট মূল্যায়নের বিচারে হাতুরাসিংহের মত দ্বিতীয় সারির কোচ নিয়োগ করে বোঝালেন সাবেক রাষ্ট্রপতির ছেলে পরিচয়েই ভাল ছিলেন।

সাকিবের এমন খারাপ আচরণ এই প্রথম না। খেলোয়াড় সাকিব আর ব্যাক্তি সাকিব আলাদা। ব্যাক্তি সাকিবের আচরণের ক্ষেত্রে বলবো ওরে গোনার টাইম নাই ভাই। বেয়াদব একটা! খেলোয়াড় হিসেবে তাকে সন্মান জানাই। ভাল খেলোয়াড় হতে হলে আগে ভাল মানুষ হতে হয় (আমাদের পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের মাঝেও ঘাউড়া কিছু পোলাপান থাকে। ওদের ট্রিটমেন্ট আলাদা)!

যাই হোক; আশরাফুল শেষ; সাকিব'তো সাকিবই; পরেরটার অপেক্ষায় থাকলাম !!!

খোমেনি ইহসান:

সাকিব যদি লিখিত অনুমতি না নিয়ে থাকেন তাহলে নিঃসন্দেহে নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু যে সমস্যার সমাধান অনেক আগেই হওয়ার কথা তা শেষ পর্যন্ত টেনে নেওয়া হল সাকিবের লন্ডন পৌঁছানো পর্যন্ত। সাকিব দায়ী থাকলে তার উপযুক্ত শাস্তি পাক, কিন্তু বোর্ডের দায় দায়িত্বে গাফিলতির জন্য কারও শাস্তি হবে কি?

মামুন হাসান:

সাকিবকের শাস্তিটা প্রাপ্য ছিল, কারণ বেয়াদবির একটা সীমা থাকা উচিত, এটাতে সবাই বুঝতে পারবে কেউই অপরিহার্য নয়।

রেজা আকাশ:

আজীবন হারিয়ে ফেলার চেয়ে ছয় মাসের জন্য সাকিবকে হারনো আমাদের দেশের জন্যই মঙ্গলজনক। এক আশরাফুলকে হারিয়ে কেঁদেছি। তোমাকে আর হারাতে চাইনা। মানবিক ভুলগুলো শুধরে নিয়ে অবার তুমি ফিরে আসো ‌'ময়না' হয়ে। দুর্দান্ত পারফর্ম করে ফিরিয়ে দেও সে সুখের মুহুর্তগুলো।

মুহম্মদ ইব্রাহীম সুজন:

সাকিব আল হাসানকে শাস্তি দেয়া প্রসঙ্গে ফেসবুকে বিভিন্ন জন বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। কেউ বলছেন ‘খুব ভাল হয়েছে’, ‘উচিত শিক্ষা হয়েছে‘ আবার কেউ বলছেন ‘খুবই গর্হিত কাজ হয়েছে’, ‘ক্রিকেটকে ধ্বংস করবার ষড়যন্ত্র’ ইত্যাদি ইত্যাদি। হোম পেইজে ফেবু বন্ধুদের একটার পর একটা স্ট্যাটাস। কেউ প্রশংসামুখর আবার কেউ সমালোচনা মুখর। আমার মতো অনেকেই চুপ আছেন। একটা জিনিস বোধ হয় আমরা ভুলতে বসেছি।

‘ঐক্যবোধ’।

‘সাকিব আল হাসান ‘প্রসঙ্গের মতো দেশের প্রত্যেকটি ব্যাপার নিয়েই আমাদের মধ্যে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। জাতীয়তাবোধ থেকে শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চ, আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে জাতীয় পার্টি, এমনকি বিশ্বকাপের রেফারিং নিয়েও আমাদের মধ্যে মতভেদ আছে।

যেকোনো ব্যাপারেই আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। থাকতে পারে স্বপক্ষের যুক্তি-বিপক্ষের যুক্তি। এটা হল কেন? এটা না হয়ে ওইটা হলে এইটা হতো না।এভাবে তর্ক-বিতর্ক প্রতিটি বিষয় নিয়েই হতে পারে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এভাবেই আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিটি বিষয় পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং যথার্থতা পায়।

কিন্তু আমরা যদি ভুলে যাই যে, যেকোনো ধরণের কাজ/সিদ্ধান্ত/বিতর্ক/ধারণা ইত্যাদি, যা আমাদেরকে বিভক্তিত করে, তার সবই সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক। দিন দিন আমরা শুধু বিভক্তিতই হচ্ছি। বিভক্তিত হওয়াটা আমাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যে হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়েও বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন হচ্ছে। তাহলে কি আমাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার শিক্ষাটা হারিয়ে যাচ্ছে? আমরা আসলে বিরুদ্ধের মতবাদ গ্রহণ করাতো দূরে থাক শুনতেও পারি না। নিজের মতবাদের বিরুদ্ধে কেউ গেলে তাকে শত্রু বলাই আমাদের ধর্ম হয়ে ‍দাঁড়িয়েছে। দোষটি আমাদের কারও না।

আমরা ছোটোকাল থেকেই বিভক্তি দেখে বড় হয়েছি। দেখেছি এক টুকরো জমি নিয়ে ভাই কিভাবে ভাইয়ের বিরুদ্ধে চলে যায়। দেখেছি রাজনৈতিক স্বার্থে কিভাবে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। পদ/পদবির লোভে বন্ধুদের মধ্যে দুরুত্ব হওয়া দেখেছি। এভাবে প্রতিটি পদে পদে দুরুত্ব সৃষ্টির তিক্ত স্মৃতি নিয়ে যারা বড় হয়েছে তাদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা খুবই কঠিন বটে। কোনো জাতি ‍বা দেশের উপরে এটম বোম মেরে তাদেরকে আংশিকভাবে ধ্বংস করা যায়। আমার মনে হয় ‘বিভক্তিত’ করে ধ্বংসের কাজটি আরো দ্রুত করা যায়।

ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু খেলা নয়, এটিই দ্বিতীয় জিনিস যা স্বাধীনতার পরে বাঙ্গালি জাতিকে সম্পূর্ণরুপে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা একবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। এর ফলে ‘প্রায় অসম্ভব’ এক বিজয় আমরা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারিনি। সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে।

তাই বলি, এখন সময় এসেছে। সব দ্বিধা-দ্বন্দ ঝেড়ে ফেলে একত্রিত হবার। দেশের জন্য, নিজের জন্য, মায়ের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যা কিছু মঙ্গল ও কল্যাণকর তা অর্জনে আমাদেরকে একত্রিত হতে হবে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সবাইকে একত্রিত হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সাকিব আল হাসানকে নিষিদ্ধ করা ভাল হয়েছে না মন্দ হয়েছে সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে যেকোনো ধরণের সিদ্ধান্ত যা আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর এবং যা আমাদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করে তা থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত।

তবে এ কথাও সত্যি। সবাইকে একত্রিত করা সম্ভব না। বিরোধী মত থাকবেই।

ঢাকা, ৭ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ