অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ খেলতে এসে একরকম অনাহূতই হয়ে পড়েছেন দীনেশ চান্দিমাল! প্রশ্নকর্তা এমন একটা হাবভাব ফুটিয়ে তুলতেই নড়েচড়ে বসা লাসিথ মালিঙ্গা তাঁকে ভুল প্রমাণের প্রাণান্ত চেষ্টায় নেমে গেলেন, ‘না, না...চান্দিরও কালকের (আজ) ম্যাচ খেলার খুব ভালো সম্ভাবনা আছে।’
প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন আসে। মালিঙ্গার এ কথায়ও খুলে গেল আরেক প্রশ্নের দিগন্ত। চান্দিমাল যদি খেলেনই, তাহলে শ্রীলঙ্কাকে নেতৃত্ব দেবেন কে? তিনি, না চান্দিমাল? তৎক্ষণাৎ ঝাঁকড়া চুলভরা মাথায় একটু ঝাঁকুনিও খেলে গেল। এমনভাবে ‘মাইসেল্ফ’ বললেন যে দিব্যি তাঁর এক শব্দের জবাবের অনুবাদ এভাবেই করে দেওয়া যায়, ‘কে আবার? আমি।’
অপ্রত্যাশিত নয় একটুও। একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার উত্তেজনায় টগবগ করে ফোটারই তো কথা টি-টোয়েন্টির অন্যতম সেরা কার্যকর বোলারের। দিন দিন চান্দিমালের পারফরম্যান্সের ক্রমাবনতি সহ-অধিনায়ক মালিঙ্গাকে তুলে এনেছে নেতার আসনে। কাল দুপুরের সংবাদ সম্মেলনের একটু আগেই তাই খোলা মাঠে ট্রফি নিয়ে ‘ক্যাপ্টেন কুল’ মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে পোজও দিয়ে এলেন।
হুট করেই নেতৃত্ব পাওয়া মালিঙ্গার পক্ষে বিশ্বজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তো আর ‘কুল’ থাকা সম্ভব নয়। তাই নেতৃত্ব-বিষয়ক প্রশ্নে তিনি যতটা বিচলিত, তার আগে সংবাদ সম্মেলন করে যাওয়া ধোনি ততটাই নির্লিপ্ত। একাধিকবার তাঁর নেতৃত্ব বিশ্ব আসরের শিরোপা গেছে ভারতে। আর সেটার শুরু ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়া টি-টোয়েন্টির প্রথম বিশ্ব আসরেই।
সাত বছর পরে যখন আরেকটি ফাইনাল, তখন প্রথম ফাইনালের আগের দিনের স্মৃতিচারণা করার অনুরোধ গেল। কিন্তু ধোনি রীতিমতো নিরাশ করলেন, ‘চার দিন আগের কথাই মনে রাখা মুশকিল। আর আপনারা কি না বলছেন সাত বছর আগের কথা! ২০০৭ ফাইনালের আগের দিনের অনুভূতির কথা মনে করা তাই সত্যিই খুব কঠিন।’ ভুল কিছু বলেছেন বলেও দাবি করার সুযোগ নেই।
টানা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ঠাসা সূচির সঙ্গে আইপিএল মিলিয়ে স্মৃতির পাতায় এত কিছু যোগ হয়েছে যে অনেক বিয়োগও স্বাভাবিক। তা ছাড়া এই সাত বছরে গঙ্গায়ও তো কম জল গড়িয়ে যায়নি। যেমন ধোনির জীবনেও বাকবদল হয়েছে অনেক। ২০০৭ সালের লম্বা চুল ছেঁটে ছোট করেছেন অনেক দিন হয়। ‘মেরিটাল স্ট্যাটাস’-এও এসেছে পরিবর্তন। চুল-দাঁড়িতেও আগের চেয়ে বেশি পাক দৃশ্যমান। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। বিতর্কও খুব কম সঙ্গী হয়নি তাঁর।
সে জন্যই কাল দুঃখ করেই কি না এও বললেন যে ‘বিতর্ক ভারতীয় ক্রিকেটের অংশই হয়ে গেছে। আমাকেও এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেটে এমন ভালো-মন্দ ব্যাপার খুব কমই ঘটেছে, যেটাতে আমার নাম জড়িয়ে ছিল না।’ কিন্তু সাফল্যের ফুলে বিতর্কের জ্বালামুখ বন্ধ করার খ্যাতিও আছে তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের। খুব কাছের উদাহরণ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়। এর আগে একের পর এক হারে সমালোচনায় রীতিমতো চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হওয়ার মতোই অবস্থা হয়েছিল ভারতীয় দলের।
এই দলের সিংহভাগ সদস্য ছিলেন ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী দলেও। বিরাট কোহলি, সুরেশ রায়না, যুবরাজ সিং ও রবিচন্দ্রন অশ্বিনরা সফল সেই অভিযানের একেকজন দক্ষ সেনানী। তুলনায় লঙ্কান শিবিরে এমন কেউ নেই যাঁর বিশ্ব আসরের শিরোপায় হাত রাখার সৌভাগ্য হয়েছে। অধিনায়ক মালিঙ্গা অনেকটা নির্ভার হয়েই নেতৃত্ব দিতে পারেন কারণ তাঁর ওপর ছায়া হয়ে আছেন কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে ও তিলকরত্নে দিলশানের মতো সাবেক অধিনায়করা। আছেন টেস্ট এবং ওয়ানডে অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজও।
দলে রীতিমতো পারফরমারের ভিড়। কিন্তু একটা জায়গায় লঙ্কানরা দক্ষিণ আফ্রিকার মতোই। আসল সময়ে ঝলসে উঠতে না পারার জন্য প্রোটিয়াদের ‘চোকার্স’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু শ্রীলঙ্কাও তো কম কিছু নয়। গত সাত বছরে তাঁরাও তো চারটি বিশ্ব আসরের ফাইনাল খেলেছে। ২০০৭ ও ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং টি-টোয়েন্টির ফাইনালে খেলেছে ২০০৯ ও ২০১২ সালে। একবারও শিরোপার নাগাল না পাওয়া লঙ্কানরা যখন পঞ্চম ফাইনালে খেলতে চলেছে, তখন ভারত একই সময়ে তিনবার ফাইনাল খেলে হারেনি একবারও। ২০১১-এর ফাইনালে এই শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ২৮ বছর পর পুনরুদ্ধার করেছে ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপাও।
এই যখন অবস্থা, তখন ট্রফি হাতে পোজ দিলেন ধোনি ও মালিঙ্গা। এর আগে বাকি ১৪ দলের অধিনায়কও এ ট্রফি নিয়ে ছবি তুলেছেন। আজকের ফাইনালের পর এ ট্রফি ছোঁবেন শুধু একজন। বিজয়ী দলের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে আজ একটি দলের ফটোশুটও করা হবে না নিশ্চিত। তবে এ ফাইনালকে ঘিরে দুই দলের বাইরেও উত্তেজনার শেষ নেই কোনো। ফাইনাল দেখার জন্য আজ সকালেই ঢাকায় প্রচুর শ্রীলঙ্কান এসে নামছেন বলে জানা গেছে। এরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) এক পরিচালকও, ‘শ্রীলঙ্কা ও ভারত থেকে প্রচুর লোক আসছে। তারা টিকিটের চাহিদাও দিয়ে রেখেছে। এ কারণেই যে পরিমাণ টিকিট পাওয়ার কথা, তা পাচ্ছি না।’
কালোবাজারেও চড়ামূল্যে দেদার বিকোচ্ছে টিকিট। জমজমাট ফাইনাল দেখার প্রত্যাশায় যখন কাঁপছে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব, তখন আশাবাদী করে তুলছেন ধোনিও, ‘এটা বলতে পারি যে দুই দলই খুব রোমাঞ্চিত। আশা করছি খুব রোমাঞ্চকর একটা ফাইনালই হবে।’ আর এ ফাইনালের মধ্য দিয়েই দুই জীবন্ত কিংবদন্তি মাহেলা ও সাঙ্গাকারাকে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায় দিচ্ছে লঙ্কানরা। এই সময়ে বিশেষ একটা উপহার দেওয়ার চিন্তাও লঙ্কানদের তাড়না বাড়িয়ে দিচ্ছে আরো। মালিঙ্গার কথায় তা-ই বোঝা গেল, ‘কালকের দিনটা আমাদের বিশেষ দিন। এই দিনে আমাদের বিশেষ কিছু একটা করতে হবে।’
কে না জানে যে এবার শিরোপার নাগাল পেলেই কেবল তা ‘বিশেষ’ কিছু হবে। যা হবে গত সাত বছরে শ্রীলঙ্কার প্রথম বিশ্ব শিরোপাও। শেষ হাসি হাসলে ভারতের হবে চতুর্থ। টি-টোয়েন্টির আরো বেশি অনিশ্চিত চরিত্রের কারণে তাই আগে থেকেই অনুমান করা কঠিন যে কাপ কার, শ্রীলঙ্কা না ভারতের?

[b]ঢাকা, ৬ এপ্রিল,(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস[/b]