বার্সেলোনা ছেড়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন চলছে কদিন ধরেই। সে হিসেবে মঙ্গলবার সেভিয়ার বিপক্ষে উয়েফা সুপার কাপই বার্সার জার্সিতে পেদ্রোর শেষ ম্যাচ হওয়ার কথা।

ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে তিনি যখন মাঠে আসলেন, স্কোরলাইন ৪-৪। আর তখন মাঠে নেমেই দলের ত্রাণকর্তা হয়ে দেখা দিলেন এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। অতিরিক্ত সময়ে পেদ্রোর গোলেই উয়েফা সুপার কাপের শিরোপা জিতেছে বার্সা।

দলের ৫-৪ গোলের জয়ে বড় অবদান অবশ্য ম্যাচসেরা লিওনেল মেসিরই। নাটকীয় ম্যাচে অসাধারণ দুটি ফ্রি-কিকে জোড়া গোল করেছেন বার্সার প্রাণভোমরা। আর পেদ্রোর জয়সূচক গোলটিও এসেছে তার সহায়তায়।

ইউরোপের দ্বিতীয় মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় এসি মিলানের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়ল বার্সা। দুই দলই পাঁচবার করে শিরোপা জিতেছে।

এই রেকর্ডের পাশাপাশি বছরের ছয়টি শিরোপা জয়ের পথেও আরেক ধাপ এগিয়ে গেল বার্সা। গত মৌসুমে ট্রেবল জয়ী বার্সার এ বছরে এটা চতুর্থ শিরোপা। এখন বছরের বাকি দুই টুর্নামেন্ট-স্প্যানিশ সুপার কাপ ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জিতলেই দ্বিতীয়বারের মতো এক বছরে ছয়টি শিরোপা ঘরে উঠবে বার্সার। ২০০৯ সালে পেপ গার্দিওলা যে কীর্তি প্রথমবার গড়েছিলেন, এবার সে কীর্তি গড়ার হাতছানি লুইস এনরিকের সামনে।

জর্জিয়ার তিবিলিসিতে মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১টায় শুরু হয় উয়েফা সুপার কাপের ম্যাচটি। ম্যাচের মাত্র তৃতীয় মিনিটে বার্সাকে হতবাক করে সেভিয়াই প্রথম এগিয়ে যায় এভার বানেগার গোলে। ডি বক্সের সামনে বার্সা ডিফেন্ডার মাশচেরানো ফাউল করলে ফ্রি-কিক পায় সেভিয়া। ফ্রি-কিকে দারুণ এক শটে বল জালে জড়িয়ে দেন সেভিয়ার আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার বানেগা। তবে সপ্তম মিনিটে ওই ফ্রি-কিক থেকেই বার্সাকে সমতায় ফেরান আর্জেন্টিনারই সেরা তারকা মেসি। সেভিয়ার খেলোয়াড়দের তৈরি করা দেওয়ালের ওপর দিয়ে বাঁ-পায়ের কোনাকুনি শটে বল জালে জড়িয়ে দেন বার্সা ফরোয়ার্ড। এরপর নিজেরা এগিয়ে যেতেও খুব বেশি সময় নেয়নি বার্সা। ১৫ মিনিটে বাঁ-পায়ের জাদুকরি আরেকটি ফ্রি-কিকে বার্সাকে ২-১ গোলে এগিয়ে দেন মেসি। ৩০ গজ দূর থেকে শটে নিজের জোড়া গোল পূরণ করেন চারবারের ফিফা বর্ষসেরা এই খেলোয়াড়।

এরপর ২৮ মিনিটে আবার ব্যবধান বাড়াতে পারত বার্সা। কিন্তু লুইস সুয়ারেজের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল করে দেন রেফারি। অবশ্য বিরতিতে যাওয়ার একটু আগে ওই সুয়ারেজের নৈপুণ্যেই ৩-১ গোলে এগিয়ে যায় বার্সা। যদিও সুয়ারেজ নিজে গোল করতে পারেননি। তবে রাফিনহার করা গোলে বড় অবদান উরুগুইয়ান স্ট্রাইকারেরই। প্রথমে মাঝ মাঠের কাছে থেকে বল টেনে নিয়ে গিয়ে গোলরক্ষককে একা পেয়েও বল জালে জড়াতে ব্যর্থ হন উরুগুইয়ান তারকা। তার শট ঠেকিয়ে দেন সেভিয়ার পর্তুগিজ গোলরক্ষক বেতো। তবে ওখানেই আবার বল পেয়ে সেভিয়ার এক খেলোয়াড়দের দু-পায়ের মাঝে দিয়ে পোস্টের সামনে অসাধারণ একটি পাস দেন সুয়ারেজ। আর তার পাস থেকে বল পেয়েই তা জালে জড়িয়ে দেন রাফিনহা।

বিরতির পর খেলার শুরুতেই বার্সার ব্যবধান ৪-১ করেন সুয়ারেজ। প্রথমার্ধে গোল না পাওয়ার জ্বালাটা এবার মিটিয়ে নেন এই উরুগুইয়ান স্ট্রাইকার। ৫২ মিনিটে সার্জিও বুস্কেটসের পাস থেকে গোলটি করেন সুয়ারেজ। অবশ্য পাঁচ মিনিট পরই সেভিয়ার পক্ষে একটি গোল শোধ করেন ভিতোলো। ৬২ মিনিটে বার্সাকে গোলবঞ্চিত করে ক্রসবার। ইভান রাকিটিচের কর্নার কিক থেকে হেড নিয়েছিলেন রাফিনহা। কিন্তু তার হেড ক্রসবারে লেগে চলে যায়। ৭২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে সেভিয়ার আরেকটি গোল শোধ করেন কেভিন গামেইরো। বক্সের ভেতর সেভিয়ার ভিতোলোকে ফাউল করেন বার্সার ফরাসি ডিফেন্ডার জেরেমি ম্যাথিউ। সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি, ম্যাথিউকে দেখান হলুদ কার্ড। পেনাল্টি থেকে ব্যবধান কমান গামেইরো, অর্থাৎ বার্সা ৪-৩ সেভিয়া।

চার মিনিট পর মেসির জোরালো একটি শট ঠেকিয়ে দেন সেভিয়ার গোলরক্ষক। এরপর ৮১ মিনিটে তো বার্সা সমর্থকদের স্তব্ধ করে দেয় সেভিয়া, সমতা ফেরায় ৪-৪ গোলে। লম্বোবিলের সহায়তায় গোলটি করেন কনোপ্লায়াঙ্কা। এই গোলে অবশ্য বার্সার রক্ষণভাগের দুর্বলতাই ফুটে ওঠে বেশি।

বাকি সময় টানটান উত্তেজনায় জমে ওঠে ম্যাচটি। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মিনিটে গোল প্রায় পেয়েই গিয়েছিলেন মেসি। ৩৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তার ফ্রি-কিক পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। ফলে ৪-৪ সমতাতেই শেষ হয় নির্ধারিত সময়ের খেলা। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে।

অতিরিক্ত সময়ে দুই দলের কেউই গোল পাচ্ছিল না। নিশ্চিত টাইব্রেকারের দিকেই এগিয়ে চলছিল ম্যাচ। আর তখনই বার্সার ত্রাণকর্তা হয়ে দেখা দেন ৯৩ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে আসা পেদ্রো। ১১৫ মিনিটে দলকে ৫-৪ গোলে এগিয়ে দেন তিনি। অবশ্য এই গোলে সবচেয়ে বেশি অবদান মেসিরই। বক্সের সামনে থেকে মেসির ফ্রি-কিক বাধা পেলে ফিরতি শট নেন তিনি। তার জোরালো শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন সেভিয়ার গোলরক্ষক বেতো। তবে ওখানেই বল পেয়ে জোরালো শটে জালে জড়িয়ে দেন পেদ্রো। আর তার ওই শেষ মুহূর্তের গোলে শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যায় বার্সারও।

কেএইচ