তামিম ইকবাল আর সৌম্য সরকারের শুরুটা দারুণ ছিলো । মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি নিয়ে ড্রেসিং রুমে ফিরবেন তারা। কিন্তু হলো না। দিনের খেলা মাত্র ১১ বল বাকি থাকতে প্রথম শিকার হিসেবে ফিরে গেলেন সৌম্য।

তারপর নাইট ওয়াচম্যান হিসেবে নামেন তাইজুল ইসলাম। তার দায়িত্ব ছিল কোনোমতে টিকে থাকা। সেই কাজটি তিনি সফলভাবেই সম্পন্ন করেছেন। আর তামিম ইকবাল আছেন ৩০ রান নিয়ে। সৌম্য সরকার আউট হয়েছেন ১৫ রান করে। দিন শেষ বাংলাদেশের স্কোর ১ উইকেটে ৪৫ রান।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশ এখন ৮৮ রানে এগিয়ে গেছে। উল্লেখ্য, প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ২৬০ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া ২১৭ রানে অল আউট হয়ে যায়।

এর আগে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের স্পিন ঘূর্ণিতে ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২১৭ রানেই অলআউট হয়ে যায় সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। ফলে প্রথম ইনিংসে ৪৩ রানের লিড পেয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ।

নিজের ৫০ টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৫ দশমিক ৫ ওভার বল করে ৬৮ রানে ৫ উইকেট নেন সাকিব। এই নিয়ে ১৬তম বারের মতো ৫ বা ততোধিক নিয়েছেন তিনি। আর দেশের মাটিতে এই নিয়ে ১২বার ৫ বা ততোধিক উইকেট নেয়ার কীর্তি গড়লেন সাকিব।

প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ম্যাট রেনশ ৪৫, অ্যাস্টন আগার অপরাজিত ৪১, পিটার হ্যান্ডসকম্ব ৩৩ ও প্যাট কামিন্স ২৫ রান করেন। বাংলাদেশের পক্ষে সাকিব ছাড়াও মেহেদি হাসান মিরাজ ৩টি ও তাইজুল ইসলাম ১টি উইকেট নেন।

দিনের শুরুতে ব্যাটিং বিপর্যয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। তিন উইকেট হারানোর পর দলকে টেনে তুলে ম্যাথু রেনশ ও পিটার হ্যান্ডসকম্ব জুটি। দলের সংগ্রহ যখন ১৩০ রান, তখন এই জুটির ভাঙন ধরান তাইজুল ইসলাম। সাজঘরে ফেরান হ্যান্ডসকম্বকে। এরপর সাকিবের ঘূর্ণির শিকার হন হ্যান্ডসকম্ব।

এ জুটির ভাঙনের পর আবার ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। একে একে ফিরে যান ওয়েড ও ম্যাক্সওয়েল। এরপর জুটি বাধেন কামিন্স ও আগার। তবে সাকিবের বলে কামিন্সের উইকেটটি হাত ফসকে যায় শফিউল ইসলামের। ফলে জীবন ফিরে যায় কামিন্স। আগারের সাথে ৪৯ রানের জুটি বাধেন। এ জুটির সুবাদে কোনো মতে মাথা জাগিয়ে আছে অস্ট্রেলিয়া।

এখনও বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ৬৭ রান পিছিয়ে আছে অসিরা। মধ্যাহ্নের বিরতির আগে মাঠে রাজত্ব ছিল বাংলাদেশী স্পিনারদেরই। বিরতির পরও সেই ধারাই থাকে। ফলে চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ১৪৪ রানেই ৮ উইকেট হারায় তারা।
সকালে ৩ রান নিয়ে দিন শুরু করে ৮ রানে থেমে যান অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। তাকে সাজঘরে ফেরান অফ-স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ।
দলীয় ৩৩ রানে স্মিথ ফিরে যাওয়ার পর পঞ্চম উইকেটে ৬৯ রানের জুটি গড়েন ম্যাট রেনশ ও পিটার হ্যান্ডসকম্ব। এই জুটি ভাঙেন বাঁ-হাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ৩৩ রান করে বিদায় নেন হ্যান্ডসকম্ব।

এরপর মধ্যাহ্ন বিরতির আগে রেনশকে তুলে নেন সাকিব আল হাসান। ৯৪ বলে ৪৫ রান করেন রেশ। এতে ৬ উইকেটে ১১৭ রানে পরিণত হয় অস্ট্রেলিয়া। এরপর গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ৮ ও উইকেটরক্ষক ম্যাথু ওয়েড ৫ রানে অপরাজিত থেকে দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন শেষ করেন।

মধ্যাহ্নের বিরতির পর ফিরেই অসি শিবিরে আঘাত হানলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। সাজঘরে পাঠালেন ম্যাথু ওয়েডকে। তার সংগ্রহ ছিল ৮ রান।
এটি মিরাজের তৃতীয় উইকেট। এর আগে সকালে প্রথম আঘাত হানেন এই তরুণ তুর্কি।

স্পিন আতঙ্ক কাটছেই না অস্ট্রেলিয়ার। স্পিনের শিকার হয়ে হ্যান্ডসকম্ব ফেরার পরই ফেরেন রেনশ। দিনের শুরুতে উইকেট হারানোর পর দলকে টেনে তুলেছিল এ জুটি। সাকিব আল হাসানের ঘূর্ণিতে পড়েছেন রনশ। অর্ধশত থেকে ৫ রান দুরে থাকতেই ফিরেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৬ উইকেটে ১৩০ রান।

দিনের শুরুটা ভালো হয়নি অস্ট্রেলিয়ার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছিল। বাংলাদেশকে তখন শক্ত হাতে সামলে ছিলেন তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। একই কাজ করছিলেন ম্যাথু রেনশ ও পিটার হ্যান্ডসকম্ব। অর্ধশত রানের এ জুটি ভাঙ্গেন স্পিনার তাইজুল ইসলাম। সাজঘরে ফিরিয়েছেন হ্যান্ডসকম্বকে। তার সংগ্রহ ছিল ৩৪ রান।

স্পিন আতঙ্কই ভর করেছে অস্ট্রেলিয়া শিবিরে। দিনের শুরুতে সেটা আরো একবার প্রমাণ হয়। অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ সাজঘরে ফিরেন তরুণ তুর্কি মেহেদী হাসান মিরাজের বলে। মাত্র ৮ রানে বোল্ড হয়ে মাঠ ছাড়েন এই অধিনায়ক।
নিজের দ্বিতীয় ওভারে বল হাতেই সফল মিরাজ। এ নিয়ে তার ঝুলিতে উইকেট পড়ে দুটি। গতকাল ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারকে শুরুতেই ফেরান এই তরুণ স্পিনার। তারও সংগ্রহ ছিল ৮ রান।

অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৪ উইকেট হারিয়ে ৪৪ রান। ক্রিজে আছেন ম্যাথু রেনশ ও পিটার হ্যান্ডসকম্ব।

১১ বছর পর মাঠে নেমেই জমজমাট লড়াই করেছে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া। তবে দিন শেষে চালকের আসনে ছিল বাংলাদেশ। তবে শুরুতে দুই দলকেই ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে।
টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম চার ওভারেই মাত্র ১০ রানে তিন উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
আবার দিনের শেষ চার ওভারে অস্ট্রেলিয়াও হারায় তাদের প্রথম তিনটি উইকেট।
বাংলাদেশকে ব্যাটিং বিপর্যয় থেকে টেনে তোলেন ওপেনার তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। তাদের ১৫৫ রানের দুর্ধর্ষ পার্টনারশিপকে দলকে অনেকটা এগিয়ে দেয়।
তামিম ও সাকিব দু'জনেরই টেস্ট ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্ট এটি। আর সেই সুবর্ণজয়ন্তী মাইলস্টোনকে প্রথম দিনেই তারা স্মরণীয় করে রাখলেন এই পার্টনারশিপের মধ্যে দিয়ে।
টেস্টে চতুর্থ উইকেট জুটিতে এটা বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপও বটে।

দু'জনই করেছে হাফসেঞ্চুরি। তবে শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তামিম ৭১ রানে ম্যাক্সওয়েলের বলে ওয়ার্নারকে ক্যাচ দিয়ে আর সাকিব ব্যক্তিগত ৮৪ রানে লিয়ঁ-র বলে স্টিভ স্মিথকে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে শেষ পর্যন্ত অল আউট হয় ২৬০ রানে। বৃষ্টির জন্য খেলা অল্প কিছুটা সময় বিঘ্নিত হয়েছিল, তবে তা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া এদিন প্রথম ইনিংসে কমপক্ষে নয় ওভার ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়েছিল।
এই সীমিত সময়ের মধ্যেও কোয়ালিটি স্পিন বোলিংয়ের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ানদের দুর্বলতা কিন্তু কিছুটা হলেও প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
নিজের ৮ রানের মাথাতেই যেমন মেহেদী হাসান মিরাজের বলে এলবিডব্লিউ হন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার। এশিয়ার মাটিতে এই নিয়ে তিনি টেস্টে মোট আটবার অফ-স্পিনারদের উইকেট দিলেন।
যে বলে তিনি আউট হন, ঠিক তার আগের বলেও তাকে এলবিডব্লিউ দিয়েছিলেন আম্পায়ার। রিভিউ নেয়ার পর 'ইনসাইড এজে'র সুবাদে তিনি সে যাত্রা বেঁচে যান সে যাত্রায়। কিন্তু পরের বলেই আর শেষ রক্ষা হয়নি।
স্পিনের বিরুদ্ধে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না উসমান খাজাও খুব ঝুঁকি নিয়ে একটা সিঙ্গলস নিতে গিয়ে রান আউট হন।

এরপর শূন্য রানে নাইট ওয়াচম্যান নাথান লিয়ঁর উইকেট তুলে নেন সাকিব আল হাসান।
১৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকে অস্ট্রেলিয়া।
দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে তিন স্পিনার নিয়ে খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম রয়েছেন স্পিন বিভাগে। একাদশে সুযোগ পাননি লিটন কুমার দাস, মুমিনুল হক ও তাসকিন আহমেদ।
বাংলাদেশ দল : তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, ইমরুল কায়েস, সাব্বির রহমান, মুশফিকুর রহিম (অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক), সাকিব আল হাসান, নাসির হোসেন, মেহেদী হাসান, তাইজুল, শফিউল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমান।
অস্ট্রেলিয়া দল : স্টিভেন স্মিথ (অধিনায়ক), ডেভিড ওয়ার্নার, ম্যাথু রেনশ, উসমান খাজা, পিটার হ্যান্ডসকম্ব, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, ম্যাথু ওয়েড (উইকেটরক্ষক), অ্যাস্টন আগার, প্যাট কামিন্স, নাথান লিঁও ও জশ হ্যাজেলউড।

টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র চারবার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া। চার ম্যাচের ভেন্যু ছিল- অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন ও কেয়ার্নস এবং বাংলাদেশের ফতুল্লা ও চট্টগ্রাম। আজ ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে পঞ্চমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া। এই ভেন্যুতে আগে কখনোই মুখোমুখি হয়নি তারা।
তবে বাংলাদেশের চেয়ে অভিজ্ঞতায় অনেক পিছিয়ে থেকেই মিরপুরের ভেন্যুতে খেলতে নামবে অস্ট্রেলিয়া। কারণ মিরপুরের ভেন্যুতে কখনোই টেস্ট খেলেনি অসিরা। তবে নিজেদের হোম কন্ডিশন ভেন্যু মিরপুরে এখন পর্যন্ত ১৫টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ।
২০০৭ সালে মিরপুরের ভেন্যুতে প্রথমবারের টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ। এরপর ১৪ টেস্টে দুটি জয়ের স্বাদ পেয়েছে টাইগাররা। এই ভেন্যুতে বাংলাদেশের দুটি জয় এসেছে জিম্বাবুয়ে ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ২০১৪ সালের অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩ উইকেটে এবং ২০১৬ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০৮ রানে জিতেছিলো বাংলাদেশ।
এছাড়া ১০টি হার ও ৩টি ড্র’র স্বাদও পেয়েছে বাংলাদেশ। ভারত-শ্রীলঙ্কা-ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তানের কাছে দুইবার করে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা-ইংল্যান্ডের কাছে একবার করে টেস্ট হারে টাইগাররা। আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুইবার টেস্ট ড্র করে বাংলাদেশ।
মিরপুরের ভেন্যুতে সর্বশেষ গেল বছরের অক্টোবরে টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয়টি ১০৮ রানের বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলো টাইগাররা। ফলে টেস্ট সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করতে পারে মুশফিকুর রহিমের দল।
এএইচ